কেন্দ্রের আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্টের দাবি, ২০২৩-২৪ সালে দেশে বেকারত্বের হার ৩.২ শতাংশে নেমে এসেছে। তত্ত্বগতভাবে এটা বস্তুত ‘পূর্ণ কর্মসংস্থান’ বিবেচনারই শামিল! তবে একইসঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর কৃষি ক্ষেত্রের বাইরে সাড়ে ৭৮ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তখন দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা পৌঁছবে ৯৬ কোটিতে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র ঢক্কানিনাদ তখন সংগত করবে তো? ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের আজকের অতিনিম্ন বৃদ্ধির হার নিয়ে পূর্ণ কর্মসংস্থানের স্বর্গে পৌঁছনো সবসময়ই মস্ত চ্যালেঞ্জ। প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে তুলনাটি মনে রাখতে হবে সর্বাগ্রে, বিশ্বব্যাপী উৎপাদনে আমাদের অংশ মাত্র ২.৮ শতাংশ, সেখানে ২৮.৮ শতাংশ অবদান চীনের। তাহলে এই আশমান-জমিন গ্যাপ পূরণের হাতিয়ার কী হতে পারে? বৃহৎ শিল্প অবশ্যই নয়। কেননা ভারতে বৃহৎ শিল্পের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা পুঁজি। একে তো নিজস্ব পুঁজি (ডিআইআই) অতিসীমিত, অন্যদিকে ভারতের বাজার সম্পর্কে মোহভঙ্গ হচ্ছে বিদেশি পুঁজিরও (এফআইআই, এফডিআই নির্বিশেষে)। তার উপর আজকের বৃহৎ শিল্প অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পে পুঁজির অনুপাতে কর্মসংস্থান যৎকিঞ্চিৎ। ভারতীয় শ্রমিকদের একটি বড় অংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ নেই কিংবা স্বল্প। এই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের চাকরির সুযোগ এখনকার বড় শিল্পে প্রায় নেই। কৃষি ক্ষেত্রের বাইরে, তাদের কর্মসংস্থানের মূল ভরসা এমএসএমই। অতএব ভারতের মতো সুবৃহৎ দেশে এমএসএমই ক্ষেত্রের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। বস্তুত তারাই এদেশের শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রের মেরুদণ্ড। এই ক্ষেত্রই দেশের আর্থিক বৃদ্ধির ইঞ্জিন এবং আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির চালক। গ্রামীণ ও অনগ্রসর এলাকায় এই সেক্টরের বিকল্প ভাবাই যায় না। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাসের প্রশ্নে এমএসএমই’র ভূমিকা অনন্য। সারা দেশে এমএসএমই সংস্থার সংখ্যা ৬ কোটির অধিক। তাদের মাধ্যমে যা উৎপাদন হয় তার পরিমাণ ভারতের জিডিপির আনুমানিক ৮ শতাংশ। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে তাদের অবদান কমবেশি ৪৫ শতাংশ। দেশের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ এমএসএমই ক্ষেত্রে তৈরি।
Advertisement
তাই অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, দেশীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এমএসএমই সেক্টরের প্রতি সরকারের বিশেষ কৃপাদৃষ্টি জরুরি। সাম্প্রতিক অতীতের মধ্যে, করোনার দু-তিন বছরে এমএসএমই সেক্টরের ক্ষতি হয়েছে মারাত্মক। এমন ইউনিট বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক লক্ষ। তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল কর্মসংস্থানের উপর। একটি অতিসাধারণ চাকরির জন্যও যে-দেশে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী টানা লড়াই করেন, সেই দেশেই ওইসময়ে কয়েক লক্ষ মানুষকে কাজ হারাতে হয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ছিল, রুগ্ন বা বন্ধ এমএসএমই ইউনিটগুলিকে বাঁচাতে সরকার কিছু অনুদান দিক কিংবা ব্যবস্থা করুক সহজ শর্তে ঋণের। তাদের জন্য সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও টেলি যোগাযোগের সহায়তা প্রদান এবং করছাড়েরও প্রস্তাব ছিল। আর ছিল জিএসটি আইনকে এমএসএমই সহায়ক করে তোলার পরামর্শ। মোদি সরকার গালভরা প্রকল্প একটি নিয়েছিল বটে কিন্তু তাতে ওই শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রের আদৌ কোনও সুরাহা হয়েছিল কি না সেই সদুত্তর মেলেনি। এমএসএমই’র পাশে দাঁড়াতে পরবর্তীকালেও একাধিক প্রকল্প ঘোষিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বন্ধকহীন ঋণ। অর্থাৎ কোনও সম্পত্তি গচ্ছিত না রেখেই এমএসএমই শিল্পক্ষেত্র যাতে ঋণ পেতে পারে তার কথাই জোর গলায় বলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সেই ঋণও যে পর্যাপ্ত পরিমাণে মিলছে না, তা সম্প্রতি সামনে এনেছে একাধিক বণিক সভা।
এবার আলোচনায় জায়গা নিয়েছে ২০২৩ সালে ঘোষিত ‘বিশ্বকর্মা প্রকল্প’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কারিগর ও খুব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা। কিন্তু গালভরা প্রকল্পটির কী হাল? এমএসএমই মন্ত্রকের এই স্কিমে ২ কোটি ৬৬ লক্ষ আবেদনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন মঞ্জুর হয়েছে মাত্র সাড়ে ২৭ লক্ষের। অর্থাৎ আবেদন ও প্রকল্পের সুবিধালাভের মধ্যে ফারাক বহু যোজনের! মোদি সরকারের গাওনা-বাজনার পাশে বাস্তবে কিছু করে ওঠার রেকর্ড মোটেই ভালো নয়। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গের গরিব উদ্যোগীদের জন্য চালু করেছে পাল্টা প্রকল্প। বাংলার ‘ফিনান্সিয়াল বেনিফিট স্কিম’ মারফত যে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা মোদির প্রকল্পকে বলে বলে দশ গোল দেওয়ার মতোই শ্রেষ্ঠতর। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সৌন্দর্য মেনে মোদি সরকারের উচিত, রাজ্যের প্রকল্পের পাশে দাঁড়ানো। উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিচারে সেটি সুসফল হলে দিনের শেষে জাতীয় অর্থনীতিরই গরিমা বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন ক্ষেত্রে চীনসহ বিগ ব্রাদারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সম্মানে অবতীর্ণ হতে রাজ্যগুলির শক্তিবৃদ্ধির নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।
এবার আলোচনায় জায়গা নিয়েছে ২০২৩ সালে ঘোষিত ‘বিশ্বকর্মা প্রকল্প’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কারিগর ও খুব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা। কিন্তু গালভরা প্রকল্পটির কী হাল? এমএসএমই মন্ত্রকের এই স্কিমে ২ কোটি ৬৬ লক্ষ আবেদনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন মঞ্জুর হয়েছে মাত্র সাড়ে ২৭ লক্ষের। অর্থাৎ আবেদন ও প্রকল্পের সুবিধালাভের মধ্যে ফারাক বহু যোজনের! মোদি সরকারের গাওনা-বাজনার পাশে বাস্তবে কিছু করে ওঠার রেকর্ড মোটেই ভালো নয়। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গের গরিব উদ্যোগীদের জন্য চালু করেছে পাল্টা প্রকল্প। বাংলার ‘ফিনান্সিয়াল বেনিফিট স্কিম’ মারফত যে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা মোদির প্রকল্পকে বলে বলে দশ গোল দেওয়ার মতোই শ্রেষ্ঠতর। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সৌন্দর্য মেনে মোদি সরকারের উচিত, রাজ্যের প্রকল্পের পাশে দাঁড়ানো। উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিচারে সেটি সুসফল হলে দিনের শেষে জাতীয় অর্থনীতিরই গরিমা বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন ক্ষেত্রে চীনসহ বিগ ব্রাদারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সম্মানে অবতীর্ণ হতে রাজ্যগুলির শক্তিবৃদ্ধির নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।


