Bartaman Logo
১৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গেরুয়া কোপে শরণার্থীরা

হাবড়ায় রেলের জমিতে বুলডোজার চালিয়ে শতাধিক দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। উদ্বাস্তুদের জীবন বিপন্ন, সরকারের পদক্ষেপ অমানবিক। বিস্তারিত পড়ুন।

গেরুয়া কোপে শরণার্থীরা
  • ১৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

যেকোনো অবাঞ্ছিত অতিকায় জিনিস গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজার একটি আদর্শ হাতিয়ার। বস্তুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে বদলে ফেলে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে উঠেছেন যোগী আদিত্যনাথ। মানে বিজেপির ‘রামরাজ্য’ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর নামমাহাত্ম্য এতখানি যে এখন উত্তরপ্রদেশ কিংবা ইউপি বলার আর দরকার হয় না, ‘যোগীরাজ্য’ বললেই যথেষ্ট। তবে যোগীজিকে অনেকে ‘বুলডোজার বাবা’ নামেও চেনে, বলা বাহুল্য, এই পরিচয় যথার্থ। কারণ বিজেপির দাবি অনুযায়ী, ইউপিতে আগে কায়েম ছিল জঙ্গলের রাজত্ব। বুলডোজার থেরাপিতেই যোগী সেখানে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বভাবতই ভারতজুড়ে হিন্দুত্বের কারবারিরা উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত। যেমন বিধানসভা নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জায়গায় হয়েছিল বুলডোজার প্রদর্শনী! প্রার্থী এবং তাঁদের অনুগামীরা মিছিল বের করেছিলেন বুলডোজার চেপে। তখনই প্রমাদ গুনেছিল বিরোধীরা, বিজেপির সরকার তৈরি হলে কি ইউপির মতোই ‘বুলডোজার শাসন’ চালু হবে মানবিক বাংলায়? 

Advertisement

তাঁদের আশঙ্কা, অনুমান যে অভ্রান্ত ছিল তার প্রমাণ মিলতে দেরি হয়নি। বুলডোজার থেরাপি শুরু হয়েছিল দমদম, যাদবপুর, উত্তরপাড়া দিয়ে। সেই তালিকায় এবার উঠে এল উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার নাম! রাজ্যে পালাবদল হতেই একের পর এক রেলস্টেশনে এবং রেলের জমিতে চলছে বেলাগাম উচ্ছেদের খেলা। সোমবার রাতভর হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন রেলের জমিতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল শতাধিক দোকান, হকার স্টল, বসবাসের ঝুপড়ি। স্টেশন চত্বর হঠাৎই যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের চেহারা নেয়। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদা ছাড়া কিছু করার ছিল না হঠাৎই সব হারানো মানুষগুলির। এক রাতের উচ্ছেদ অভিযানে গুঁড়িয়ে গেল পাঁচ শতাধিক দোকান। ক্ষতিগ্রস্ত হল হাজারখানেক পরিবার। পূর্ব রেলের শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হাবড়া। রাতে ১ নম্বর রেলগেট থেকে শুরু করে স্টেশনের তিনটি প্ল্যাটফর্মে চলে বুলডোজার। দীর্ঘদিন ধরে রেলের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানপাট, হকার স্টল, এমনকি বিভিন্ন সংগঠনের অফিস ভেঙে দেওয়া হয়। রাত যত বেড়েছে, বুলডোজারের ধ্বংসলীলা গতি পেয়েছে তত। উচ্ছেদ অভিযানের প্রাক্‌মুহূর্তে মঞ্চস্থ হয়েছে একাধিক নাটকীয় ঘটনাও। স্টেশন চত্বরে ছিল তৃণমূল পরিচালিত একটি ক্লাব। সেটিকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কালীমন্দিরের রূপ দেওয়া হয়। তার পাশে ছিল ভেন্ডার সমিতির অফিস। সেখানে বসানো হয় রাধাগোবিন্দের মূর্তি। লিখিতভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়—‘মন্দির’। অনেকের ধারণা ছিল, ধর্মীয় স্থাপনা দেখে বুলডোজার নিশ্চয় থমকে যাবে। কিন্তু সদ্য গড়ে ওঠা ‘মন্দিরটিকেও’ উচ্ছেদের মুখে দেখা গেল অসহায়! রেলের জমিতে যাঁদের দোকান বা বসবাস ছিল, তাঁদের উঠে যাওয়ার জন্য সময়সীমা দেওয়া হয় ১৩ জুন। সেই নোটিস মেনেই শুরু হয় উচ্ছেদ পর্ব। 
হকাররা জানাচ্ছেন, তাঁরা অনেকবছর যাবৎ স্টেশন চত্বরে ব্যবসা করছেন। এই রোজগারেই তাঁদের সংসার নির্বাহ হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার স্বপ্নপূরণের মরিয়া চেষ্টা চলে। সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে তাঁদের সবই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন কোথায় যাবেন, কী খাবেন, ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যাবে কীভাবে—তাঁরা  ভেবে কূল পাচ্ছেন না। বলা বাহুল্য, সারা রাজ্যে রেললাইনের ধারে, বিভিন্ন রেলস্টেশন চত্বরে যাঁদের অস্থায়ী বসবাস, এমনকি জীবিকার সন্ধান, তাঁদের বেশিরভাগই পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সবচেয়ে বড়ো বলির নাম বাংলা। পাঞ্জাবও দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের সমস্যাটি আলাদা। তাদের যথাযথ পুনর্বাসন দিয়েছিল নেহরু সরকার। বাঙালি উদ্বাস্তুরা অতটা ভাগ্যবান ছিল না। পুনর্বাসনের নামে তাদের সঙ্গে লাগাতার মশকরা করা হয়েছে। তার উপর বাংলাকে একবার নয়, ১৯০৫ থেকে ধরলে বারবার নানাভাবে নানা কায়দায় টুকুরো টুকরো করা হয়েছে। ১৯৭১-এ গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশও হিন্দু বাঙালিকে আপন করে নেয়নি। ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ স্বীকার করে নেওয়ার পর দেশটিতে হিন্দুদের অবস্থা হয়েছে মানবেতর। সেই নির্যাতন আজও বহমান। মঙ্গলবার হাবড়ায় যারা বেঘর হল তারা ওই দুর্ভাগাদেরই অন্যতম। একবার তারা দেশত্যাগী হতে বাধ্য হয়েছে, এবার তাদের শেষ আশা, শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেওয়া হল। সরকারের এই পদক্ষেপ সর্বার্থেই অমানবিক। ন্যূনতম মানবিকতা থাকলে উচ্ছেদের আগে অবশ্যই যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা তারা করত। পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের জন্য কেঁদে ভাসানোই যাদের রাজনীতির মূলধন তাদের এই বিপরীত পদক্ষেপকে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া কী বলা যাবে? তথাকথিত উন্নয়নের প্রথম কোপ এখন বিপন্ন হিন্দু বাঙালিদেরই ঘাড়ে। গেরুয়া শাসকের কুম্ভীরাশ্রু আর গোপন রইল না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ