শান্তনু দত্তগুপ্ত: এসডিপিও আমিনুল ইসলাম খান তাঁর ২০ জনের ফোর্স নিয়ে যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন, মেরেকেটে সেখানে শ’তিনেক বিক্ষোভকারী। সংশোধিত ওয়াকফ আইনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হবে। স্লোগান দেবে। তারপর শেষ। এই ছিল ‘কর্মসূচি’। কিন্তু নিমেষে ছবিটা এভাবে বদলে যাবে, ঠাহরই করতে পারেননি আমিনুল ইসলাম। ধীরে ধীরে স্লোগানের সুর চড়া শুরু হতেই চোখ কুঁচকে গিয়েছিল এসডিপিও’র। ভিড় বাড়ছে জমায়েতে। শয়ে শয়ে লোক ঢুকছে। দু’একটা পাথর পড়ল। সম্বল বলতে হেলমেট, আর আমিনুল ইসলামের দুই রক্ষীর দুটো ঢাল। পোর্টেবল মাইকটা তুলে নিলেন আমিনুল সাহেব... ‘শান্ত থাকুন। উত্তেজনা ছড়াবেন না।’ ওরা শুনছে না। তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে এল, ‘পুলিসগুলোকে আগে মার।’ এক জায়গায় সিঁটিয়ে যাচ্ছেন পুলিসকর্মীরা। বুঝতে পারছেন, এই সংখ্যার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেন না। ঢাল দুটো উঁচুতে তুলে পিছিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। আর পাথরবৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে। কয়েকটা গায়ে লাগল। কিন্তু হঠাৎ পুলিস কর্তা দেখলেন, পুরো ভিড়টা ছুটছে ধুলিয়ান নিউ ডাকবাংলো মোড়ের দিকে। তার মানে টার্গেট জাতীয় সড়ক! ওই ২০ জনের ফোর্স নিয়েই ছুটলেন আমিনুল সাহেব। থামাতে হবে ওদের। বোঝাতে হবে। কিন্তু কাকে বোঝাবেন তিনি? কতজনকে? কিছু এলাকার লোক দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু অনেককেই তো চেনেন না! কারা তারা? বাইরের লোক? পরে দেখা যাবে। আগে তো সামলাই! জনতার ওই উন্মত্ত আচরণের তোয়াক্কা না করে এগিয়ে গেলেন এসডিপিও। দু’-একজনকে বললেনও... ‘এমন কোরো না। প্রতিবাদ করতে তো বাধা নেই! কিন্তু জাতীয় সড়ক অবরোধ, পাথর ছোড়াছুড়ি... এগুলো কী?’ শুনল না কেউ। তাঁর এক রক্ষীর মাথায় এসে পড়ল একটা পাথর। তারপর মুহুর্মুহু। ট্রাফিক গার্ডের অফিসের দেওয়ালে সেঁটে গেলেন তাঁরা। ২০ জন। আর উল্টোদিকে? প্রায় হাজার দশেক। বা তারও বেশি। লাগাতার পাথরবৃষ্টি হচ্ছে। আধলাগুলো পড়ছে শরীরে, আর যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছেন তাঁরা। রেললাইনের পাথর। শক্ত, ধারালো। রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে মাটি। ঢাল দুটোকে সামনে রেখে কোনওমতে বসে পড়েছেন আমিনুল সাহেব। দু’জন গার্ড মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সাহেবকে রক্ষার। বিক্ষোভ জমায়েতের মধ্যে থেকে একজন চিৎকার করে উঠল, ‘কাকে মারছিস? আমাদের ধর্মের লোক। মরে যাবে তো!’ শুনছে না ওরা। থামছে না। কত বয়স ওদের? বেশিরভাগই ১২ থেকে ২১ বছর! আমিনুল সাহেবের মনে হল, এই শেষ। আর বেঁচে ফিরতে পারবেন না। পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের মাথাটা থেঁতলে গিয়েছে। আর একজনের হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরচ্ছে। তাঁর নিজের বুকে-পেটে যন্ত্রণা। পা দুটো চলছে না। হঠাৎ ভাবলেন, রাস্তার ওপারেই তো মসজিদ। একবার ওখানে পৌঁছতে পারলে হয়। মসজিদে নিশ্চয়ই হামলা করবে না। কোনওমতে ছুটলেন তাঁরা। মসজিদের মূল দরজায় তালা। তাও কম্পাউন্ডের মধ্যে তো আছেন। কয়েকজন ঢুকে পড়লেন বাথরুমে। কিন্তু এখানেও যে এসে গিয়েছে ওরা। এত পাথর কোথায় পেল? দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সব রেললাইন থেকে তোলা। দীর্ঘদিন ধরে ‘সঞ্চিত’। কীভাবে জমাল? পুরোটাই কি প্ল্যানিং? জঙ্গিপুরের পুলিস সুপারকে লাগাতার ফোন করে চলেছেন। সঙ্গে মুর্শিদাবাদের ডিআইজি, আর এডিজি দক্ষিণবঙ্গ। ফোর্স আসতে পারছে না। আসবেই বা কীভাবে? জাতীয় সড়কই যে বন্ধ। একমাত্র আশা মালদহের এসপি। তিনি আসছেন। প্রায় ১০০ জনের ফোর্স নিয়ে। এটুকুই আশা। কিন্তু কতক্ষণে আসবেন তাঁরা? প্রতিটা মিনিট এক ঘণ্টার মতো মনে হচ্ছে। ফোনের ওপার থেকে শুনছেন আমিনুল সাহেব, আর কিছুক্ষণ পজিশন ধরে রাখুন। ফোর্স আসছে। ১০-১৫ হাজারের বিরুদ্ধে ১০০ জনও যে কী করবে, জানেন না ওই ২০ পুলিসকর্মী। তাও...। হঠাৎ দেখতে পেলেন আমিনুল সাহেব... সিলিন্ডার আনছে ওরা। বুক কেঁপে উঠল তাঁদের। জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেবে নাকি? আমিনুল সাহেবের সঙ্গে ফরাক্কার ওসি, সূতির আইসি, আর এক সাংবাদিক। সিলিন্ডারের মুখ খুলে ফেলেছে ওরা। চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন আমিনুল সাহেব। উপরওয়ালাকে ডাকছেন। শুনতে পেলেন চিৎকার, ‘আগুন দিবি না।’ পাঁচ দশজন লোক আটকাচ্ছে ওদের। সংখ্যাটা বাড়ছে। সব মন্দ দলেই কয়েকজন ভালো থাকে। এরাই হয়তো তারা। প্রায় শ’খানেক লোক দাঁড়িয়ে পড়েছে আমিনুল সাহেবদের
সামনে। কিন্তু ওই ছেলেটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। আগুন দেবেই। খুব বেশি হলে ১৬-১৭ বছর বয়স। উন্মাদ হয়ে গিয়েছে যেন। ওদেরই মধ্যে একজন আমিনুল সাহেবকে বলল, ‘আমার বাইকের পিছনে উঠে পড়ুন। আপনার অবস্থা ভালো নয়।’ পরিস্থিতির টেনশনে তিনি বুঝতেও পারেননি, হেলমেটের
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে কখন একটা পাথর নাকের ঠিক পাশে এসে লেগেছে। গলগল করে রক্ত পড়ছে ওই ক্ষত দিয়ে। দুটো পায়েই অসহ্য যন্ত্রণা। উঠে পড়লেন তিনি বাইকে। বেরিয়ে পড়লেন ওই বধ্যভূমি থেকে। এক কিমি মতো যেতেই দেখলেন, মালদহের এসপি আসছেন ফোর্স নিয়ে।
আমিনুল ইসলাম খানের সারা শরীরে কালশিটে দাগ, মুখ ফেটেছে। দুটো পায়েই ফ্র্যাকচার। ডিউটি করতে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতো আরও ১৯ জন পুলিসকর্মী। এভাবেই ডিউটি করতে হয় তাঁদের। পর্যাপ্ত ফোর্স নেই, গোয়েন্দা রিপোর্ট থাকলেও তা ঠিকমতো ‘কমিউনিকেট’ করা হয় না, পলিটিক্যাল প্রেশার... তারপরও সব দায় তাঁদের। বিক্ষোভ হলে, কিংবা বাধা দিলে। ছাড় কোথাও নেই। তখন রাজনীতির কারবারিরা ভাবে না, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ
শান্তিপূর্ণ হওয়াটাই গণতান্ত্রিক অধিকার। ওই সীমাটুকু পেরিয়ে গেলে সেটাই আর অধিকার থাকে না। সেটা তখন অপরাধ। প্রতিবাদের নামে খুন, লুটপাট, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের অধিকার কারও নেই। কোনও ধর্মের না। কোনও রাজনীতির না। তাও হচ্ছে। ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনায়। কারা করে এই প্ল্যানিং? কী স্বার্থ তাদের? এই সব প্রশ্নই চলে যায় রাজনীতির অন্তরালে। আমরাও ভেসে যাই রাজনীতির সেই প্রচারের স্রোতে। হারিয়ে ফেলি বিবেচনা করার ক্ষমতাটুকুও। মুর্শিদাবাদে দু’দিন ধরে যা হয়েছে, তাকে ধর্মের রং দিতেই আমরা এখন ব্যস্ত। এক পক্ষ হিন্দু, অন্য পক্ষ মুসলমান... ভাগ হচ্ছে। ভেবে দেখুন তো, এটাই কি চাইছেন আপনি? আমিনুল ইসলাম খানও কিন্তু মুসলমান। তিনি চাইছেন না। তাই বুক পেতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন ১৫ হাজার উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন, এর পিছনে উস্কানি আছে। সদ্য কিশোর ছেলেগুলোকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। লাগাতার। ঠিক যেভাবে আমরা ভুল বুঝছি। মানুষ হিসেবে মানুষকে দেখছি না। আলাদা করে ফেলছি ধর্ম দিয়ে। মাধ্যমটা হয়তো আলাদা। ওদের কোনও কট্টরপন্থী বা জঙ্গিগোষ্ঠীর ‘ক্লাস’। আর আমাদের স্কুলিং সোশ্যাল মিডিয়ায়। দিনের শেষে ক্ষতি কার হচ্ছে? আপনার। আমার। এই বাংলার।
সন্দেশখালি, আর জি কর, মুর্শিদাবাদ... ঘটনা ঘটেছে সর্বত্র। কিন্তু সেই ঘটনাকে হাতিয়ার করে স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি? অস্বীকার করতে পারব আমরা? নিখুঁত প্ল্যানিংয়ে উত্তপ্ত করে তোলা হচ্ছে পরিস্থিতি। কীভাবে মাত্র সাড়ে তিনশো বিক্ষোভকারী আধ ঘণ্টায় ১৫ হাজার হয়ে যায়? কীভাবে বেছে বেছে শুধু হিন্দুদের দোকান লুট হয়? ভাঙচুর চালানো হয় একেবারে মার্কা মেরে? যাঁদের ঘরের লোক চিরতরে চলে গিয়েছে, তাঁরা চোখের কোলে জল রেখেই বলছেন, ‘চিনি না ওদের।’ এলাকার লোক নয় ওরা? বহিরাগত? তার মানে আগে থেকেই সবটা ছকে রাখা ছিল? উন্মত্ত জনতার পক্ষে ‘হিট অব দ্য মোমেন্ট’ বাছাই করা সম্ভব নয়। তখন তারা অন্ধের মতো শুধু ‘নেতা’দের অনুসরণ করে। সূতি, ধুলিয়ানেও সেটাই হয়েছে। শোনা যাচ্ছে কেউ পাঁচ হাজার লোক ‘সাপ্লাই’ দিয়েছে। কেউ তিন হাজার। গত কয়েক মাসে বহু বাংলাদেশি নাকি সূতির লক্ষ্মীপুর করিডর দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে খারিজি মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া জলঙ্গি, লালগোলা। কীভাবে দলে দলে পেরিয়েছে তারা? বিএসএফ তখন কী করছিল? চোখে ছানি পড়েছিল? নাকি পেটে পানি? মূল উদ্দেশ্যটা রাজনীতিক স্বার্থসিদ্ধির। আর তাতে এতটুকুও সন্দেহ নেই। শাসক দলের একটা গোষ্ঠীও কি এর সুযোগ নেয় না? কামায় না? সেটাও হয়। আর তাই বাংলার নিরাপত্তা, সম্প্রীতি, মানবিকতা ঘিরে তৈরি হয় অদ্ভুত এক চক্রব্যূহ। তার মাঝে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ধর্ষণ করা হয়েছে এই বাংলার মাটিকে। এরাজ্যের সম্মানকে। দেশের সব প্রান্তে, বিদেশে পর্যন্ত বাংলাকে তুলে ধরা হয়েছে হীরক রাজার দেশ হিসেবে। ব্যবসায়ীরা বাংলার নাম শুনলে নাক সিঁটকেছে, পর্যটকরা ভেবেছে, ওখানে তো নৈরাজ্য। গিয়ে কাজ নেই। কার লাভ হয়েছে তাতে? সরকারের নিশ্চয়ই নয়! কোনও শাসক, কোনও সরকার নিজের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করবে না। করতে পারে না। কারণ, তারা জানে, দিনের শেষে যাবতীয় দায়বদ্ধতা তাদেরই। উত্তর দিতে হবে সরকারকেই। মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা আজ গোটা দেশের শিরোনামে। বিজেপি দাবি করছে, তৃণমূলই নাকি করিয়েছে। কিন্তু তারা এই প্রচারের আগে একবারও ভাবছে না... এতে তৃণমূলের সত্যিই কোনও লাভ আছে? আগামী বছর ভোট। সাম্প্রদায়িকতার আঁচ বাড়লে তাদেরই ভোটব্যাঙ্কে ধস নামবে। আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে তৃণমূলকেই। লাভ কাদের হবে? বিজেপির। কারণ, মেরুকরণ এবং বিভাজনই যে তাদের অস্ত্র! এই একটি হাতিয়ারে শান দিয়েই লাগাতার ‘সাফল্য’ পেয়ে এসেছে তারা। শুধুমাত্র বাংলা তাদের বারবার দূরে ঠেলে দিয়েছে। মেরুকরণের রাজনীতি যদি সত্যি বাংলার ঘরে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ছাব্বিশের জন্য একচিলতে আলো দেখা যাবে। সেটাই বা কম কী!
একটা সারসত্য আমরা বুঝতে পারছি না... চোখের আড়ালে রাজনীতির বিরাট একটা আইপিএল চলছে। বাঘা বাঘা খেলোয়াড়রা সেখানে ব্যাট করছে। মাঝে মাঝে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’রা এসে মোক্ষম সময়ে উইকেট তুলে নিচ্ছে বা ছয় হাঁকাচ্ছে। আর
আমরা তাতে শুধু হাততালি দিচ্ছি। ভেবে দেখছি না, দিনের শেষে পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আমাদেরই। পায়ের তলা থেকে মানবিকতার জমি সরে যাচ্ছে আমাদেরই। বাড়ি থেকে টেনে বের করে কুপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদেরই। কারা মারা গেল? রাজনীতি বলবে, ওরা হিন্দু। আর আপনি বলবেন, ওরা এই বাংলারই মানুষ। এই ফারাকটা থাকা উচিত। বঙ্গ বিজেপির এক নেতা মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। লিখেছেন। ভিডিও দিয়েছেন। বক্তব্য একটাই, হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁকে ছোট্ট অনুরোধ... আপনারই পোস্টের কমেন্ট সেকশনে একবার যান। গিয়ে দেখুন মানুষ কী বলছে। কেউ লিখেছেন, ‘আগে বলুন, দেশে হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ কোন রাজনৈতিক করেছে? জন্মলগ্ন থেকে বাংলায় বাস করি। কোনওদিন হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ ছিল না। গত ১০ বছরে এখানে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ করছে বিজেপি।’ আর একজন লিখছেন, ‘তোদের নেতারা দিল্লিতে বসে পশ্চিমবঙ্গকে ধীরে ধীরে মরতে দিচ্ছে...’। কারা এঁরা। খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। এরা কেউ তৃণমূল নয়, সিপিএম নয়, বিজেপি নয়। এঁরাই বাংলার মানুষ। ধর্মের এই রাজনীতির মধ্যেও নিজেদের কর্তব্য ভুলে যাননি। আমিনুল ইসলাম খানের মতো। তাই মানবিকতা এখনও হারিয়ে যায়নি বাংলা থেকে। আর শুধু সেই কারণেই বাংলা এখনও গুজরাতও হয়ে যায়নি।