শান্তনু দত্তগুপ্ত: তৃণমূল কয় প্রকার ও কী কী? আগামী সর্বভারতীয় কোনো কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় এই প্রশ্ন এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কিন্তু পরীক্ষার্থীরা উত্তরে কী লিখবেন? সেটাও বড্ড কঠিন প্রশ্ন। আসল তৃণমূল, নকল তৃণমূল, মমতার তৃণমূল, আদি তৃণমূল, সুবিধাবাদী তৃণমূল, কাকলি ঘোষদস্তিদারের তৃণমূল, ঋতব্রতর তৃণমূল... গুনতে শুরু করলে পাতাল পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। এর উপর আবার নতুন একটা শাখা হঠাৎ শিরোনামে এসে গিয়েছে—এনসিপিআই। ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া। সে নাকি নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত একটি দল। যদিও এ তৃণমূলের শাখা নয়। উলটে তৃণমূলের একঝাঁক সাংসদ এর শাখার নীচে আশ্রয় নিয়েছেন। তাহলে কি বিজেপির শাখা? সেটাও তো কোথাও বলা-লেখা নেই! কিন্তু হাওয়ায় আছে। তবে রবিবার একটা ঘটনা ঘটেছে... এই নামটা শোনা মাত্র ভারতবর্ষের সব সেফোলজিস্ট একেবারে ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ভাইরাসের মতো দু’হাতে দুটো বই খুলে এর অস্তিত্ব খুঁজতে শুরু করে দিয়েছেন। আতিপাতি তল্লাশি চালিয়ে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে ভূমিষ্ঠ হয়েছে দলটি। হাওড়ায় সদর দপ্তর। নেপথ্যে পাওয়া যাচ্ছে শান্তনু দে বলে একজনের নাম। প্রতীক বলতে, ফাউন্টেন পেনে নিব। আর তার থেকে সাতদিকে কালি (বা রশ্মি) ছড়িয়ে পড়ছে। কোন সিন্দুকে ছিল এই কলম, হঠাৎ কীভাবে বেরিয়ে এল... এইসব প্রশ্ন এখন বর্ষার মৌসুমি বায়ুর মতো দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে হানা দিতে শুরু করেছে। আর সেটা হয়েছে কিন্তু তৃণমূলের ২০ বিদ্রোহী এমপি এই ভুঁইফোঁড় দলে মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়ায়। কেন? কারণ তাঁরা দাবি করেছেন, এনডিএ সরকারের বিপুল কর্মযজ্ঞে তাঁরা পাশে থাকতে চান। অথচ বিজেপি তাঁদের দলে নেবে না! তাহলে কী হবে? দলবিরোধী আইনের গোলাগুলির মুখে যাতে পড়তে না হয়, তার জন্য প্রচুর খেটেখুটে এই দলের নাম জোগাড় করেছেন তাঁরা। সত্যিই কি তাই? নাকি দলটি তৈরিই ছিল! এমনই কোনো ‘সাংবিধানিক সংকটে’ হাল ধরার জন্য? প্রশ্ন উঠছে। এবং এর থেকেও বেশি গুরুতর প্রশ্ন বাজারে আছে। ১) পুরো গেমপ্ল্যানে মদত দিয়েও বিজেপি দরজা বন্ধ রাখল কেন? ২) এই দলটিতে যোগ দিয়ে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের কী লাভ হল? ৩) ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলও কি এই দলে যোগদান করবে? ৪) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যার সভানেত্রী, সেই তৃণমূলের কী হবে? উত্তরগুলো একবার তলিয়ে দেখা যাক।
যুক্তফ্রন্ট জমানাতেও এমন দেউলেপনা বাংলা দেখেনি। অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তখন একটা আদর্শ মেনে অন্তত রাজনৈতিক জোড়াতালি পড়েছিল। আর এখন? সবটাই স্বার্থকেন্দ্রিক। ৪ জুনের আগে যে নেত্রী ও সেনাপতির জন্য সবাই গদগদ মুখে গ্যালন গ্যালন তেল নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন, এখন তাঁদেরই দলে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিজেপির ছত্রচ্ছায়ায় গেলে তাঁরা খোলা হাওয়া পাবেন। এখানেও আবার দুটো ভাগ রয়েছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-কাকলি ঘোষদস্তিদাররা যেমন সরাসরি দল ছেড়ে বিজেপিকে সমর্থনের ব্যাপারে ঘোষণাপত্র জারি করেছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা কিন্তু তা করেননি। তাঁরা বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের নেত্রী এবং গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁরা বিজেপি সরকারের বিরোধিতা করবেন। মাস্টারস্ট্রোক রাজনীতি। বিদ্রোহী তৃণমূলিদের নয়, বিজেপির। প্রথম, বিধানসভা ক্ষেত্র। এখানে সরকার নির্ধারিত এবং নির্দেশিত একটি বিরোধী দল পাওয়া গেল। তারা হুজ্জুতি করে বিধানসভা অধিবেশন পণ্ড করবে না, একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেবে না, ওয়াক আউট করবে না এবং বিধানসভার গেটে দাঁড়িয়ে সরকারের মুণ্ডপাত করবে না। স্বাভাবিক অর্থেই সংবাদমাধ্যমের হাতে ডবল ইঞ্জিনের বিরুদ্ধে লেখার মতো রসদ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামনের সারিতে থাকলে তা সম্ভব হত না। তিনি প্রচারের বেশিরভাগ আলোটাই শুষে নিতেন। ঋতব্রতর তৃণমূল সগর্বে সেই জায়গাটা শুভেন্দু অধিকারীকে ছেড়ে দেবে। বিরোধী থাকবে, কিন্তু দুর্বল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশি ঝাঁঝ দেখানোর চেষ্টা করলে ঋতব্রতর তৃণমূল নিজেদের আসল বলে দাবি করে প্রতীকটাও কেড়ে নেবে। সেখানে রাজ্য সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আদালত... সর্বত্রই ‘আইনগত’ সমর্থন পেয়ে যাবে তারা। অন্তত নিন্দুকে তেমনটাই বলছে। সেক্ষেত্রে মমতার তৃণমূলের হাল হবে শিবসেনার থেকেও খারাপ। দলটাই পুরোপুরি না উঠে যায়। যদিও একে দল না বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফ্যান ক্লাব বলাটাই ভালো। যতদিন মধু ছিল, মৌমাছির দল ঝাঁকে ঝাঁকে তাঁর চারপাশে ঘুরেছে। বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরতেই সেই মৌমাছিরা ছুটেছে অন্যত্র। চাকের খোঁজে। কিংবা হতে পারে, তাদের গায়ে গন্ধ আছে। তাই গেরুয়া বাহিনীর কথায় সাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছে। না হলে ঘরে হানা দেবে ইডি-সিবিআই। টানতে হবে জেলের ঘানি। বিজেপিও এই অপেক্ষাতেই ছিল। তারা এখন বলছে, তোমাদের দলে নেব না। লোকসভায় বাইরে থেকে সমর্থন দাও। আর বিধানসভায় তোমরাই আসল তৃণমূল হয়ে যাও। তাতে একটা দুর্বল বিরোধী থাকবে। তাদের যেমন খুশি তেমন ওঠ-বোস করানো যাবে। আর কেউ বলতেও পারবে না যে, বিজেপি গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে দিল।
দ্বিতীয় ক্ষেত্র হল সংসদ। সেখানে এমনিতেই চন্দ্রবাবু নাইডু-নীতীশ কুমারদের কাঁধে ভর দিয়ে সিদ্ধান্তের ফেরি পারাপার করতে হয়। জনা ২০ এমপি যদি হাবিজাবি কোনো দলের হয়েও সমর্থন দিয়ে দেয়, তাহলে ওই বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। উপরন্তু বিল পাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হবে। দু’টি বিল নিয়ে এমনিতেই যথেষ্ট টেনশনে আছে বিজেপি। একটি হল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দেশজুড়ে কার্যকর করা। সাম-দাম (বা দান)-দণ্ড-ভেদ প্রয়োগ করে জোগাড়িকৃত এই সাংসদরা এবার তাতে পূর্ণ সমর্থন দেবে। ফলে পার্লামেন্ট ভবনের অন্দরে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট আদায় করা অসম্ভব হবে না। আরএসএসের অন্যতম এজেন্ডা পূরণে আরও একধাপ এগবে সরকার। আর অন্যটি হল, ডিলিমিটেশন বিল। সরকারের ইঙ্গিত, এই বিল পাশ হয়ে গেলে দেশে মোট লোকসভা কেন্দ্রের সংখ্যা হবে ৮৫০টি। প্রায় সব রাজ্যেই আসন সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে সেই বৃদ্ধির হার হবে নগণ্য। শুধু উত্তরপ্রদেশেই আসন সংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে হবে ১৩৮। গুজরাতে ২৬ থেকে ৪২। অঙ্কটা লুকিয়ে এখানেই। ৮৫০ আসনের ভিত্তিতে সরকার গড়তে একটি দল বা জোটের প্রয়োজন হবে ৪২৬টি। গো-বলয়, গুজরাত, উত্তর-পূর্ব ভারত ধরলেই মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৮৭টি। এর সঙ্গে মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, ছত্তিশগড় জুড়লে ৫১১। তখন সাম্রাজ্য বজায় রাখার জন্য দক্ষিণ ভারতের দিকে না তাকালেও চলবে। পশ্চিমবঙ্গেও আসন সংখ্যা ৪২ থেকে বেড়ে ৬৩ হবে। সেটা তো হিসাবে ধরাই হয়নি।
বিজেপি রাজনীতি করে অনেক দূরের কথা ভেবে। এটাই তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যদি ‘এক দেশ এক ভোট’ও পাশ করিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে তো কেল্লা ফতে। বছরের পর বছর তখন বিরোধীদের আঙুল চোষা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। এমনিতেই আজকের বাজারে সিংহভাগ মিডিয়া তাদের খুব একটা প্রচার দিতে চায় না। কারণ, বিরোধীদের ব্যাপার-স্যাপার নাকি পাবলিক খায় না। তাই মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে রাহুল গান্ধীর ভাষণ থেকে যায় আড়ালেই। সেখানে রাহুলের বক্তব্য ছিল, ‘বহুদিন আগে আমার এক বন্ধুকে বলেছিলাম, তুমি যা করছ... অন্যায়। সে আমাকে বলেছিল, দুনিয়াটিই অন্যায়ের উপর চলছে। অভ্যস্ত হয়ে যাও। অভ্যস্ত হতে পারিনি, সজাগ হয়েছি। কংগ্রেস সম্পর্কে যা কিছু বলা হচ্ছে, আজ আমি তার জবাব দিতে আসিনি। আমি বিশ্বাস করি শৈব আদর্শে। মহাদেব যেভাবে বিষপান করে নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন, সেভাবে সমালোচনা-বিরোধিতা বুক পেতে নিতে হবে। আমাকে বা কংগ্রেসকে নিয়ে যা খুশি বলতে পারেন, হাসিমুখে শুনব। কারণ, আমাদের ভূমিকা আপনাদের সবাইকে একজোট করার। বিরুদ্ধমত থাকতেই পারে। কিন্তু আলোচনার ভিত্তিতে আমরা ঐকমত্যে আসব। কিন্তু সতর্ক হব। তৃণমূল কংগ্রেসে আমার বন্ধুদের বারবার বলেছিলাম, জিতে গিয়েছ ভেবে আনন্দে থেকো না। আমি গুজরাত দেখেছি, মধ্যপ্রদেশ দেখেছি, ছত্তিশগড়-হরিয়ানা-মহারাষ্ট্র দেখেছি।’ রাহুল গান্ধীর সাড়ে ন’মিনিটের এই বক্তব্যে ছিল সতর্কবার্তা, আকাশকুসুম না ভেবে মাটিতে পা রাখার পরামর্শ এবং জোটবদ্ধ হওয়ার ডাক। প্রতিপক্ষ কঠিন হলে, তাদের মতো ভাবতে হয়। অনেক আগে থেকে। বুঝতে হয়, তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে। তবেই মোকাবিলা করা যায়। বিরোধী থাকবে, কিন্তু তাদের মেরুদণ্ড বলে কিছু থাকবে না—এটাই এখন এজেন্ডা মোদি সরকারের। একের পর এক বিরোধী দল ভেঙে কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনা তারই বার্তাবহ। আঞ্চলিক দল বলে কিছু থাকবে না। সেই লক্ষ্যে বহু যোজন এগিয়ে গিয়েছেন মোদি-শাহ। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, ডিলিমিটেশন, এক দেশ এক ভোট কার্যকর হয়ে গেলে তাঁরা হয়ে যাবেন একপ্রকার অপ্রতিরোধ্য। সতর্ক করেছেন রাহুল। এখনই টনক না নড়লে ভবিষ্যৎ খুব সুখকর হবে না। সোনার বাংলা, সোনার ভারতে সোনা থাকবে... খাবার নয়, অধিকার নয়, স্বাধীনতা নয়। বৃহত্তম গণতন্ত্র? সেটাও নয়। সংবিধান সংশোধনের জন্য আমরা প্রস্তুত তো?