নিজস্ব প্রতিনিধি, কোলাঘাট: আগেই উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ভেঙে ফেলা হয়েছিল বয়লারও। রবিবার দুপুর দেড়টায় কোলাঘাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জোড়া চিমনিও ভেঙে ফেলা হল। ১১এপ্রিল ওই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিনিয়র ম্যানেজার(মানবসম্পদ ও প্রশাসন) ওই দু’টি চিমনি ভাঙার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। ওই খবর জানাজানি হতেই এদিন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র লাগোয়া রাস্তার উপর উৎসাহী মানুষের ভিড় জমে যায়। ভেঙে পড়ার মুহূর্তকে চাক্ষুষ করতে এবং মোবাইলবন্দি রাখতে দীঘাগামী পর্যটকরাও দাঁড়িয়ে পড়েন। ঠিক দেড়টা নাগাদ ডিনামাইট ফাটানো হয়। ১নম্বর ইউনিটের চিমনি নীচে ধসে পড়ে। আর ২নম্বর ইউনিটের চিমনি হেলে নীচে পড়ে। সেইসঙ্গে কোলাঘাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চিমনি সংখ্যা ছয় থেকে কমে দাঁড়াল চার।
আগেভাগে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এদিন ক্যান্টিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। মর্নিং শিফটে কাজ করা কর্মীদের বেলা ১১টার মধ্যেই পার্সেল করা খাবার সরবরাহ করা হয়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গেটেও কড়াকড়ি ছিল। ৫নম্বর গেটে নুপুর ২টো পর্যন্ত কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যেকারণে ওই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীরা গেটের বাইরে অপেক্ষা করেছিলেন। ২নম্বর গেট দিয়ে জরুরি পরিষেবার কাজে যুক্ত অফিসার-কর্মীরা ভিতরে যান। এজন্য গেটে রেজিস্টার রাখা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে কোলাঘাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রথম তিনটি ইউনিট চালু হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এর উদ্বোধন করেন। এরপর ১৯৯২সালে আরও তিনটি ইউনিট চালু হয়। ’৮৪সালে চালু হওয়া তিনটি ইউনিটের মধ্যে রয়েছে ১ ও ২নম্বর ইউনিট। প্রত্যেকটি ইউনিট ২১০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। ৪১বছরের পুরনো ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমশ কমছিল। সেইসঙ্গে ছাই থেকে দূষণের মাত্রাও বেশি। এখানকার দূষণ নিয়ে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালে মামলা হয়। তাতে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি দূষণ রোধে ছ’টি ইউনিটে অত্যাধুনিক মানের ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর(ইএসপি) বসানোর নির্দেশ দেয়। সেইমতো ছ’টি ইউনিটে ওই যন্ত্র বসানো হয়। কিন্তু, পুরনো মডেলের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট আধুনিকীকরণ জরুরি হয়ে পড়ছিল। ওই অবস্থায় ওই দুই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু, অন্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কারণে কোলাঘাটের চার দশকের পুরনো এই দুই ইউনিটকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস ধাক্কা খায়। ছ’মাস আগেই ওই দুই ইউনিটের বয়লার ভেঙে ফেলা হয়েছে। রবিবার ডিনামাইট ফাটিয়ে জোড়া চিমনিও ধুলিসাৎ করা হল।
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫নম্বর গেটে এদিন দাঁড়িয়েছিলেন তমলুক ব্লকের নীলকুণ্ঠা গ্রামের মধুসূদন হাজরা, উত্তর ২৪পরগনার শ্যামপুরের সমীর সরকার। তাঁরা প্রত্যেকেই এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিকাকর্মী। মধুসূদনবাবু এখানকার খালাসি। সমীরবাবু ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন। মধুসূদনবাবু বলেন, ১৯৮০-’৮২সাল নাগাদ ওই চিমনি তৈরির সময় আমি যন্ত্রাংশ মাথায় বয়ে এনেছি। আর আজ আমার চোখের সামনে ৪১বছরের পুরনো জোড়া চিমনি ইতিহাস হয়ে গেল। সমীরবাবু বলেন, আগেই বয়লার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই জানতাম, চিমনি জোড়া ধুলিসাৎ হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ১ ও ২নম্বর ইউনিট। আগামী দিনে ওই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নতুন এক জোড়া ইউনিট গড়ে উঠুক, এটাই চাইছেন কোলাঘাট তথা পূর্ব মেদিনীপুরবাসী।