নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁকুড়া: সুতানের জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠপাতা সংগ্রহ করে আদিবাসী বধূদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন প্রমীলা সর্দার। গ্রীষ্মের দাবদাহে মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে জঙ্গলপথে টানা হেঁটে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। বাঁকুড়া-ঝিলিমিলি রাজ্য সড়কের পাশে বটগাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। বাড়িতে কি কাঠের জ্বালানিতেই রান্না হয়? প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনায় গ্যাস পাননি? প্রশ্ন শুনে প্রমীলা বললেন, ‘রাজ্য সরকার রেশনে চাল দিচ্ছে বলে ভাতের অভাব হয় না। দিদি (মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেওয়ায় আনাজ নিয়েও চিন্তা করতে হয় না। তবে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনায় আবেদন করেও অনেকে গ্যাসের সংযোগ পাননি। সিলিন্ডারের যা দাম বেড়েছে, তাতে গ্যাসে রান্না আমাদের কাছে বিলাসিতা। কাঠের জ্বালানিতে রান্না ছাড়া উপায় নেই।’ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রকল্প নিয়ে জঙ্গলমহলে কান পাতলেই এই কথা শোন যাবে। যদিও বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা মানতে চায়নি। তারা অজুহাত খাড়া করে ভোট বৈতরণি পার হতে চাইছে।
খাতড়া বাজারে বসে কথা হচ্ছিল স্থানীয় বাসিন্দা অম্লান দাস, বিপিন মাহাতোর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, গতবারের ভোটে বিজেপির পালে হওয়া ছিল। এবার চোরাস্রোত থাকলেও গেরুয়া শিবিরের কর্মীরা সেভাবে ময়দানে নামেনি। ফলে তৃণমূলের পাল্লা কিছুটা ভারী। তবে তৃণমূল জামানায় খাতড়া মহকুমা হাসপাতালের হাল ফেরেনি। আমাদের এলাকায় মুকুটমণিপুর ড্যাম থাকলেও পরিকল্পনার অভাবে চাষিরা সেচের জল পায় না। সার নিয়েও কালোবাজারি হয়। এইসব বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের নজর দিতে হবে।
উল্লেখ্য, রানিবাঁধ বিধানসভা একসময় বামেদের শক্তঘাঁটি ছিল। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল হলেও জঙ্গলমহলের ওই আসন সিপিএম ধরে রেখেছিল। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সিপিএমের জেলা সম্পাদক দেবলীনা হেমব্রম তখন ওই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। এবারও দেবলীনা প্রার্থী হয়েছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে রানিবাঁধ থেকে জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন তৃণমূলের জ্যোৎস্না মান্ডি। দু’বারের বিধায়ক জ্যোৎস্নার পরিবর্তে এবার ওই কেন্দ্রে তৃণমূল অধ্যাপক তনুশ্রী হাঁসদাকে প্রার্থী করেছে। গতবারের ভোটে বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল চার হাজার। এবার নিজেদের ভোট ফেরাতে সিপিএম মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। সিপিএম সফল হলে বিজেপির কপাল পুড়বে।
রানিবাঁধের বিজেপি প্রার্থী ক্ষুদিরাম টুডু বলেন, তৃণমূল বিরোধী সিংহভাগ ভোট আমরাই পাব। এবার রানিবাঁধে পদ্ম ফুটবে। আদিবাসীরা গ্যাসে রান্না করতে ভয় পান। তাছাড়া জঙ্গলে কাঠ সহজলভ্য। সেই কারণে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা জঙ্গলমহলে সেভাবে সফল হয়নি। তৃণমূল সরকার জঙ্গলমহলে পাইপ পেতেও পানীয় জল দেয়নি। ফলে বিজেপিকে দোষারোপ করে লাভ নেই।
সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম বলেন, আদিবাসীদের জন্য আমরা ল্যাম্পস, আবাসিক হস্টেল, স্কুল তৈরি করেছিলাম। তৃণমূল জমানায় সেগুলি কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বিজেপি ও তৃণমূল ভাতা দেওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। আমরা কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি।
তৃণমূল প্রার্থী তনুশ্রী হাঁসদা বলেন, বিজেপি রাজ্য সরকারকে সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের জন্য কিছুই করেনি। এবারও রানিবাঁধবাসী জোড়াফুলের উপর ভরসা রাখবেন। তৃণমূলের সরকার গঠিত হলে আগামী দিনে আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সবক্ষেত্রেই জঙ্গলমহলের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করব।
বিদায়ী বিধায়ক জ্যোৎস্না মান্ডি বলেন, বিধায়ক কোটার ১০০ শতাংশ টাকা আমি খরচ করেছি। দশ বছরে রানিবাঁধ আমূল বদলে গিয়েছে। রাস্তাঘাট ঝা চকচকে হয়েছে। বাকি কাজও আমাদের সরকার আগামী দিনে করবে।