সৌম্যকান্তি ত্রিপাঠী, বেলদা: গরিবের ঘর যেমন হয়, তেমনটাও নয় ফিদি মুর্মুর ঘরখানি। তার থেকেও জীর্ণ, ভাঙাচোরা। মাটির দেওয়ালের বেশ কিছুটা আগেই ধসে গিয়েছে। যে বাঁশের খুঁটির উপর ভর করে অ্যাসবেসটসের চালাটা কোনওক্রমে আছে, সেই খুঁটিগুলিতেও ঘুণ ধরেছে। দেওয়াল ধসে যাওয়ার পর ত্রিপল দিয়ে ঢেকে কোনও রকমে বাড়িটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছিল, সেই ত্রিপলও ছিঁড়ে গিয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের ওড়িশা সীমানা লাগোয়া মোহনপুর ব্লকের নীলদা গ্রাম পঞ্চায়েতের বামুনিয়া এসটি পাড়ার এই ঘরটির সামনে এসে দাঁড়ালে অনেকেরই মাথা নিচু হয়ে আসে। কে বলবে এটি পঞ্চায়েত প্রধান ফিদি মুর্মুর ঘর!
ফিদি মুর্মু নীলদা পঞ্চায়েতের দু’বারের প্রধান। ক্ষমতার দৌলতে যেখানে শাসক দলের বহু নেতা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। অধিকাং, পঞ্চায়েত প্রধান হাঁকাচ্ছেন পেল্লাই বাড়ি। ফিদি মুর্মুকে তাঁদের পাশে একদমই মানায় না। সেইজন্যই তাঁকে নিয়ে এলাকাবাসী গর্ব করেন। এমনকী, বিরোধী দলের মানুষজনও তাঁর এই সততাকে কুর্নিশ করেন। গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্য ঝাড়েশ্বর দাস বলেন, আমাদের প্রধানের সততা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তিনি সত্যিই গর্ব করার মতো মহিলা। তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে যেখানে দুর্নীতির ভুরি ভুরি অভিযোগ, সেখানে আমাদের এই প্রধান স্বচ্ছ।
তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার ফিদি মুর্মুর। ওইটুকু ঘরে তিনটি মেয়েকে রাখবেন কী করে! তাই একজনকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাপের বাড়ি। সেখানে থেকেই কলেজে পড়ে। আরেকজনকে হস্টেলে। ছোট মেয়েকে নিয়ে একাই থাকেন তিনি। স্বামী গাড়িচালক ছিলেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে হঠাৎ করেই ২০২২ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। আর তারপরই মেয়েদের নিয়ে অকূল পাথারে পড়েন তিনি। ২০১৫ সালে কেশিয়াড়িতে মুখ্যমন্ত্রী সভায় এই জায়গার পাট্টা পেয়েছিলেন। সেই জায়গাতেই ঘর তৈরি করছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পরে অর্থের অভাবে মেয়েদের টিউশন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একটু বেশি যে রোজগার করবেন সে উপায়ও নেই। গ্রাম পঞ্চায়েতে সময় দেওয়ার পর আগের মতো গ্রামের কোথাও কাজে যেতে পারেন না। ফলে কোনোমতে ওইটুকু টাকাতেই সংসার চালাতে হয়। সর্বসাকুল্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে ভাতা পান ৫০০০ টাকা। বিধবা ভাতা ও লক্ষীর ভাণ্ডার মিলিয়ে ২২০০ টাকা। স্বামী বেঁচে থাকাকালীন ২০২২ সালে আবাস যোজনায় ঘর পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন এক কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। আর সেই টাকায় সামান্য কিছুটা ঘর তুলেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ায় ঘর আর সম্পূর্ণ করতে পারেননি তিনি।
ফিদিদেবী বলেন, মুখ্যমন্ত্রী আমার আদর্শ, একজন মহিলা হিসেবে তাঁর কাজ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাই দুর্নীতির কথা মাথায় আনতে পারি না। যতটুকু পাই তাতেই খুশি। সৎভাবে থাকার চেষ্টা করি। তবে এই অভাবের সংসারে মাথা গোঁজার একটা ব্যবস্থা হলে মেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে থাকতে পারি।
তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে সংসারের পাশাপাশি গ্রাম পঞ্চায়েত সামলান স্বামীহারা অসীম সাহসী এই মহিলা। জীবনযুদ্ধে অনেক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু হার মানেননি। তাই অনেকের কাছেই ফিদিদেবী আজ আদর্শ।