Bartaman Logo
১৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শুরু হল কথার খেলাপ

পশ্চিমবঙ্গে মনরেগার কাজ শুরু হলেও ৩৩৩৯ পঞ্চায়েতের মধ্যে মাত্র ৩৩টিতে কাজ শুরু হয়েছে। গ্রামীণ শ্রমিকদের ক্ষোভ বাড়ছে। বিস্তারিত পড়ুন।

শুরু হল কথার খেলাপ
  • ১৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

৯ জুন হাওড়ার উলুবেড়িয়া-২ ব্লকে কোদাল হাতে১০০ দিনের কাজ পুনরায় চালু করেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। কাজের শুভ সূচনা নিয়ে জোরদার প্রচারও চালায় বিজেপি সরকার। সোমবার নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের একটি গ্রামেও দেখা গেল একইরকম আনুষ্ঠানিকতা। সেখানে প্রচারের আলোয় উজ্জ্বল স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক সুকান্ত বিশ্বাস।আমরা জানি, নতুন সরকার ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিনের কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। বদলে গিয়েছে প্রকল্পের সরকারি নামও। ছিল এমজিএনআরইজিএ বা সংক্ষেপে মনরেগা। এবার নাম দেওয়া হয়েছে বিকশিত ভারত-গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ), সংক্ষেপে ভিবি-জি রাম জি। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় সেই কাজ চলছে। নিজের হাতে মাটি কাটতে নেমে পড়েছেন বিধায়ক থেকে বিভাগীয় মন্ত্রী। অর্থাৎ বহু আকাঙ্ক্ষিত প্রকল্পটি নিয়ে প্রচারে কোনো খামতি রাখা হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার শেষদিকে, ২০২২ সালে বাংলায় বন্ধ হয়েছিল মনরেগা। তার আগে পর্যন্ত এই খাতে কেন্দ্রের কাছে বাংলার হকের পাওনা আটকে ছিল ৬,৯১৯ কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তারপরে বাংলার জন্য লেবার বাজেট বরাদ্দ হলে রাজ্য আরো ৫০,৩৪৪ কোটি টাকা পেত। কিন্তু রাজ্যকে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়নি। ওই টাকা আসার মানে ছিল, বাংলার গরিব মানুষগুলির হাতে হাতে কাজের ব্যবস্থা হওয়া। কংগ্রেস জমানায় মনরেগা চালু করার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা বৈষম্য ও বেকারত্ব। তার প্রধান বলি গরিব মানুষ। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি গ্রাম ভারতে। তাই এমন একটি আইন তৈরি করা হয়েছিল যে, গ্রামের যেকোনো মানুষ দাবি করামাত্রই সরকার তাঁকে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজ দিতে বাধ্য থাকবে। গত দুই দশকে ভারতে দারিদ্র অবশ্যই কিছুটা কমেছে। তার পিছনে মনরেগা রূপায়ণের কৃতিত্ব যে বিরাট, তাতে সন্দেহ কী? বলা বাহুল্য, ইউপিএ জমানাতেই মনরেগা রূপায়ণে বেশ গতি ছিল।

Advertisement

জনমুখী প্রকল্পটির বারোটা বাজে মোদিযুগে। যখন কাজের দিন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছিল, তখনই এই খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ছেঁটে দেওয়া হয়। তারই মধ্যে চলে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ সরকারগুলির সঙ্গে চরম বঞ্চনার খেলা। অবিজেপি রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে মোদিবাবুদের সবচেয়ে অপছন্দের ছিল বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যদিও মোদির সরকার এবং পার্টির অভিযোগ ছিল, মনরেগা রূপায়ণের নামে তৃণমূল ঢালাও অনিয়ম, বেনিয়ম, দুর্নীতি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে জবাব চেয়েও নবান্নের কাছে সদুত্তর পায়নি। যাই হোক, মনরেগাসহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে একদশকের বেশিকাল যাবৎ দিল্লি-নবান্ন আকচাআকচি চলেছে। এই তরজায় কারো কারো রাজনৈতিক ফায়দা অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে সর্বনাশ হয়েছে শুধু লক্ষ লক্ষ গরিব পরিবারের। তারা সবাই বাংলার মানুষ। এই সর্বনাশের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গ্রামবাংলার অর্থনীতিতেও।রাজ্যে নতুন সরকার, অর্ধশতকে প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হতেই টানা চারবছরের সেই খরা কেটে যাওয়ার ‘সুখবর’ চাউর হয়। সরকারের তরফে বলা হয় যে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গে শুরু হচ্ছে ‘মনরেগা’র কাজ। পশ্চিমবঙ্গের জন্য ১ কোটি ৫৩ লক্ষশ্রমদিবস মঞ্জুর করেছে নয়াদিল্লি। মনরেগার পরিবর্তে ‘ভিবি-জি রাম জি’ পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশে শুরু হবে ১ জুলাই থেকে। তার আগেই ‘মনরেগা’র আওতায়এরাজ্যের জবকার্ডধারীরা ওই পরিমাণ কাজ পাবেন একমাসের জন্য। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা, এই কাজ যথানিয়মে চলবে। এবার সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার কোনো অভাব দেখতে চায় না বাংলা। কারণ ইতিমধ্যেই গরিব মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এখন এই কাজের রকমসকম দেখে গ্রামবাংলার মানুষের মনেসংগত প্রশ্ন জেগেছে যে, সবটাই বিজ্ঞাপনী চমক নয় তো?চারবছর পর, ৯ জুন রাজ্যে ফের চালু হয়েছেমনরেগার কাজ। অর্থাৎ কথার খেলাপ ঘটল শুরুতেই। কাজটির আনুষ্ঠানিক সূচনায় বিলম্ব ঘটল ৯ দিন। তারপরও কেটে গিয়েছে একটি সপ্তাহ। অর্থাৎ চলতি মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। সেখানে সাফল্যের খতিয়ান কেমন? রাজ্যের ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে এই কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৩৩টিতে! বাকি ৩,৩০৬টি গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজটি শুরুই হয়নি। স্বভাবতই সংশ্লিষ্ট শ্রমিক মহল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। বাহানায় উঠে এসেছে ডিমবৃষ্টির অজুহাত। অজুহাত দেওয়া সহজ এবং অজুহাতই সেরা হাতিয়ার হিসাবে শোভা দেয় নেতাদের হাতে হাতে। আমরা এও জানি, অজুহাত কোনো সমাধানের সন্ধান দেয় না, সংকল্প থেকে দূরবর্তী করে নিয়ত। তাই অবিলম্বে সতর্ক হওয়া দরকার। নতুবা ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্প নিয়েও বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার বদনাম অপেক্ষা করতে পারে নবান্নের দুয়ারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ