নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রচারের ঢক্কানিনাদই সার। দেশ নাকি এখন উন্নয়নের হাইওয়েতে উঠে পড়েছে! ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে বিশ্বের আঙিনায় আত্মপ্রকাশ করেছে ভারতবর্ষ! বিজেপি সহ সমগ্র গেরুয়া শিবির সারাক্ষণ এই প্রচার করে চলেছে। কিন্তু তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে ঠিক উল্টো কথা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নের ন’টি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিতে ডাহা ফেল করেছে মোদির ভারত। ক্ষুধা ও অপুষ্টি কমিয়ে আনা, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, সুস্বাস্থ্য, লিঙ্গসাম্য, পানীয় জল ও নিকাশি পরিষেবার মতো উন্নয়নের ন’টি মাপকাঠিতে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে আছে ভারত। বিশ্বের ১৬৭টি দেশের মধ্যে এসব উন্নয়ন সূচকে ভারতের স্থান ১০৯ নম্বরে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সিএসই (সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট)-এর ‘স্টেট অব স্টেটস: আর উই অন ট্র্যাক টু অ্যাচিভ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস, ২০৩০’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট। তাতেই উঠে এসেছে দেশের সার্বিক উন্নয়ন-চিত্র, যা আদতে শাসক শিবিরের গালভরা দাবিকে নস্যাৎ করল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
Advertisement
১৬টি ‘সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ বা এসডিজি’র ভিত্তিতে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। তা থেকে জানা যাচ্ছে, ‘জিরো হাঙ্গার’ অর্থাৎ ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূরীকরণের ক্ষেত্রে সন্তোষজনক সাফল্য পায়নি ভারত। দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩২.১ শতাংশের ওজন স্বাভাবিকের থেকে কম (আন্ডারওয়েট)। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ১৩.৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের মধ্যে ৫২.২ শতাংশই ভুগছেন অ্যানিমিয়ায়। বিহার, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ সহ মোট আটটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এক্ষেত্রে ১০০র মধ্যে ৫০ নম্বরও পায়নি। লিঙ্গসাম্যের প্রশ্নে (এসডিজি ৫) দেশের ১২টি রাজ্য ও দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ৫০ শতাংশ নম্বর তুলতে পারেনি। এই তালিকায় আছে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি। শিল্প, উদ্ভাবন ও পরিকাঠামো (এসডিজি ৯) ক্ষেত্রে সম্প্রতি সামান্য উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে ব্যর্থই হয়েছে ভারত। ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, উৎপাদন ক্ষেত্রে যেখানে ১৯.৬৬ শতাংশ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেই জায়গায় ভারতে মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১১.৪২ শতাংশ হচ্ছে এই সেক্টরে। পরিষেবা ক্ষেত্রে ৫২.৯ শতাংশ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ভারতে সেই হার ২৭.৭৫ শতাংশ। ‘ইনোভেশন ইনডেক্স’ বা উদ্ভাবন সূচকে ১০০র মধ্যে ৩৬.৪ জুটেছে ভারতের। সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও (এসডিজি ১০) কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় মহিলাদের জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে টার্গেট ছাপিয়ে গিয়েছে। ৩৩ শতাংশের জায়গায় ৪৫.৬১ শতাংশ মহিলা জনপ্রতিনিধিত্ব সম্পন্ন হয়েছে পঞ্চায়ত ব্যবস্থায়। কিন্তু পেশার জগতে মহিলা-পুরুষ কর্মীর সংখ্যায় সাম্য আনা, এসসি-এসটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের উপর অপরাধ কমিয়ে আনার নিরিখে ভারত এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। দেশে শান্তি, সুবিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সংক্রন্তি বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে ‘এসডিজি ১৬’ অংশে। এই মাপকাঠিতেও বিশ্বের গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ভারত। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখনও এদেশে ১ লক্ষের মধ্যে ৩৭টি শিশু অপরাধের শিকার হচ্ছে। ১০ লক্ষের মধ্যে চারজন পড়ছে মানব পাচারের ফাঁদে।



