অভিষেক পাল, বহরমপুর: আশঙ্কা হল সত্যি! এসআইআর শুরুর প্রথম থেকেই গেরুয়া বাহিনীর টার্গেট ছিল সংখ্যালঘু ভোটার। কমিশনকে দিয়ে সেই কাজ হাঁসিল করতে মরিয়া ছিল বিজেপি। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার এহেন অশুভ চেষ্টায় আংশিক হলেও সফল তারা। রীতিমতো তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বিজেপি ও কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মুর্শিদাবাদ জেলা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল তৃণমূল।
গোটা রাজ্যের মধ্যে বিচারাধীন ভোটার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। তৃণমূলের বক্তব্য, জেলার প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটারই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এখনও ১১ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বিবেচনা করছেন বিচারকরা। বিবেচনার প্রথম সারিতে রয়েছে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত বিধানসভাগুলি। প্রতিটি জায়গায় দেখে দেখে বিবেচনাধীন ভোটারের তালিকা দীর্ঘ করা হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় বাদ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভোটারদের। স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘুদের মনেও প্রশ্ন উঠেছে। উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তাঁদের একটা বড় অংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা দখলের ব্লু-প্রিন্টের এই এসআইআর সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। হাতে গরম প্রমাণ বহরমপুর ও মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্র। নাম বাতিলের শীর্ষে বিজেপির দখলে থাকা এই দুই কেন্দ্র। দু’টি কেন্দ্রে বিজেপির জয় আরও সুনিশ্চিত করতে অধিকাংশ মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তৃণমূলের অভিযোগ। কমিশন সূত্রে খবর, মুর্শিদাবাদ বিধানসভায় ৪ হাজার ৩৬৯ এবং বহরমপুর বিধানসভায় ৩ হাজার ৫০৯ জনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
জেলায় প্রকাশিত পুরো তালিকা দেখে রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, যেসব কেন্দ্র তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি, সেখানে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা সর্বাধিক। ভোটারের তথ্য বিবেচনাধীন সব থেকে বেশি ছিল সামশেরগঞ্জ, সূতি, রঘুনাথগঞ্জ, রানিগর, জঙ্গিপুর, লালগোলা ও ফরাক্কা বিধানসভায়। বিচারকরা তথ্য যাচাই যখন শুরু করেছিলেন, তখন সামশেরগঞ্জ বিধানসভায় ১ লক্ষ ১৯ হাজার মানুষের ভোটের নথি যাচাই করা শুরু হয়েছিল। সূতি বিধানসভায় ১ লক্ষ ১১ হাজারের বেশি ভোটারের নথি বিবেচনাধীন রয়েছে। রঘুনাথগঞ্জ বিধানসভায় ১ লক্ষ ৯ হাজার, ভগবানগোলা বিধানসভায় ৯৮ হাজারের বেশি ভোটার বিবেচনাধীন। সীমান্তবর্তী রানিনগর বিধানসভায় ১ লক্ষ ১ হাজার ভোটার বিবেচনাধীন। জঙ্গিপুর বিধানসভায় ৮৬ হাজার ও লালগোলা বিধানসভায় ৮৭ হাজারের বেশি ভোটার বিবেচনাধীন ছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে আবার বিজেপির জয়ী হওয়া দু’টি বিধানসভায় ভোটার বাতিলের তালিকায় শীর্ষে। সংখ্যালঘু ভোট বাতিলের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিকভাবে কমিশনকে বিজেপি ব্যবহার করেছে বলে আঙুল তুলছে তৃণমূল।
জেলা তৃণমূলের সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন, ‘বিজেপির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন নির্বাচন কমিশন। দেখে দেখে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। ১১ লক্ষের বেশি ভোটার বিবেচনাধীন। যে বিধানসভায় বিজেপি জিতেছিল, সেখানে এবার তারা হারবে সেটা জেনে গিয়েছে বলেই দেখে দেখে মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই ভাবে কী গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা যায়? মানুষ আগামী নির্বাচনে এর জবাব দেবে। এসআইআরের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মানুষকে হয়রানি করছে। জেলার বহু মানুষ ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকেই ভোটার তালিকায় নাম দেখতে না পেরে আতঙ্কিত।’ যদিও বিজেপির রাজ্য কমিটির সম্পাদক শাখারভ সরকার বলেন, ‘এসআইআর নিয়ে মানুষকে প্রথম থেকে ভুল বোঝাচ্ছে শাসক দল। যারা এদেশের নাগরিক এবং ভোটাধিকার রয়েছে, তাঁরাই শুধুমাত্র ভোট দিতে পারবেন। কমিশন সঠিক ভোটারদের বেছে নিতে এই প্রক্রিয়া চালু করেছে।’