Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সংকটের অপেক্ষায় মার্কিন অর্থনীতি

ইরানের উপর মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে ‘সাময়িক উদ্বেগ’ বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখেছিলেন।

সংকটের অপেক্ষায় মার্কিন অর্থনীতি
  • ১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৫:০৩
Prefer us on Google

ইরানের উপর মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে ‘সাময়িক উদ্বেগ’ বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখেছিলেন। তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার মিশনের সামনে এই সংকট খুব একটা বড়ো বাধা হবে না বলেই তাঁর ধারণা ছিল। তবে গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টাদের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশে বড়ো ধরনের গলদ ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর ১২ দিন অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধ বিরতির কোনো সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শুরুতে ট্রাম্প হেলায় ইরান জয়ের স্বপ্ন দেখালেও যত দিন যাচ্ছে ততই সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আসন্ন যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া বা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি নিয়ে তাঁরা মোটেও চিন্তিত নন। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দিয়ে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করতে পারে— গোয়েন্দাদের এমন সতর্কতাকে তাঁরা পাত্তাই দেননি। সেই ভুল হিসাবের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে। ইরান মোক্ষম চাল চেলেছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে। বিশ্বে এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয় এই পথ দিয়ে। তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হুহু করে বাড়ছে তেলের দাম। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্ক বাড়ছে। ফলে ট্রাম্পের উপর বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ। নিজের দেশেও তিনি প্রবল বিরোধিতার মুখে। এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে বিপদ বাড়াবেন, নাকি যুদ্ধ বিরতির পথে হাঁটবেন সেটা তাঁকেই ঠিক করতে হবে।

Advertisement

তেহরান সরকার এই যুদ্ধকে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তারা কতটা আক্রমণাত্মক হতে পারে, তা বুঝতেও চরম ভুল করেছেন ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা। গত বছর জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এবার ইরান অনেক বেশি আগ্রাসী। ইরান মনে করছে এই অনৈতিক যুদ্ধে তারা নৈতিক অবস্থানে রয়েছে। তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব শহর এবং ইজরায়েলের জনবহুল এলাকা লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এই সময়কালে ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে ইরানের বিরুদ্ধে হুংকার ছাড়লেও তাঁর সেই মন্তব্যগুলি এতটাই পরস্পরবিরোধী ছিল যে অনেকেই তাতে বিভ্রান্ত। কখনো বলেছেন যুদ্ধ হবে স্বল্পমেয়াদি। দ্রুত ইরানের শাসক বদল করে তাঁর পছন্দের কারও হাতে ইরানের ভার তুলে দিয়ে পিছন থেকে চালাবেন তিনি। যেমনটা তিনি করেছেন ভেনেজুয়েলায়। যেভাবে বোমারু বিমান ও মিশাইল নিয়ে ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েল ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ট্রাম্প মনে করেছিলেন যেকোনো সময় ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। চোখে চোখ রেখে ইরান পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক, আমেরিকা-ইজরায়েলের দুর্ধর্ষ আকাশ যুদ্ধের ক্ষমতার কাছে ইরান শিশু। কিন্তু পালটা হামলাকে তারা যে স্তরে নিয়ে গিয়েছে তাতে ট্রাম্পের মাথাব্যথা যথেষ্ট বেড়ে গিয়েছে। তড়িঘড়ি করে মার্কিন দূতাবাস খালি করা থেকে শুরু করে তেলের দাম কমানোর জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি— সবই চলছে হুটহাট সিদ্ধান্তে। 
খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা (যুদ্ধ) সচিব পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, প্রতিবেশীদের উপর ইরানের এমন বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া পেন্টাগনকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই আক্রমণাত্মক আচরণ মূলত ইরানি শাসনের মরিয়া হওয়ারই প্রমাণ। যুদ্ধ শুরুর আগে কিছু সামরিক উপদেষ্টা সতর্ক করেছিলেন, ইরান এই হামলাকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে এবং আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে অন্য উপদেষ্টারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভেবেছিলেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করতে পারলে তারা যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে। হয়েছে ঠিক উলটো। ইরান পালটা আক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে। এমনকি পৌঁছে গিয়েছে সাইপ্রাস-তুরস্কেও। ইরানের হামলায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের রেডার ব্যবস্থা, মিসাইল-ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। তাদের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। আমেরিকা হাজার হাজার মাইল দূরে। ভেবেছিল, সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন পৌঁছাবে না। কিন্তু পশ্চিম এশিয়া এবং তার আশপাশে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেসব ঘাঁটি ব্যবহার করে আমেরিকা ইরানে হামলা চালাচ্ছে, সেইসব দেশের সেইসব ঘাঁটিকে ইরান তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্য করেছে। মার্কিন দূতাবাস, মার্কিন সংস্থাও তাদের টার্গেট হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজও। ফলে রণতরীগুলিকে দূরে সরিয়ে নিতে হয়েছে। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে পেন্টাগনেরও। যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নিয়ে খোদ ট্রাম্পের বক্তব্যেই কোনো স্থিরতা নেই। তিনি কখনো বলছেন এক মাসের বেশি চলতে পারে, আবার কখনো বলছেন যুদ্ধ ‘প্রায় সম্পূর্ণ’। তবে পেন্টাগনের সাম্প্রতিক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে পেন্টাগনের খরচ হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। আমেরিকার মানুষ বুঝে গিয়েছেন এই যুদ্ধে তাঁদের কোনো লাভ নেই। উলটে যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়ের বোঝা বইতে হবে তাঁদের। যার ফলে মার্কিন অর্থনীতি নতুন সংকটের জন্য অপেক্ষা করছে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ