সংবাদদাতা, উলুবেড়িয়া: তিনিই জানিয়েছিলেন, ‘গাছেরও প্রাণ আছে’। চমকে গিয়েছিল বিশ্ব। সেই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ফুলেশ্বরের কালসাপায় নিজে হাতে বসিয়েছিলেন দু’টি বকুল গাছ। সে প্রাচীন গাছ দু’টির প্রাণই এখন যেতে বসেছে। অভিযোগ, বহিগতদের অত্যাচার এবং সেচ দফতরের উদাসীনতার কারণে কালসাপার সেচ বাংলোর কাছে থাকা গাছ দু’টির জীবন যায় যায়।
অভিযোগ, জগদীশ বসুর গাছের রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। গাছের গুঁড়িতে বড় আকারের গর্ত। তাতে পোড়া বিড়ি-সিগারেট ফেলেন অনেকে। চায়ের ভাঁড় ফেলেন। মদের বোতল ফেলেন। গাছের গোড়ায় সর্বদা জমে থাকে শুকনো পাতা। সব দেখে ক্ষুব্ধ হন পরিবেশকর্মীরা। স্থানীয় মানুষও ক্ষোভ জানান। তবে উদাসীনতা কিছুতেই কাটে না প্রশাসনের। দেখেও দেখেন না কর্তারা। গাছ দু’টি মৃতপ্রায় হয়েও দাঁড়িয়ে থাকে। অবিরত অক্সিজেন সাপ্লাই করে যায়। তবু পরিবেশ নির্মল রাখার দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে।
রবিবার জগদীশ বসুর জন্মদিন ছিল। বাগনানের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাছ দু’টির কাছে গিয়েছিল। জায়গাটি সাধ্যমতো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে তারা। আচার্যের নামাঙ্কিত স্মৃতিফলকটি জল দিয়ে ধুয়ে দেয়। সংস্থার কর্মকর্তা চন্দ্রনাথ বসু বলেন, ‘খুবই হতাশাজনক বিষয়। ঐতিহাসিক গাছ দু’টি রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব নেওয়া উচিত সেচ দফতরের।’ তিনি জানান, খুব শীঘ্রই এ নিয়ে সেচ দফতরে স্মারকলিপি জমা দেবেন তাঁরা। হুগলি নদীর তীরে গাছগাছালিতে ভরা মনোরম পরিবেশ কালসাপার। সেচ বাংলো সংলগ্ন এলাকাটি খুব সুন্দর। পর্যটনের মরসুমে বহু পর্যটক বেড়াতে আসেন। তাঁরা হাঁ করে দেখেন স্বয়ং জগদীশ বসুর বসানো গাছটি। কেউ নমস্কার করেন। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখেন গাছের শরীর। দু’টি বকুল গাছ জানিয়ে দেয়, তাঁদেরও প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল। করেছিলেন আচার্য জগদীশ বসু স্বয়ং।
সে দু’টি গাছের চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়েছিল এককালে। পাশে আচার্যের নামাঙ্কিত ফলক বসানো হয়েছিল। সে দু’টি বড় হয়েছে। ডালপালা মেলে আশ্রয় দেয় মানুষকে। জীবজগৎকে শ্বাসগ্রহণের অক্সিজেন দেয়। তবে তাঁদের চেহারা প্রাণহীন। গোড়ায় বড় গর্ত। নেশাড়ুরা মদের বোতল ফেলেন সেখানে। শুধু কি বোতল? যা পারেন সব জঞ্জাল ফেলে যান। এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘এই দু’টি গাছ আমাদের গর্ব। কিন্তু কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। কেউ কোনও উদ্যোগ নেয় না।’ তাঁরা জানান, বছরখানেক আগে উলুবেড়িয়া পুরসভা একবার গাছ সংলগ্ন এলাকা পরিস্কার করেছিল। তবে সেই একবার। তারপর আবার যেমনকার তেমন অবস্থা। বাসিন্দাদের দাবি, প্রথমেই গাছের চারপাশ ঘিরে উঁচু করে লোহার জাল দেওয়া হোক। নিয়মিত দেখভাল করা হোক। নাহলে গাছ মরে যাবে। অজয় দাস নামে এক পরিবেশকর্মী বলেন, ‘জগদীশচন্দ্র বসু এখানে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তারপর ক্যানাল দিয়ে মেদিনীপুর গিয়েছিলেন। এই গাছ এরকম বহু ইতিহাস সঙ্গে করে দাঁড়িয়ে। দু’টির প্রতি যত্নবান হওয়াটা কর্তব্য হওয়া উচিত।’