ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: মহাভারতের সময়কাল থেকে আজকের আধুনিক ভারত। পিছিয়ে পড়া নিষাদ সম্প্রদায়ের একলব্য হোন বা বর্তমান সমাজে দলিত সম্প্রদায়ের রোহিত ভেমুলা— নিম্নবর্গের উপর উচ্চবর্গের দমন-পীড়নের ছবি ফিকে হয় না। সে ছবিই ফুটে উঠবে যাদবপুরের শ্যামাপল্লি শ্যামা সংঘের পুজো মণ্ডপে। এখানে তিন যুবকের মিলিত প্রয়াস ‘থিঙ্কার্স’-এর শিল্পমননে গড়ে উঠছে অভিনব মণ্ডপসজ্জা।
সুলেখা মোড়ের একেবারে কাছে শ্যামা সংঘের ক্লাবের ভিতর এখন চলছে রাজকীয় যজ্ঞ। বড় বড় লোহার খাঁচায় চলছে ধাতু ঝাল দেওয়ার কাজ। বাইরে পড়ে ছোট-বড় রড আর টিনের পাত। সেগুলি মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার হওয়ার অপেক্ষায়। ক্লাবের ভিতর ঢুকে দেখা গিয়েছে, গুরু দ্রোণাচার্যের মূর্তি। প্লাস্টার অব প্যারিস এবং মাটি ও কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন দেওয়াল চিত্র। যাদবপুর চত্বরের অন্যতম পুজো শ্যামা সংঘের ৪৬তম বর্ষে এবারের থিম ‘ভেদ’।
‘ভেদ’—এই কথার মধ্য দিয়ে যেমন বর্ণবৈষম্যের বিভেদকে তারা তুলে ধরবে, তেমনই একইসঙ্গে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে কীভাবে মহাভারতের শূদ্রবর্গ থেকে আজকের দলিতরা এগিয়ে চলেছেন, সেটাও থাকবে তাঁদের কারুকাজে। থিঙ্কার্স-এর তরফে শিল্পী শুভ্রদীপ পাল জানান, মণ্ডপের মূল আকর্ষণ মহাভারতের দুই চরিত্র। একলব্য এবং দ্রোণাচার্য। একলব্য বীর হওয়া সত্ত্বেও ছিলেন নিম্নবর্গের নিষাদ সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই দ্রোণাচার্য চাননি যে, উচ্চবর্গীয় পাণ্ডবদের থেকে তিনি অধিক বীর হয়ে উঠুন। তাই গুরুদক্ষিণা হিসেবে কেটে নিয়েছিলেন একলব্যের বুড়ো আঙুল। প্রাচীন সেই গ্রন্থ হোক বা আজকের সমাজ, নিপীড়ণের শিকার আজও হয়ে চলেছেন নিম্নবর্গের সদস্যরা। সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকর বা অন্ধ্রপ্রদেশের মেধাবী গবেষক রোহিত ভেমুলা। উচ্চবর্গের অত্যাচারের শিকার হয়েছেন এঁরাও। স্বাধীনতার এতবছর পরও ভেমুলার মতো অনেককেই দলিত হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে। তবে বিভেদকে অতিক্রম করে শূদ্র-দলিত-নিম্নবর্গের যে লড়াই, যে লক্ষ্যভেদ, সেই সত্যই দেখা যাবে শ্যামা সংঘের মণ্ডপে। দেবী দুর্গার রূপেও থাকবে সেই থিমের ছোঁয়া।
ধর্ম হোক বা ধর্মাচার। আদতে মানবিকতায় কোনও ভেদাভেদ নেই, সেই বার্তাই দেবে যাদবপুরেরই অন্য এক পুজো। শ্যামা সংঘ দেখে যাদবপুর মেন রোড হয়ে বাঘাযতীনের দিকে কিছুটা এগলে অ্যাথলেটিক ক্লাবের পুজো। কমিটির সম্পাদক দীপাঞ্জন দত্ত জানালেন, এবারের থিম ‘একত্ব’। একত্ব লুকিয়ে রয়েছে আমার-আপনার রক্তে। রক্তের ফোঁটায় না আছে হিন্দু, না আছে মুসলমান। অথচ সেই চরম সত্যকে ভুলে মানুষ একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। বিভাজনের উস্কানিতে পা মেলাচ্ছেন। যাদবপুর অ্যাথলেটিকের মণ্ডপসজ্জা ঘিরে থাকবে রক্তবিন্দুর সেই মাহাত্ম্য। এবার ৫২তম বর্ষে শিল্পী অনুপ ঘড়াইয়ের হাত ধরে প্রতিমার রূপেও থাকবে সেই মানবিকতার পাঠ। সঙ্গে আরও এক বার্তা, ধর্ম আলাদা হলেও উৎসবের আঙিনায় হিন্দু-মুসলিম সবাই এক। পুজোর আনন্দে ভেদাভেদ ভুলে একত্ব হয়ে ওঠার যে আনন্দ তারই প্রদর্শন করতে চলেছে যাদবপুর অ্যাথলেটিক।