ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লি: প্যারিসের উপকণ্ঠে ভার্সেই প্যালেস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবসানে বিখ্যাত ভার্সেই শান্তিচুক্তির সাক্ষী রাজা চতুর্দশ লুই নির্মিত প্রাসাদটি। ফ্রান্সের এই ঐতিহাসিক প্রাসাদে বসেই ইরানের সঙ্গে বহুকাঙ্ক্ষিত শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই চুক্তির অঙ্গ হিসাবে সরকারিভাবে সাড়ে তিনমাস পর থামছে যুদ্ধ। খুলে যাচ্ছে হরমুজ প্রণালী। ফলে ঊর্ধ্বমুখী তেল ও গ্যাসের দর আবার সস্তা হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত। ফলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচছে গোটা বিশ্বই। এছাড়া চুক্তির ১৪ দফা শর্তগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল, ইরান তাদের অতি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার কমানোর পদক্ষেপ নেবে এবং তেহরানের উপর জারি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলি মকুব হবে। অবিলম্বে অবাধে তেল বিক্রির অনুমতিও পাবে তেহরান। কূটনৈতিক মহলের মত, এই শান্তিচুক্তি থেকে আমেরিকা যা পেল, তার চেয়ে ঢের বেশি ছাড়তে হয়েছে ইরানের জন্য। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ঘিরে ইতিমধ্যেই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ দশা ট্রাম্পের। শান্তিচুক্তি থেকে ইরান বাড়তি সুবিধা আদায় করায় মার্কিনদেশের রাজনীতিতে তাঁর উপর চাপ বাড়তে চলেছে। দেশের অন্দরে চাপ বাড়তে বাধ্য আরেক রাষ্ট্রনেতারও। তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
এই শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বুক ফুলিয়ে কৃতিত্ব প্রচারে নেমে পড়েছেন। এক্স হ্যান্ডলে তাঁর ঘোষণা, ‘ইসলামাবাদ মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ আজ বৈদ্যুতিনভাবে সই করেছে আমেরিকা ও ইরান। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করায় যুদ্ধ শেষের প্রাথমিক এই চুক্তি অবিলম্বে কার্যকর হচ্ছে।’ পাক প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার প্রভাব ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিতেও এসে পড়েছে। ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তিটি ‘ইসলামাবাদ মউ’ হিসাবে নামাঙ্কিত হওয়ায় মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছে কংগ্রেস। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের কটাক্ষ, এর ফলে পাকিস্তানের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব যে বেড়েছে, সেটাই প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির বিদেশনীতিতে তা বড়ো ধাক্কা। কারণ, মুম্বই হামলার পর এই পাকিস্তানকেই গোটা বিশ্বে একঘরে করে দিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। ‘ইসলামাবাদ মউ’ নামে এই প্রাথমিক চুক্তিতে শত্রুতার স্থায়ী অবসানের কথা বলা হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা চালাতে নির্ধারিত হয়েছে ৬০ দিনের ‘ডেডলাইন’ও। আলোচনার এই প্রক্রিয়ার অন্যতম বিষয় হবে ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু কর্মসূচি। ভার্সেই প্রাসাদে নৈশভোজে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর উপস্থিতিতে চুক্তির ফিজিকাল কপিতে সই করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস প্রকাশিত ভিডিয়োতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।’ তবে ভবিষ্যতে ইরান কোনো গোলমাল করলে ফের হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। ইরানের তরফেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের চুক্তিতে স্বাক্ষরের ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের স্বাক্ষর সহ চুক্তির নথি হাতে ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট।