


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কসবা গণধর্ষণে অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ও তার দুই শাগরেদের মোবাইল ফোনের গ্যালারিই অশ্লীল ভিডিওর ‘খনি’। শুধু নির্যাতিতাই নন, একাধিক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ভিডিও রয়েছে ডিভাইসে। আর এই সবেরই নেপথ্যে রয়েছে ‘দাদা এমএম’-এর বেলাগাম ক্ষমতার প্রকাশ। ভয় দেখিয়ে ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করা, জোর করে সহবাসের চেষ্টা এবং দুই শাগরেদ প্রমিত মুখোপাধ্যায় ও জায়িব আহমেদকে দিয়ে তার ভিডিও তুলে রাখা। এই ছিল মনোজিতের ‘কর্মপদ্ধতি’। তদন্তে নেমে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে এসেছে পুলিসের। তদন্তকারী অফিসারদের সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই সব ভিডিও একটি পেন ড্রাইভে রাখা হতো। এখন তারই খোঁজ চলছে। তবে নির্যাতিতাকে যে জোর করে অন্য দুই অভিযুক্ত প্রমিত মুখোপাধ্যায় এবং জায়িব আহমেদ গার্ড রুমে নিয়ে গিয়েছিল, সিসি ক্যামেরার সেই ফুটেজ হাতে এসে গিয়েছে পুলিসের। ভিডিও ফুটেজেই দেখা গিয়েছে, আগে গার্ড রুমের দিকে চলে গিয়েছে মনোজিৎ। আর তারপর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওই তরুণীকে। শুধু তাই নয়, পুলিস বাজেয়াপ্ত করেছে প্রমিত এবং জায়িবের মোবাইল ফোনও। তার থেকে ডেটা উদ্ধারের জন্য পাঠানো হয়েছে ফরেন্সিকে। জানা যাচ্ছে, অসংখ্য এমন ভিডিও মিলেছে তাতে। সেই সব ভিডিও তোলার পর ওই দু’জন পাঠিয়ে দিত মনোজিতের মোবাইলে। কিন্তু এই সব ভিডিও দিয়ে তারা কী করত? কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতো, তা খতিয়ে দেখছে পুলিস।
তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, এই মামলায় পুলিসের শক্ত ঘুঁটি হতে চলেছে প্রমিত, জায়িব দু’জনই। এদিন দু’জনের বাড়িতেই সিটের তদন্তকারী অফিসাররা অভিযান চালান। উদ্ধার করেন সেদিনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু প্রমাণ ও নমুনা। তবে একচোট হাঙ্গামা হয় প্রমিতের চ্যাটার্জিহাটের বাড়িতে। বেলা ১২টা নাগাদ হরিনাথ ন্যায়রত্ন লেনে প্রমিতকে নিয়ে পুলিস পৌঁছতেই এলাকার লোকজন ঘিরে ধরেন। রীতিমতো মারমুখী হয়ে ওঠে জনতা। প্রায় ঘণ্টাখানেক প্রমিতকে নিয়ে তার বাড়িতে ছিলেন তদন্তকারীরা। ঘটনার দিন প্রমিতের পরনের পোশাক, অন্তর্বাস ও জুতো উদ্ধার করেছে পুলিস। জায়িবের বাড়ি গিয়েও একই সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। লালবাজার জানিয়েছে, সংগ্রহ করা নমুনায় সিমেন, রক্তের দাগ বা অন্য কোনও স্যাম্পেল রয়েছে কি না, তা জানার জন্য ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে। ফরেন্সিকে গিয়েছে তিনজনের ডিএনএ নমুনাও।
গণধর্ষণে অভিযুক্ত মনোজিৎ পড়াশোনায় মোটেই মেধাবী ছিল না। এমনকী স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাতেও দু’বার ফেল করেছিল সে। ২০১৩ সালে আইন নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার ওই কলেজে ভর্তি হলেও পাঁচ বছরে গণ্ডি পেরতে পারেনি। তাই রি-অ্যাডমিশন নেয় সে। যদিও ২০১৩ সাল থেকেই মনোজিৎ কলেজে টিএমসিপি ইউনিয়নের ‘মাথা’। নতুন ব্যাচ আসার অপেক্ষায় থাকত সে। যে তরুণীকেই ‘মনে ধরত’, তাঁকে ডেকে পাঠানো হতো ইউনিয়ন রুমে। বার্তা যেত, ‘দাদা ডেকেছেন... আলোচনা আছে।’ আর এই পুরো কাজটা করত প্রমিত ও জায়িব। মনোজিৎ প্রথমে তাদের সঙ্গে আলাপ সারত। ইউনিটের সদস্যপদ নেওয়ার জন্য জোর দিত। আর সেইসঙ্গে শুনিয়ে রাখত, কোন কোন ‘নেতা’র সঙ্গে তার ওঠাবসা। এরপর কাজ শুরু হতো জায়িব ও প্রমিতের। তরুণীদের তারা বুঝিয়ে দিত, ‘দাদা’ কী চাইছে, আর তার জন্য ‘কী কী করতে হবে’। কেউ রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাত তারা। এমনকী পরীক্ষায় পাশ করে গেলেও তিনি যাতে বার কাউন্সিলের লাইসেন্স না পান, সেই হুমকি দিত ‘দাদার অনুগামী’রা। সেক্ষেত্রে শাসক দলের এক নেতার নাম বারবার ব্যবহার করত মনোজিৎ। তদন্তে জানা গিয়েছে, কোনও তরুণীকে পছন্দ হলেই তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিত সে। এরপর কলেজের ইউনিয়ন রুমে নিয়ে যাওয়া হত তাঁকে। ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করা হতো। বাধা দিলে বাড়ত নির্যাতনের মাত্রা। মনোজিতের বা ইউনিয়ন রুমে উপস্থিত বাকিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতেও বাধ্য করা হয়েছে বহু পড়ুয়াকে। সূত্রের খবর, আলোচনার নাম করে পছন্দের তরুণীদের নিয়ে যেত মনোজিৎ। সেই গার্ড রুমে।