Bartaman Logo
১৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুত্র বা পত্নী

আত্মা কি পুত্র বা পত্নীর চেয়ে প্রিয়? ভারতীয় দর্শনে আত্মার গুরুত্ব বিশ্লেষণ। বিষয়টি জানুন বিস্তারিত।

পুত্র বা পত্নী
  • ১৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ব্যবহারিক জগতে স্থূল দৃষ্টিতে আমরা পুত্র, পতি, পত্নী ও ধন সম্পত্তি প্রভৃতিকে প্রিয় বস্তু বলিয়া বুঝি। আবার পুত্র বা পত্নী আদি চেতন প্রিয়পাত্রকে অধিকাংশ ব্যক্তিই হস্তপদাদিযুক্ত আকৃতিমাত্র জ্ঞান করে। এই স্থলে একটি বিষয় বিচার্য। আমাদের প্রিয় কোনও আত্মীয়ের দেহ তাহার জীবনকালেই প্রিয় ও উপাদেয় হইয়া থাকে কিন্তু মৃত্যুর পর সেই দেহ বিকৃত ও অস্পৃশ্য হইয়া অপ্রিয় হইয়া যায়। প্রিয়ত্ব যদি দেহের স্বাভাবিক নিত্য ধর্ম হইত তাহা হইলে মৃতদেহেও তাহা থাকিত। অতএব এমন কিছু প্রকৃত প্রিয় বস্তু আছে যাহার সংযোগে দেহ আপাততঃ চৈতন্যযুক্ত ও প্রিয় বলিয়া বোধ হয় কিন্তু তাহার সহিত বিযুক্ত হইলে দেহের চৈতন্য ও প্রিয়তা থাকে না। সেই বস্তুটির স্বরূপ নির্ণয়ে বিশ্বের দার্শনিক পণ্ডিতগণ বিবিধ গবেষণা করিয়া স্ব স্ব বুদ্ধি অনুসারে সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। বিশেষতঃ ভারতীয় দর্শনসমূহে এই বস্তুর তত্ত্ব নিরূপণ অন্যতম মুখ্য প্রতিপাদ্যরূপে স্বীকৃত হইয়াছে। দার্শনিকগণের বিচার-মনীষার ক্রমোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পূর্ব সিদ্ধান্ত খণ্ডিত হইয়াছে। সর্বশেষে সর্বদর্শনশিরোমণি বেদান্তদর্শনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও বিশ্ববিজয়ী হইয়া অদ্যাপি সগৌরবে সমুজ্জ্বল দীপ্তিতে শোভা পাইতেছে। উপনিষদ্ বা বেদান্তদর্শনে তত্ত্ব কথার যেরূপ যুক্তিপূর্ণ বিশদ আলোচনা দৃষ্ট হয় তাহা অন্য কোনও দর্শনে দৃষ্ট হয় না।

Advertisement

প্রত্যক্ষ বা অনুমান প্রমাণের দ্বারা অতীন্দ্রিয় পদার্থের জ্ঞান হয় না এবং সে জন্য আগম বা বেদাদিশাস্ত্র প্রমাণের শরণাপন্ন হইতেই হইবে ইহা বেদান্তদর্শনের মত। ‘কে প্রিয়’ এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রুতি এক নূতন সংবাদ শুনাইলেন। শ্রুতি বলিলেন—“আত্মানমেব প্রিয়মুপাসীত” আত্মাকেই প্রিয়রূপে উপাসনা করিবে। ‘তদেতৎ প্রেয়ঃ পুত্রাৎ প্রেয়ো বিত্তাৎ প্রেয়োহন্যস্মাৎ সর্বস্মাৎ অন্তরতরং যদয়মাত্মা’ এই যে ‘অন্তরতর’ আত্মা সেই ইনি পুত্র অপেক্ষা প্রিয়, বিত্ত অপেক্ষা প্রিয়, অন্য সকল হইতেও প্রিয়। এই অভিনব সংবাদে জগৎ বিস্মিত হইল, নূতন তত্ত্বের সন্ধান লাভ করিল। যদিও অতিস্থূল দৃষ্টি কেহ পুত্রকেই আত্মা বলেন, তদপেক্ষা বুদ্ধিমান্ কেহ স্থুল দেহকেই আত্মা মনে করেন, আবার কেহ বা ইন্দ্রিয় সমষ্টিকে, কেহ প্রাণকে, কেহ মনকে, কেহ বুদ্ধিকে কেহ বা শূন্যকে আত্মা বলেন। কিন্তু বেদান্তকেশরীর গর্জনে অন্য সকলের মত সন্ত্রস্ত, হীনবল ও খণ্ডিত হইয়াছে। আত্মা নিত্য শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত ও সত্যস্বভাব এবং সচ্চিদানন্দময় ইহাই বেদান্তের ঘোষণা। দেহাদি সমস্তই অনিত্য ও নশ্বর কিন্তু দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত দেহী আত্মা নিত্য, সনাতন ও অবিনাশী। এই আত্মতত্ত্বই সনাতন ধর্মের মূলসূত্র এবং দৃঢ়ভিত্তি। ভারতীয় সনাতন ধর্মের সার এক কথায় বলা যায় ‘আত্মানং বিদ্ধি’—আত্মাকে জান। এই প্রিয় আত্মাকে জানিতে পারিলেই তাহার সাধন, সাধ্য এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য তত্ত্বের যথার্থ বোধ হইবেই। আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র উপনিষদ্ ও গীতা প্রভৃতি গ্রন্থ এই আত্মতত্ত্ব নির্ণয়েই নিরত হইয়াছেন। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে আত্মতত্ত্বের বর্ণনা থাকায় এই অধ্যায়ই গীতা-কল্পবৃক্ষের বীজ।পণ্ডিতপ্রবর জ্যোর্তিময় নন্দের ‘জ্যোর্তিময় রচনাঞ্জলি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ