Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

টুসু সহ বিভিন্ন পরবের গানে বেঁচে আছে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ডাঁয়া ঝাড়গাঁয়ী

টুসু সহ বিভিন্ন পরবের গানে বেঁচে আছে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ডাঁয়া ঝাড়গাঁয়ী
  • ১২ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: জঙ্গলমহলের প্রাণের উৎসব টুসু। হাতে গোনা কয়েকদিন পর ঘরে ঘরে শুরু হবে উৎসব। কুমারী মেয়েরা তুষের ডালি সাজিয়ে টুপুর বন্দনা করবে। পুজোয় নির্দিষ্ট মন্ত্র, উপাচার নেই। সুবর্ণরেখা অববাহিকার মানুষের আপন ভাষায় টুসু পূজিত হবেন। আদিবাসীদের ভালাবাসার ভাষায় যার নাম ডাঁয়া ঝাড়গাঁয়ী বা সুবর্ণরৈখিক । 
Advertisement
সুবর্ণরেখা নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকাজুড়ে নানা গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। প্রান্তিক সেইসব মানুষের মুখের ভাষা ‘ডাঁয়া ঝাড়গাঁয়ী’। বাংলা ও ওড়িয়া ভাষার মাঝামাঝি এই কথ্য ভাষাকে ‘মাঝিয়া ভাষা’ও বলা হয়। আবার ‘দেড় গুজারি’ ভাষা নামে বিভিন্ন এলাকায় এই ভাষা পরিচিত। বর্তমানে এই ভাষাকে সুবর্ণরৈখিক বাংলা বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই ভাষা সুবর্ণরেখা নদী উপত্যকার প্রান্তিক এলাকার মানুষের মুখের ভাষা। বাংলা, ওড়িয়া, ঝাড়খণ্ডী ও সাঁওতালি ভাষার মিশ্রণে ঝাড়গ্রামের দক্ষিণ অংশে কথ্য ভাষা তৈরি হয়েছিল। হাজার বছর ধরে যে ভাষায় এই এলাকার মানুষ নিজেদের মনের কথা বলেছেন। স্থানীয় লোক সংস্কৃতিতে এই ভাষা জায়গা করে নিয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন পরব, লোক  উৎসবে আজও উচ্চারিত হচ্ছে সেই ভাষা। সুবর্ণরেখা তীরবর্তী প্রান্তিক মানুষের লৌকিক পুজো পরব, উৎসব, অনুষ্ঠানে আজও এই ভাষা ব্যবহার করেন। যদিও এই ভাষা এখন লুপ্ত হওয়ার পথে। আধুনিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে ‘ডাঁয়া ঝাড়গাঁয়ী’ ভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। যদিও সুবর্ণরৈখিক বাংলা হিসেবে এই ভাষার নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। সুবর্ণরেখা অববাহিকার বসবাসকারী মানুষ সহস্র বছর ধরে এই ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। জঙ্গলমহলের মানুষের অতীত ইতিহাস এই ভাষার মধ্যে আজও টিকে আছে। ব্রিটিশ পূর্ববর্তী সময়ের প্রামাণ্য তথ্য খুব বেশি নেই। আঞ্চলিক গবেষকদের অভিমত সুবর্ণরৈখিক বাংলার ভাষা জঙ্গলমহল এলাকার অতীত ইতিহাসের সন্ধান দিতে পারে। নয়াগ্ৰাম ব্লকে মলম এলাকার বাসিন্দা চিন্ময় মাহাত বলেন, এলাকার বয়স্ক মানুষেরা এখনও এই ভাষায় কথা বলেন। উৎসব অনুষ্ঠান যেসব লৌকিক গান গাওয়া হয়, সেখানেও এই ভাষা ব্যবহৃত হয়। গ্ৰামের মেয়েদের মুখে মুখে গানের কথায় টিকে আছে সেই ভাষা। যদিও এই ভাষা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। অল্পবয়সিরা এই ভাষায় আর কথা বলে না। শহুরে ভাষায় তারা অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে। আঞ্চলিক গবেষক লক্ষ্মীন্দর পালই বলেন, সুবর্ণরেখা অববাহিকার বসবাসকারী মানুষের নিজস্ব এক ভাষা ছিল‌।  সহস্র বছর ধরে এই এলাকার মানুষ সেই ভাষায় কথা বলেছেন। লোক উৎসব, পার্বণে গাওয়া গানে অতীত দিনের ছবি ধরা আছে। জঙ্গলমহলের অতীত সময়ের প্রামাণ্য নথি বেশি নেই। কিন্তু টুসু গানে জঙ্গল এলাকার মানুষের কঠোর জীবনযাপনের ছবি ধরা পড়ে। ব্রিটিশ শাসনকালে জঙ্গলের গাছ কাটা নিয়ে এখানকার মানুষের প্রতিবাদের গান আছে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠার কথা গানে ফুটে উঠেছে । এই ভাষার নিবিড় গবেষণা হলে জঙ্গলমহলের বহু  অজানা অতীতের পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
সম্পর্কিত সংবাদ