Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিপদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা

‘‘বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না কিংবা তার সাংবিধানিক অধিকার ত্যাগ করবে না ... প্রশাসনের পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ক্ষমতার বাইরে। ... এবং এটি জ্ঞান অর্জন, উৎপাদন এবং প্রচারের জন্য নিবেদিত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

বিপদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
  • ২১ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না কিংবা তার সাংবিধানিক অধিকার ত্যাগ করবে না ... প্রশাসনের পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ক্ষমতার বাইরে। ... এবং এটি জ্ঞান অর্জন, উৎপাদন এবং প্রচারের জন্য নিবেদিত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। কোনও সরকার, সেখানে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কী পড়াতে পারে, কাকে ভর্তি এবং নিয়োগ করতে পারে এবং অধ্যয়ন ও অনুসন্ধানের কোন ক্ষেত্রগুলি অনুসরণ করবে তা ঠিক করে দিতে পারে না।’’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে হস্তক্ষেপের জবাবে কোন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমন কথাটি বলেছেন? উত্তর হল ‘কেউই নন’। এই উক্তিটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও পুরনো) প্রেসিডেন্ট অ্যালান গার্বারের। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতের বিরোধিতা করেছেন, যিনি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি বলে মনে করেন। তার পরিণামে ডোনাল্ড ট্রাম্প হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১৮ হাজার ৭৮৫ কোটির বেশি টাকা) অনুদান এবং ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (৫১২ কোটি ৩২ লক্ষেরও বেশি টাকা) চুক্তি ‘ফ্রিজ’ করে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও ওই বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাম্পের কাছে নতিস্বীকার করেনি। গতমাসে, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩,৪১৫.৪৯ কোটির বেশি টাকা) ফেডারেল তহবিল থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং এই চাপের কাছে নতও হয় তারা।

Advertisement

কোনও স্বায়ত্তশাসন নেই
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটে উল্লেখিত ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩ তারিখের তথ্য অনুসারে ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সংখ্যা ১০৭৪ এবং তাদের বিভাজন এইরকম:
এই সংখ্যায় ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীনতম তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—কলকাতা, মাদ্রাজ এবং বম্বে। বলা বাহুল্য, এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিষ্ঠা স্বাধীনতার অনেক আগেই। যাই হোক, ইউজিসি এবং রাজ্যপাল-আচার্যের মধ্যে মতবিরোধের কারণে, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় কোনও উপাচার্য ছাড়াই ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে চলছে। সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন, ১৯৫৬ অনুসারে ইউজিসি যেভাবে কাজ করেছে তার জন্য ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কোনও স্বায়ত্তশাসন উপভোগের সুযোগ নেই। ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সমন্বয়সাধন এবং তাদের মান নির্ধারণের উদ্দেশ্যে’ এই আইনটি তৈরি করা হয়েছিল। ১২ নম্বর ধারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ‘অনুদান’ বরাদ্দ ও বণ্টনের ক্ষমতা ইউজিসি’কে দিয়েছে। এই অর্থ দেওয়া হয়—বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষাদান, পরীক্ষা এবং গবেষণার মান নির্ধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে। ১৯৮৪ সালে ইউজিসি আইনে ১২এ ধারা যোগ করা হয় এবং সংশোধন করা হয় ১৪ নম্বর ধারা। তার ফলে ইউজিসি’র ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। আর্থিক ক্ষমতার কারণে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতিটি কাজে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউজিসি এমন ‘নিয়ম’ তৈরি করেছে তাতে কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
ইউজিসি হল ‘মস্ত মাতব্বর’
ইউজিসির (এবং ইউজিসি’রই মাধ্যমে আদর্শগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কেন্দ্রীয় সরকারের) নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হয়েছে—অধ্যাপক নিয়োগ, পাঠ্যক্রমের নকশা, গবেষণার ক্ষেত্র, পরীক্ষার পরিকল্পনা ও পরিচালনা প্রভৃতি পর্যন্ত। ইউজিসির হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত কিছু নিয়মের উপর নজর করা যাক:
• সকল শিক্ষক এবং অন্যান্য অ্যাকাডেমিক কর্মীদের যোগ্যতা এবং নিয়োগের উপর নিয়ন্ত্রণ; 
• জাতীয় পর্যায়ের যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষা (এনইটি বা নেট); 
• জাতীয় পর্যায়ের যোগ্যতা নির্ণায়ক এবং প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি বা নিট); 
• যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষা (জেইই);
• বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তির জন্য সাধারণ প্রবেশিকা পরীক্ষা (সিইউইটি বা কুয়েট);
• শিক্ষণ ফলাফল-ভিত্তিক পাঠ্যক্রম কাঠামো (এলওসিএফ);
• পছন্দ ভিত্তিক ক্রেডিট সিস্টেম (সিবিসিএস); এবং
• জাতীয় পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক র‍্যাঙ্কিং কাঠামো (এনআইআরএফ)।
উপাচার্যরা তাঁদের কিছু ‘অব্যবহৃত’ ক্ষমতার প্রয়োগ শুরু করতেই ইউজিসি উপাচার্যদের নির্বাচন এবং তাঁদের নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেয় (পড়ুন: ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ হবেন ইউজিসির ‘ভাইসরয়’!/ ‘বর্তমান’, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫)। আমার মতে, রাজ্য ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধ্যাপক ও অশিক্ষক পদে নির্বাচন এবং নিয়োগে ইউজিসির কোনও ভূমিকা নেই। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগে তো তাদের ভূমিকা নেইই। এমন অনুমতি দেওয়ার অর্থই হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে জাতীয়করণের প্রায় অন্তিম পদক্ষেপ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষতি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের ফলে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের কোনও মঙ্গল হয়েছে কি? বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় (কিউএস-এর তরফে তৈরি) কোনও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায় না। সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্ক পাওয়া ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হল আইআইটি, বম্বে—তার স্থান ১১৮তম। সংসদে জবাব দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে যে, ২১ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেই শূন্য অধ্যাপক পদের সংখ্যা ছিল ৫,১৮২। সংসদের শিক্ষা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি লক্ষ করেছে যে, আইআইটি গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে থেকে প্লেসমেন্টের সংখ্যা কমে গিয়েছে। ২০২১-২২ এবং ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে প্লেসমেন্ট হ্রাস পেয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। এনআইটি গ্র্যাজুয়েটদের প্লেসমেন্টও ১০.৭৭ শতাংশ কমে গিয়েছে। ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র গবেষক হিসেবে ডঃ সি ভি রমনই বিজ্ঞানের জন্য নোবেল পুরস্কার (১৯৩০) পেয়েছেন।
ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বেশ কয়েকটি রোগের শিকার: তাদের কোনও এনডাউমেন্ট ফান্ড (ছাত্রবৃত্তি তহবিল) নেই। অ্যালামনি বা প্রাক্তনীদের তরফেও সহায়তা মেলে সামান্যই। সরকারি অনুদানও পর্যাপ্ত নয়। গবেষণা সংক্রান্ত চুক্তিও তেমন হয় না। অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব মারাত্মক। বিশেষ করে ইউজিসির নিয়ন্ত্রণ মাত্রাতিরিক্ত। রয়েছে চ্যান্সেলর বা আচার্য (রাজ্যপাল) এবং প্রো-চ্যান্সেলরের (সাধারণত শিক্ষামন্ত্রী) হস্তক্ষেপ। রাজনীতির কারবারি এবং আমলাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার অভাব একটিমাত্র উদাহরণ দিয়েই স্পষ্ট করা যেতে পারে: এতদিন পর্যন্ত যে-সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ডিসট্যান্স এডুকেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে তারা বিদেশি এবং দেশের যেকোনও জায়গা থেকেই ছাত্রদের ভর্তি করতে পারত। ইউজিসির সাম্প্রতিক এক নির্দেশে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ সংশ্লিষ্ট রাজ্যের এক থেকে দুটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ অর্জনের জন্য নেই কোনও ইনসেনটিভ। এছাড়া দূরশিক্ষা গ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার ব্যাপারেও শিক্ষার্থীর কাছে পছন্দ-অপছন্দের কোনও মূল্য নেই।
আরও খারাপ খবর হল, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার অবকাশ সংকুচিত হচ্ছে। অসহিষ্ণু গোষ্ঠীগুলি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপর মৌখিক ও শারীরিক উভয়ভাবেই আক্রমণ শুরু করেছে। ওইসব শিক্ষায়তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), দিল্লি ইউনিভার্সিটি (ডিইউ), জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটি, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি (এএমইউ), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, জম্মু ইউনিভার্সিটি প্রভৃতি।
বর্তমান ইউজিসি আইন বাতিল করা উচিত। নতুন পরিকল্পনা নিয়েই পুনরায় প্রণয়ন করা জরুরি সেটি। আর তা যতক্ষণ না করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন সোনার পাথরবাটিই রয়ে যাবে। প্রাক্তনীদের সহায়তায় ছাত্রবৃত্তি চালু করা প্রয়োজন। এই জিনিস না-হলে অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম নামক ব্যাপারটি অলীক কল্পনাই রয়ে যাবে। স্বনির্ভর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিবর্তে, ধনী পরিবার ও কর্পোরেটদের তরফে ‘প্রোমোটেড অ্যান্ড ফান্ডেড’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দ্রুত বিস্তার ঘটবে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। উদ্দেশ্য হতে পারে জনহিতকর কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল হবে বাণিজ্য।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প‍্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ