সায়ন চট্টোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি: পাহাড়ী উপত্যকা দিয়ে গদাইলস্করি চালে ছুটছে টয় ট্রেন। জানলার ধারে বসে বইয়ে মগ্ন শর্মিলা ঠাকুর। নেপথ্যে বেজে ওঠে মাউথ অর্গানের সুর আর কিশোর কণ্ঠ— ‘মেরে স্বপ্নো কি রানি কব আয়েগি তু...’। হুড খোলা জিপে বসে মহিলাদের হার্ট থ্রব রাজেশ খান্না লিপ দিচ্ছেন সেই গানে। ছ’য়ের দশকের শেষে ‘আরাধনা’ ছবির এই গান মাতাল করে দিয়েছিল আপামর ভারতবাসীকে। গান সহ ছবিটির বহু অংশের শ্যুটিং হয়েছিল দার্জিলিংয়ে। তবে তার আগে থেকেই দার্জিলিংয়ের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরা পড়েছে সেলুলয়েডে। গত সাড়ে সাত দশক ধরে পাহাড়ের বুকে ঢেউ খেলানো চা বাগান, টয়ট্রেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং ম্যাল নজর কেড়েছে ভারতীয় ফিল্ম মহলের।
শুরু সেই ১৯৪৯ সালে। রাজ কাপুর-নার্গিস অভিনীত ‘বরসাত’ ছবির মাধ্যমে। আর আপাতত শেষ হল অনুরাগ বসুর ‘আশিকি-থ্রি’ ছবি দিয়ে। এর মাঝে বহু বিখ্যাত পরিচালক দার্জিলিংকে বেছে নিয়েছেন তাঁদের ছবির পটভূমি হিসেবে। ১৯৬২ সালে সত্যজিত্ রায়ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির ব্যাকড্রপ হিসেবে বেছেছিলেন এই শৈল শহরকেই। দার্জিলিংয়ের পর্যটনের প্রসারে এইসব সিনেমার অবদান যথেষ্ট।
‘বরসাত’, ‘আরাধনা’ ছবির পর থেকেই ‘আইকনিক শ্যুটিংস্পট’ হিসেবে পরিচালকদের পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে এই শহর। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ক্যামেরা, লাইট আর ক্রেন দেখেদেখে এখন অভ্যস্ত দার্জিলিংবাসী। দেবানন্দ-আশাপারেখ অভিনীত ‘যব পেয়ার কিসিসে হোতা হ্যায়’ (১৯৬১) ছবির শ্যুটিং হয়েছিল এই শহরেই। শাম্মি কাপুর-কল্পনা অভিনীত ‘প্রফেসর’ (১৯৬২) ছবিতে ‘ম্যায় চলি ম্যায় চলি’ গানে উঠে এসেছিল বাতাসিয়া লুপের সৌন্দর্য। তারপর ধর্মেন্দ্রর ‘আয়ে দিন বাহারকে’ (১৯৬৬), ‘হামরাজ’ (১৯৬৭), ‘ঝুক গয়া আসমান’ (১৯৬৮) প্রভৃতি ছবিতে যেমন উঠে এসেছে দার্জিলিং, তেমনি অমিতাভ-রেখার ‘বরসাত কি এক রাত’ (১৯৮২), শাহরুখের ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’ (১৯৯২), অঞ্জন দত্তের ‘বড়াদিন’ (১৯৯৮), অপর্ণা সেনের ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’ (২০০২),শাহরুখের ‘ম্যায় হুঁ না’ (২০০৪) প্রভৃতি ছবির শ্যুটিং দার্জিলিংয়ের মুকুটে একের পর এক পালক যুক্ত করেছে। এরপর ‘পরিণিতা’ (২০০৫), ‘ভায়া দার্জিলিং’ (২০০৮), ‘কাহানি ২’ (২০১৬), অনুরাগ বসুরই ‘বরফি’ (২০১২), ‘জগ্গা জাসুস’ (২০১৮) বিশ্ববাসীর কাছে বাড়িয়েছে দার্জিলিংয়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু।
এবার ফের অনুরাগ হাজির হয়েছেন তাঁর ‘আশিকি থ্রি’ ছবির টিম নিয়ে। ডুয়ার্সের পর সিকিম হয়ে কিছুদিন আগেই শৈলশহরে এসেছিলেন তিনি। সিনেমার হিরো কার্তিক আরিয়ান ও দক্ষিণী নায়িকা শ্রীলীলাও এই কয়েকদিনে পাহাড়ে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। পর্যটকরা হিন্দির ছবির দুই তারকাকে চর্মচক্ষে দেখতে পেয়ে থমকে গিয়েছেন। দার্জিলিং নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ অনুরাগ। ক্যাপিটাল হলে শ্যুটিংয়ের ফাঁকে তিনি জানান, পাহাড়, চা বাগান, টয়ট্রেন সবই তাঁর আবেগের জায়গা। এখানে শ্যুটিং করা এক অন্যরকম ভালোলাগা। তাই তো বরফি, জগ্গা জাসুসের পর আশিকি থ্রি নিয়ে ফিরে আসা। উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ে ১২ দিন শ্যুটিংয়ের পর রবিবার দুপুরে বাগডোগরা বিমানবন্দর হয়ে মুম্বইয়ের উদ্দেশে উড়ে যান কার্তিক। বিমানবন্দরে লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমিস করে যান, ফিরে আসবেন দার্জিলিংয়ে।