Bartaman Logo
১৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ডিগবাজি ও ‘অপারেশন লোটাস’

তৃণমূলের ২০জন সাংসদ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজনীতিতে নতুন সংকট। বিস্তারিত পড়ুন।

ডিগবাজি ও ‘অপারেশন লোটাস’
  • ১৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শেষপর্যন্ত লোকসভার ২০জন তৃণমূল সাংসদ স্পিকারকে চিঠি দিয়ে প্রায় অস্তিত্বহীন একটি দলের সঙ্গে মিলে যেতে পারেন বলে জানিয়ে দিলেন। গত ৪ মে রাজ্য বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার সকাল পর্যন্ত এই সাংসদদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘দেবী’র আসনে। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন, গোটা দেশে নরেন্দ্র মোদি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই চালাচ্ছেন একমাত্র মমতাই। এঁদের কেউ কেউ মমতাকে ‘ভাবী’ প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও অতীতে তুলে ধরেছেন। তাঁদের ভোটে জেতার এক এবং অন্যতম কারণ যে মমতার কাজকর্ম ও ভাবমূর্তি, তাও ফলাও করে ঘোষণা করে নেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই ‘বিদ্রোহী’রা। কিন্তু বাংলার বিধানসভা ভোটে দল হারতেই সব কৃতজ্ঞতা উধাও! এখন সুযোগ বুঝে বিজেপি ‘ভরসা’র হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় তৃণমূল ছেড়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন ‘বিদ্রোহীরা’। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধিদের একাংশের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এক দলের হয়ে ভোটে জিতে পরে অন্য দলে ভিড়ে যাওয়ার নজিরও কম নেই। বিজেপি আমলে এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু ভোটে দল হারা মাত্র একমাসের মধ্যে সাংসদদের অনেকের এমন গণহারে ডিগবাজি খাওয়ার নজির রীতিমতো গবেষণার বিষয় হতে পারে। নৈতিকতার প্রশ্ন উঠলে বলা উচিত, কোনো জনপ্রতিনিধি দলবদল চাইলে তাঁর পদত্যাগ করে নতুন করে ভোটারদের ‘ম্যানডেড’ নেওয়া উচিত। কিন্তু সেই ‘ঝুঁকি’ নেওয়ার চেয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়াই যে অনেক সহজ! তাতে ‘নিশ্চিন্ত’ জীবনের সঙ্গে ‘আরাম’ ফ্রি পাওয়া যাবে। অতএব নৈতিকতার প্রশ্নকে শিকেয় তুলে তৃণমূলের এই বিদ্রোহী সাংসদরাও সেই পথেই হাঁটলেন!

Advertisement

আসলে মোদির জমানায় ক্ষমতা দখলের রাজনীতি একটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। অতীতে একাধিক রাজ্যে দেখা গিয়েছে, নির্বাচিত দলের জনপ্রতিনিধিদের নানা টোপ দিয়ে ভাঙিয়ে এনে সরকার ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম সাক্ষী মহারাষ্ট্র। বিরোধীদের সম্মিলিত অভিযোগ দল, মোদির সরকার ইডি, সিবিআই-সহ কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে নানা সময়ে তল্লাশির নামে হেনস্তা করে, ভয় দেখিয়ে দল ভাঙাচ্ছে। এর জেরে সরাসরি কেউ বিজেপিতে যোগদান করেছে। অনেকে আবার আলাদা দলের অস্তিত্ব নিয়েই এনডিএ-র শরিক হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মেলায় তারা কৌশল বদলেছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। বিরোধীদের অভিযোগ, সেই কৌশল হল, দেশের নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে নাকি ভোটে কারচুপি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের একাংশকে বাদ দেওয়া এবং ভোট গণনার সময়ে ইভিএম-এ কারচুপি। তবে এসবই প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়। কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানায় লক্ষ লক্ষ ভুয়ো ভোটার ঢুকিয়ে বিজেপি ক্ষমতা দখল করেছে বলে তাদের অভিযোগ। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬-এর ভোটে অন্তত ১০০টি আসনে ভোট লুটের অভিযোগ করেছেন মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়। তামিলনাড়ুতেও প্রকৃত ভোটারদের অনেককে বাদ দিয়ে বিজেপি ভোটে কারচুপি করেছে বলে অভিযোগ। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে।
কিন্তু শুধু রাজ্য দখল করলে চলবে না। ২০২৯-এ লোকসভা ভোটে জয় নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কৌশল হিসাবে আসন পুনর্বিন্যাস ও মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সে জন্য লোকসভা, রাজ্যসভার দুই কক্ষেই দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন চাই, যা এখনও অধরা। অতএব মরিয়া বিজেপি ‘অপারেশন লোটাস’-এর দ্বিতীয় পর্ব শুরু করেছে। লোকসভার ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মানে ৩৬২ জনের সমর্থন দরকার। বর্তমানে এনডিএ-র সাংসদ সংখ্যা ২৯৪। এর মধ্যে তৃণমূলের ২০জন ‘বিদ্রোহী’-র ভোট নিশ্চিত হলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে ৩১৪। ধরা যাক, ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের উপর বিরক্ত তামিলনাড়ুর ডিএমকে দলের ২২জন সাংসদ সরকারের পক্ষে ভোট দিতে রাজি হলেন। তাহলে এনডিএ-র পক্ষে ভোট পড়বে ৩৩৬টি। তাহলেও দুই তৃতীয়াংশ থেকে ২৬টি কম। ঘাটতি পূরণ করতে বিজেপি মহারাষ্ট্রের উদ্ধব থ্যাকারের শিবসেনা, শরদ পাওয়ারের এনসিপি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সাংসদদের ‘টার্গেট’ করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া, কয়েকটি ছোটো দলের সাংসদ প্রভূত ‘প্রলোভন’-এর হাতছানিতে ডিগবাজি খেতে পারেন। একইভাবে রাজ্যসভায় এনডিএ-র সাংসদ সংখ্যা ১৪৮। তৃণমূলের তিনজন সাংসদ ইতিমধ্যে ইস্তফা দেওয়ায় সেই আসলগুলিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে সংখ্যাটা বেড়ে হবে ১৫১। তাতেও ঘাটতি থাকবে ১২টি আসন। এখানেও ঘাটতিশূন্য করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন বিজেপি’র ‘খেলোয়াড়রা’। হাতে আছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখানোর অস্ত্র। আর বিলাসবহুল জীবনের টোপ দিলে হয়তো আরও অনেক মাছ জালে উঠবে বলেই বিশ্বাস গেরুয়া শিবিরের। কথাতেই তো আছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ