নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আজ রাত যত গভীর হবে কলকাতার তিন শ্মশান-কেওড়াতলা, নিমতলা আর কাশী মিত্র ঘাট তত যেন অন্য এক পৃথিবীর দরজা খুলে দেবে। সে পৃথিবীর সঙ্গে চেনা কলকাতার মিল নেই। বাতাসে পোড়া কাঠের গন্ধ, চিতার আগুন, প্রিয়জনের দেহের সামনে স্বজনের কান্না। মৃত্যুর এই আবহের মধ্যে জেগে ওঠেন কালী। এমন পুজো কলকাতা রোজ দেখার সুযোগ পায় না। যেখানে জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর দূরত্ব কয়েক হাত মাত্র সেখানে দেবীকে জীবন্ত ভাবে দেখা।
কালীপুজোয় অমাবস্যার ঘনঘোর রাতে কলকাতার চেনা শ্মশানগুলিই হয়ে ওঠে অলৌকিক। এমনিতেই শ্মশানকালীর পুজোয় জড়িয়ে নানা রহস্য, গূঢ় তন্ত্রসাধনা, অপ্রাকৃতিক ঘটনার ঘনঘটা, রোমাঞ্চকর সব গল্প। কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
শোনা যায়, কালীপুজোর রাতে নিমতলায় আগমন হত অঘোরী সাধকদের। তাঁদের সাধনায় শবদেহের প্রয়োজন হত। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ওঠায় এখন শ্মশানের বাইরে হয় শ্মশানকালীর পুজো। আর শ্মশানের ভিতর কাঠের চুল্লির পাশে কালীর একটি ছবি রয়েছে। সেটির পুজো হয়। কাশী মিত্র ঘাটের পুজোর গল্প আরও রোমাঞ্চকর। কলকাতার কুখ্যাত ডাকাত কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি কালী ডাকাত নামে পরিচিত তিনি এই মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেবীর কাছে শক্তি কামনায় তন্ত্রমতে পুজো দিতেন। নরবলিও দিতেন। শ্মশানের জ্বলন্ত চিতা, গঙ্গার হাওয়া এবং ডাকাতিয়া কাহিনির অদ্ভুত সহাবস্থানে কাশী মিত্র ঘাটের শ্মশানকালী উত্তর কলকাতার অন্যতম রহস্যময় পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। কেওড়াতলার কালীও বহু প্রাচীন। ১৮৭০ সাল থেকে এখানে শ্মশানকালীর আরাধনা হচ্ছে। জনশ্রুতি, এক কাপালিক দুই ব্রাহ্মণের সহযোগিতায় পুজো শুরু করেছিলেন। দেবীমূর্তির দু’টি হাত, জিভ বের করা নয়। পুজোয় ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। লোকশ্রুতি, পুজো শুরুর সময় অলৌকিকভাবেই দাহ করার জন্য কোনো না কোনো শবদেহ ঠিক এসে পৌঁছয়। শ্মশানের ঠিক বাইরেই হয় পুজো। সেটি এখন সার্বজনীন। পুজোর কর্মকর্তা জয়দেব দাস বলেন, ‘পুজোর ভোগে ভাত, ফ্রায়েড রাইস, মাছ ইত্যাদির সঙ্গে হাঁসের ডিম দেওয়ার রীতি। পুজের সময় বহু মানুষ খিচুড়ি, পায়েস, তরকারি প্রসাদ পান।’
কলকাতার কালীপুজো আলো ঝলমলে। তবে শ্মশান অন্ধকারাচ্ছন্নই। কালীপুজোর মধ্যরাতে শ্মশানে যখন ঘণ্টা বাজে, ধূপের ধোঁয়া পাক খেয়ে ওঠে আর অমাবস্যার আকাশে চাঁদ থাকে না, তখন মনে হয়, এই অন্ধকারেরও একজন অধিষ্ঠাত্রী আছেন। তিনি শ্মশানকালী। নজরুল শিখিয়েছিলেন, মৃত্যু যেখানে এসে শেষ হয় সেই শ্মশানে জীবনের পুণ্যপথের সন্ধান দেন কালী। ‘মৃতের মাঝে মোর জননী, বিলায় মৃত সঞ্জীবনী...’



