Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দুটি যুদ্ধ: মানবতার কলঙ্ক

আমি ষষ্ঠ পোপ পলের প্রশংসা করি। ১৯৬৫ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ আর কখনও নয়।’ যুদ্ধ কোনও সমস্যার সমাধান করে না।

দুটি যুদ্ধ: মানবতার কলঙ্ক
  • ৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: আমি ষষ্ঠ পোপ পলের প্রশংসা করি। ১৯৬৫ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ আর কখনও নয়।’ যুদ্ধ কোনও সমস্যার সমাধান করে না। যুদ্ধবিগ্রহ কেবলই তিক্ততার জন্ম দেয় এবং শত্রুতাকে আরও গভীর করে তোলে। একাধিক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বের ৫১টি দেশ ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ তৈরি করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল—যেন সমস্ত দেশ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে। সেই সুবাদে দেশগুলি সমৃদ্ধ হতে পারে যেন। দেশগুলির জনগণের জীবন উন্নত হতে পারে। এতদিন পর এই উপসংহার টানা যায় যে, সেই আশাআকাঙ্ক্ষার পূরণে রাষ্ট্রসংঘ ব্যর্থই হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের মতো আন্তর্জাতিক অভিভাবকের চোখের সামনে গত ৮০ বছরে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছে।

Advertisement

বিশ্বে এই মুহূর্তেও চলছে দুটি বড়ো যুদ্ধ।
রাশিয়া-ইউক্রেন
রাশিয়া ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণ করা থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইউএসএসআর-এর উত্তপ্ত সময়ে, ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি রিপাবলিক বা সাধারণতন্ত্র। অনেক রাশিয়ান এবং রুশভাষী মানুষ ইউক্রেন নামে পরিচিত অঞ্চলে বসবাস করত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সূত্রে ইউক্রেন একটি সার্বভৌম সাধারণতন্ত্রে পরিণত হয়। রাশিয়া ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক নামক অঞ্চলগুলিকে গায়ের জোরে তাদের মানচিত্রে জুড়ে নিয়েছে। এই সংযুক্তিগুলিকে আপাতভাবে মনে হয় রাশিয়ার তরফে অপরিবর্তনীয় অর্জন বা তাদের সত্যিকার সাফল্য। ইউক্রেন আক্রমণের পক্ষে রাশিয়ার যুক্তি ছিল যে, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিল। ন্যাটো দেশগুলি তাদের প্রভাবের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে এবং রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার জন্য ইউক্রেনকে ব্যবহার করছিল।
ইউক্রেন একটি সার্বভৌম দেশ। দেশটি ন্যাটোর সদস্য হোক বা না হোক, তার অস্তিত্বরক্ষার অধিকার রয়েছে। দেশটির স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা বিশ্বকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান যুদ্ধ ইউক্রেনের অস্তিত্বের সামনে হুমকি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনে অন্তত ১৪,১১৬ জন অসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩৬,৪৮১ জন জখম হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনই (ইউএন হিউম্যান রাইটস মনিটরিং মিশন) এই অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি নথিভুক্ত করেছে। ইউক্রেন আজ একটি বিধ্বস্ত ভূমি। সেখানে বহু হাসপাতাল, স্কুল, আবাসন, শিল্প প্রভৃতি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নাগরিক দেশটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সংখ্যাটি ৫৬ লক্ষের মতো। এছাড়া নিজ দেশেই ভিটেছাড়া অবস্থায় কাটাচ্ছে বহু মানুষ। এই সংখ্যাটি নয় নয় করে ৩৭ লক্ষ। উভয় পক্ষেরই, বহু সৈন্য হতাহত হয়েছে। হতাহত সৈন্যের সংখ্যা দশ লক্ষাধিক। এই হতভাগ্যদের মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়ারও বহু সৈন্য।
যেসব পশ্চিমা দেশ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত হতে চায় না তারা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে। তৎসত্ত্বেও মনে হচ্ছে যে, ইউক্রেন এমন একটি যুদ্ধে লিপ্ত, যেটিতে তারা পরাজিত হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতগতি অনুমান করা যায় না। যুদ্ধ থামানোর জন্য প্রেসিডেন্ট পুতিনকে তিনি বাধ্য করতে পারেন, কিন্তু ট্রাম্প সাহেব তা করতে ইচ্ছুক নন। নৈতিকতা এবং বৈধতার প্রশ্নে ইউক্রেন এই যুদ্ধে ঠিক পথে থেকেও অসহায়। তার কারণ দোলাচলে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অতিশয় দুর্বল রাষ্ট্রসংঘ। ইউক্রেন যুদ্ধটি দুটি জাতির মধ্যে সংঘটিত সবচেয়ে অর্থহীন, অনৈতিক এবং অসম যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। 
ইজরায়েল-হামাস
অন্য যুদ্ধটি শুরু করেছিল হামাস। তারা হল প্যালেস্তাইনের অংশবিশেষ গাজা শাসনকারী একটি জঙ্গি গোষ্ঠী। এই অঞ্চলটি অনেক যুদ্ধের সাক্ষী। এই যুদ্ধের ইতিহাস আছে। তা সত্ত্বেও বলব যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলের উপর হামাস সম্পূর্ণ বিনা প্ররোচনায় আক্রমণ করেছিল এবং ঘটনাটি নিন্দনীয়। এই আক্রমণে ১২০০ ইজরায়েলি নরনারী (বেশিরভাগ অসামরিক নাগরিক) নিহত হয়। হামাস ২৫১ জন ইজরায়েলি নাগরিককে পণবন্দি করে। কিছু হজরায়েলি লোক এখনও হামাসের হেপাজতে রয়েছে। ইজরায়েল একটি কঠোর রাষ্ট্র। স্থানীয় সমস্ত মানুষকে উচ্ছেদ করে সমগ্র প্যালেস্তাইনকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে গাজার উপর এক অবিরাম বহুমুখী আক্রমণ চালিয়েছে ইজরায়েল। তারা ইতিমধ্যেই প্যালেস্তাইনের অন্য অংশ—ওয়েস্ট ব্যাংকের বেশিরভাগটা ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে। 
ইজরায়েল পরিষ্কারভাবেই দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্বের (টু-স্টেট থিয়োরি) বিরোধী। গাজায় ৬৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আর সেখানকার পরিকাঠামো ধ্বংস হতে আর তেমন বাকি নেই। খাদ্য, জল এবং ওষুধের অভাবে মানুষ মরছে ওই মুলুকে। হামাসের আক্রমণের প্রতিশোধ নিতেই ইজরায়েল আক্রমণ করেছিল। তার জন্য ইজরায়েলের ভূমিকা তখনকার মতো ন্যায্যতা পেলেও তাদের প্রতিশোধ গ্রহণ প্রক্রিয়া পুরো সামঞ্জস্য হারিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী আকার নিয়েছে সেই আক্রমণ। তাদের এই উদ্দেশ্য অবৈধ এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিস্তিনিদের একটি হোমল্যান্ড বা স্বদেশের অধিকার রয়েছে।
আমি যখন লিখছি, তখন এটা জানা যায়নি যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ হামাস মেনে নেবে কি না, যাতে ইজরায়েলের দাবিগুলিকে যথেষ্ট সমর্থন করা হয়েছে। বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিদের তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি দিতে হলে হামাসের কাছে হয়তো আর কোনও বিকল্প থাকবে না। এই ‘শান্তি পরিকল্পনা’ গ্রহণের অর্থ দাঁড়াবে প্যালেস্তাইনের ভবিষ্যৎ বাইরের নিয়ন্ত্রণের কাছে সমর্পণ করা, যেখানে ১৫৭টি দেশের দ্বারা স্বীকৃত প্যালেস্তাইন কখনও একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে কি না সে বিষয়ে কোনও স্পষ্টতা থাকবে না। হামাস এবং ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে আমাদের অবশ্যই পার্থক্য করতে হবে। এটা হবে হামাসের দুঃসাহসিক অভিযানের কারণে একটা অপমানজনক পরিণতি। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের উপর যে দমনপীড়ন চলছে, এটা সেটাকেই অব্যাহত রাখবে।
অনর্থক যুদ্ধ
ভারত, মোটের উপর, ইউক্রেন যুদ্ধে একটি নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শান্তিরক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে ভারতের যে নৈতিক কর্তৃত্ব এবং ভূমিকা ছিল সেটি বহন করার মতো প্রভাবপ্রতিপত্তি তাঁর নেই। ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধে ভারত মারাত্মকভাবে হোঁচট খেয়েছে। ‘দুই রাষ্ট্র’ পরিকল্পনার (টু স্টেট প্ল্যান) অধীনে ইজরায়েল এবং প্যালেস্তাইন—উভয়েরই অস্তিত্বরক্ষার অধিকার রয়েছে। ভারতের এই দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তবে, সরকার সম্প্রতি বোকামি বুঝতে পেরে তার পদক্ষেপগুলি থেকে পিছিয়ে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে।
এই বিশেষ নিবন্ধের উদ্দেশ্য কেবল দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে ‘শক্তিশালী’ কিছু দেশের তরফে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়। যুদ্ধের সম্পূর্ণ অসারতাও তুলে ধরা এই লেখার বিষয়বস্তু। প্রতিটি দেশেই কিছু যুদ্ধপ্রেমী মানুষ রয়েছে। যুদ্ধই বহু বিরোধের নিষ্পত্তি করতে সক্ষম বলে তারা বিশ্বাস করে। এই যুদ্ধপ্রেমী দর্শন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের সমাধানেও ছড়িয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, ‘যুদ্ধ’-এর জায়গা নেয় ‘হিংস্রতা’ এবং ‘যে শক্তিমান সেই ঠিক’-এর মতো ঘৃণ্য নিয়ম।
জওহরলাল নেহরু, ড্যাগ হ্যামারশোল্ড, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নৈতিক কর্তৃত্বসম্পন্ন নেতাদের আজকের বিশ্বের প্রয়োজন। বিশ্বের সেই জাতিগুলিকে প্রয়োজন, যারা একজোট হয়ে বিবদমান দেশগুলির উপর প্রভাব বিস্তারসহ সুপারপাওয়ারস বা পরাশক্তিগুলিকে দমন করতে পারে। বিশ্বের আরও প্রয়োজন বর্তমান রাষ্ট্রসংঘের মতো নতুন কোনও প্রতিষ্ঠানের। এখন, কেবলই অন্ধকার এবং কোনও ভোরের দেখা নেই।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ