Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মুসলিম পরিবারের দেওয়া সুতোয় তৈরি হয় শিবভক্তদের পৈতে, সম্প্রীতির অনন্য নজির

মুসলিম পরিবারের দেওয়া সুতোয় তৈরি হয় শিবভক্তদের পৈতে, সম্প্রীতির অনন্য নজির
  • ১৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, পুরুলিয়া: মুসলিম পরিবারের কাছ থেকে বিনামূল্যে সুতো নিয়েই বংশপরম্পরায় নিজেদের ‘পৈতে’ তৈরি করেন লহরিয়ার গাজনের শিবভক্তরা। মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে প্রত্যেকের হাতে ওই সুতো তুলে দেন মুসলিম পরিবারের সদস্যরা। এমনকী, চারদিনের গাজন পুজোর শেষে প্রসাদের নির্দিষ্ট অংশও পান ওই মুসলিম পরিবারের সদস্যরা। নীলের পুজো ও গাজনের এই মেলাকে নিজেদের উৎসব বলেই মনে করে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। উগ্র ধর্মীয় ভাবাবেগের পরিবর্তে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির অনন্য নজির তৈরি করেছে বাঘমুণ্ডির লহরিয়া শিবপুজো কমিটি।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী লহরিয়ার শিবমন্দিরে গাজনের ভক্তরা চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন সকালে বাড়েরিয়া গ্রামের মুসলিম পরিবারে যেতেন। সকলে তাঁদের কাছ থেকে সুতো নিয়ে ওই বাড়িতে বসেই নিজেদের পৈতে তৈরি করতেন। গত ক’বছর ধরে অবশ্য মন্দির চত্বরে এসে সকলের হাতে পৈতের সুতো দিয়ে যান ওই মুসলিম পরিবারের সদস্য কুরবান আনসারী। বাঘমুণ্ডির লহরিয়ার চড়কের মেলায় জেলার পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড থেকেও কয়েক হাজার মানুষ আসে। চৈত্র সংক্রান্তির দু’দিন আগে ‘ফলারের’ মধ্যে দিয়ে পুজো শুরু হয়। পরের দিন সারারাত ধরে চলে ছৌ-নাচ ও মেলা।
স্থানীয় বাসিন্দা তপনচন্দ্র মাহাত বলেন, চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন ‘জাগরণ’ হয়। ওইদিন সকালে বাড়েরিয়া গ্রামের কুরবান আনসারীর বাড়ি গিয়ে ভক্তরা সবাই পৈতের সুতো নিয়ে আসতেন। সেই সুতো দিয়ে ওই বাড়িতে বসেই পৈতে তৈরি করা হতো। পরে জায়গার অভাবে ভক্তরা বাড়ির বাগানে তেঁতুল গাছের নীচে বসে সুতো নিতেন। এখন কুরবান আনসারী গ্রাম থেকে খানিকটা দূরে থাকেন। তাই মন্দিরে এসেই ভক্তদের পৈতের সুতো দিয়ে যান। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই।
বাড়েরিয়া গ্রামের যুবক জয়ন্ত মাহাত বলেন, বাড়েরিয়া সহ স্থানীয় সাতটি গ্রামের বাসিন্দারা এই প্রথা পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই মেনে আসছেন। ঠিক কবে থেকে প্রথা শুরু হয়েছে, সেবিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। কুরবান আনসারীরা এখন আর গ্রামের পুরনো বাড়িতে থাকেন না। তাই মন্দিরে এসেই সুতো দিয়ে যান। বৃদ্ধ পদ্মলোচন মাহাত বলেন, ওই সুতো নেওয়ার জন্য মুসলিম পরিবারকে কোনও অর্থমূল্য দেওয়া হয় না। পয়লা বৈশাখের দিনে ‘পাঁঠা’ বলির পর পুরোহিত সহ বিভিন্ন মানুষ প্রসাদের একটি অংশ পান। তখনই এক অংশ ওই পরিরারকেও দেওয়া হয়। কুরবান সাহেব বলেন, লহরিয়ার চড়কের শিবের পুজোয় ধর্মীয় ভেদাভেদের কোনও প্রশ্নই নেই। দাদুর সময় থেকেই ভক্তরা বাড়ি এসে সুতো নিয়ে যেতেন, দেখেছি। অনেক আগে বাঘমুণ্ডির রাজারা মন্দিরের সেবার জন্য জমি দিয়েছিলেন। গ্রামের পুরনো বাড়িতে এখন আর থাকা হয় না। এবারও তাই মন্দির চত্বরে গিয়ে পৈতের সুতো দিয়ে এসেছি।
মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, চৈত্র সংক্রান্তির দিন সকালে ভক্তরা স্নান করে আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যান। দুপুর পর্যন্ত চলে ‘ভক্তাখুঁটা’। ভক্তরা কেউ পিঠে, কেউ বুকে লোহার শিক ফুঁড়ে নেন। পরে, প্রায় ৪০ফুট লম্বা কাঠের উপর আড়াআড়িভাবে লাগানো আর একটি কাঠে তাঁদের বেঁধে ঘোরানো হয়। ভক্তরা উপর থেকেই সাধারণ মানুষের জন্য প্রসাদ ছুড়ে দেন। পরে লহরিয়ায় পয়লা বৈশাখের দিন প্রায় কয়েকশো ছাগল বলি হয়। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ