অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: বাংলায় বর্গী মানেই ধ্বংস, লুটতরাজের ইতিহাস। বাংলার লোকগীতি, লোকায়ত ছড়াতে সে ধারারই বর্ণনা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সাবেক সুবে বাংলার বর্ধমান প্রদেশের এক কোনায় নিভৃতে থেকে গিয়েছে বর্গীদের অন্য ধরনের এক স্মারক। আরও আশ্চর্য এই যে, সেই স্মারকটি একটি ভিন্ন রকমের দুর্গাপ্রতিমা। একটু ভুল হল, মোট আটটি দুর্গাপ্রতিমা। ‘অষ্টনায়িকা’ নামে পরিচিত সেই দেবী হুগলির চুঁচুড়ার নন্দীপাড়ার নন্দীবাড়িতে আজও পুজো পান। বর্গীদের দুর্গাকে শারদোৎসবে নিখাদ বাঙালি দুর্গাপুজোর রীতিতে পুজো করা হয়। সাবেক ধনাঢ্য নন্দীদের ইতিহাস ছুঁয়ে থাকা দরদালানে আজ পুরনো জৌলুস নেই। কিন্তু আছে এক ভিন্ন দুর্গার নিয়ম নিষ্ঠা মেনে পুজো। আর রয়েছে কিছু জনশ্রুতি। নেই শুধু সময়ের জমা-খরচের হিসাব আর নথি।
এ দুর্গার গড়ন বাঙালির চেনা দুর্গার সঙ্গে মেলে না। মেলে এক অন্য ও অনন্য ইতিহাস। বর্গীয় ইতিহাস। নন্দীবাড়িতে বংশ পরম্পরায় অক্ষয় হয়ে আছে সেই লোককথা। জানা যায়, বঙ্গভূম ছাড়ার আগে এক বর্গী সেনানায়ক তাঁর নিজের আরাধ্য দুর্গা মূর্তি দিয়ে গিয়েছিলেন নন্দীদের পূর্বপুরুষকে। সাবেক সুবে বাংলার পরিচিত ব্যবসায়ী নন্দীরা সেই মূর্তি আপন করে নিয়েছিলেন। কত সাল? নাহ্, আজকের নন্দীদের ঠাকুরদালানে সেই কালের কোনও খতিয়ান নেই। তবে একটা অনুমান করাই যায়। ১৭৪২ সালে বাংলায় এসেছিল বর্গীরা। মূলত ১৭৫১ পর্যন্ত বাংলায় তাদের দাপুটে উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। ১৭৪৫ সালে রঘুজী ভোঁসলে নিজে মারাঠা বাহিনী তথা বর্গীদের নিয়ে হুগলিতে এসেছিলেন।
বর্তমানে নন্দীবাড়ির পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন অজিত দে। তাঁর মাকে সমস্ত সম্পদের সঙ্গে পুজোর ভার দিয়েছিলেন নন্দীদের শেষ পুরুষ বৈদ্যনাথ নন্দী। অজিতবাবু বলেন, ‘সাবেক কালের নথি কিছুই নেই। শুধু এক ভিন্ন মূর্তিতে দেবীপুজোর রীতিটাই আমরা পেয়েছি। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত বর্গীদের দিয়ে যাওয়া সেই মূর্তিতেই আমরা পুজো করি। দেবী অষ্টনায়িকা দুর্গা হয়েই আমাদের ঠাকুরদালানে রয়েছেন।’ কেমন মূর্তি বর্গীদের দুর্গার?
একটি অষ্টদল পদ্মের আকারের অষ্টধাতুর মূল কাঠামো। প্রতিটি পদ্মের দল বা পাপড়িতে দেবী দুর্গার এক একটি রূপ উদ্ভাসিত হয়ে আছে। জনশ্রুতি, অষ্টধাতুর ওই পদ্ম আকারের দেবী মূর্তি অধুনা মহারাষ্ট্র থেকে বর্গীরা পুজোর জন্য এনেছিল। সেই মূর্তিই নন্দীদের সঁপে দিয়েছিলেন এক বর্গী সেনানায়ক। আঞ্চলিক ইতিহাসের চর্চাকার সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মনে রাখতে হবে মারাঠারা অষ্টভুজা দুর্গার আরাধনা করতেন। সেই দেবী বাংলার সপরিবার দুর্গার মতো নয়। আর বাংলার পুজোর রীতিতেও অষ্টনায়িকা বা দেবীর অষ্টরূপ অর্থাৎ ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বরাহী, নরসিংহী, ঐন্দ্রী, চামুণ্ডী’র পুজোর রীতি আছে। বাঙালির পুজো রীতিতে অষ্টমীতে সেই অষ্টরূপের পুজো হয়। মূলত ঘট বা পটে পুজোর রীতি গ্রামবাংলায় আজও প্রচলিত।’ সেই নিরিখে বাংলা ও বর্গীদের দুর্গাপুজোর এক বেনজির মেলবন্ধনের সাক্ষ্য বহন করছে চুঁচুড়ার নন্দীদের ঠাকুরদালান। জাঁকজমকের ঘনঘটা হয়ত আজ আর নেই। কিন্তু ইতিহাসের একটি অধ্যায় বুকে ধরে ভিন্ন আলোয় আলোকিত হয়ে আছে বেনজির এক দুর্গাপুজো।