Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সত্য সামনে এল

৩২ বছর পর আবার একটা ‘জয়’ ছিনিয়ে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গ-রাজনীতিতে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই এক রক্ত ঝরানো আন্দোলনের দিন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়েছে।

সত্য সামনে এল
  • ৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

৩২ বছর পর আবার একটা ‘জয়’ ছিনিয়ে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গ-রাজনীতিতে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই এক রক্ত ঝরানো আন্দোলনের দিন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়েছে। তখন রাজ্যের বিরোধী দল কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, এর দু’বছর আগে ১৯৯১ সালের বিধানসভা ভোটে ভোটার তালিকায় কারচুপি করে জিতেছে বামফ্রন্ট। তাই সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের ডাক দেন তৎকালীন যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা। ওইদিন সকাল ১০টার পর মহাকরণকে ঘিরে পাঁচটি এলাকা থেকে যুব কংগ্রেসের কর্মী সমর্থকরা এগতে থাকেন। রাস্তায় নামেন মমতাও। পুলিস আন্দোলনকারীদের আটকালে সংঘর্ষ বাঁধে। মমতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার নামে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিস। তাতে ১৩ জন মারা যান। সেই থেকে প্রতিবছর ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ হিসাবে পালন করে চলেছেন সেদিনের যুবনেত্রী, আজকের মুখ্যমন্ত্রী। এই ঘটনার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। শেষমেশ মমতার দাবি মতো সেবছরই গোটা দেশে সচিত্র পরিচয়পত্র চালু করার নির্দেশ দেন তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন। সেই থেকে আজও লোকসভা, বিধানসভা ও পুরসভার নির্বাচন হচ্ছে সচিত্র পরিচয়পত্রকে সামনে রেখে। প্রতিটি বৈধ ভোটারের প্রধান পরিচয়পত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই এপিক কার্ড। গোটা দেশে আন্দোলনের ফসল এপিক কার্ড চালুর তিন দশকেরও বেশি সময় পর আরও একবার নিজেদের ব্যর্থতা মেনে মমতার দাবির কাছে নতি স্বীকার করল নির্বাচন কমিশন। এবারেও ‘জয়’ ছিনিয়ে আনার মূল কারিগরের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

এদেশে ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটার থাকার অভিযোগ নতুন নয়। লোকসভা বা যে কোনও রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এলেই শাসক ও বিরোধী প্রায় সবপক্ষই ভুয়ো ভোটারের অভিযোগে সরব হয়। ভোটার তালিকার সংশোধন করে ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়ার ঘোষণা শোনা যায় প্রতিবারই। কিন্তু সেই একই অভিযোগ আবার ওঠে পরবর্তী কোনও  ভোটের আগে। কিন্তু এবার ‘ভূতুড়ে ভোটারের’ অভিযোগে উত্তাল গোটা দেশ। কী এই ভূতুড়ে ভোটার? দেখা যাচ্ছে, একই এপিক নম্বরে ভিন রাজ্যের লোকের নাম ঢুকে পড়েছে ভোটার হিসেবে। ভোটার তালিকায় ভিন রাজ্যের ভোটারদের নাম তুলে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বাজিমাত করেছে বলে অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। যেমন দিল্লিতে দেখা গিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে পর্যন্ত রাজধানীতে যে সংখ্যায় ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায় সমসংখ্যক ভোটার বেড়েছে ’২৪ এর লোকসভা ভোটের পর থেকে দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগের সাত মাসে! এইসব দৃষ্টান্ত টেনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে একের পর এক উদাহরণ তুলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, বিজেপি ভিন রাজ্যের ‘ভূতুড়ে’ ভোটার ঢুকিয়ে বাংলা দখলের পরিকল্পনা করেছে। তাঁর নির্দেশে গোটা দল ময়দানে নেমে যেসব তথ্য সংগ্রহ করে সেখানে মমতার অভিযোগই প্রমাণিত হয়। সমস্যা সমাধানে আধার কার্ড, পাসপোর্টের মতো ভোটার কার্ডেও ‘ইউনিক আইডি’ চালু করার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্মারকলিপি দেয় তৃণমূল। কমিশন প্রথমে এই অভিযোগে গুরুত্ব না দিয়ে সাফাই দেয়, একই এপিক নম্বরে একাধিক নাম থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু সেই ‘ভূতুড়ে বা ডুপ্লিকেট’ ভোটার কখনওই এক রাজ্যের বাসিন্দা নন। ফলে গোলমালেরও আশঙ্কা নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢোক গিলে শুক্রবার বিবৃতি দিয়ে কমিশন জানিয়ে দেয়, ভোটার তালিকায় ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান করবে কমিশন।
সমাধানও তৃণমূলের দেখানো পথেই হবে। অর্থাৎ, ত্রুটিপূর্ণ ডুপ্লিকেট কার্ড মালিকদের ‘ইউনিক ন্যাশনাল এপিক নম্বর’ দেওয়া হবে তিন মাসের মধ্যে। যাঁরা নতুন ভোটার হবেন তাঁরা এই বিশেষ নম্বরের কার্ড পাবেন। ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে কমিশন অবশ্য দাবি করেছে, ডুপ্লিকেট এপিক নম্বরের সমস্যা ২০০০ সাল থেকে রয়েছে। এর দায় ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও-এর ঘাড়ে চাপিয়েছে কমিশন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সব জেনেও কেন ২৫ বছর ধরে হাত গুটিয়ে বসে ছিল কমিশন? কেন ‘নকল’ ভোটার কার্ড সম্পর্কে এখনও নীরব কমিশন? সেই প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় থাকা এমন ‘ডুপ্লিকেট’ ভোটারদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হয়তো চায়ইনি কমিশন। তাহলে বিজেপির নির্বাচনী ‘কারচুপির’ হাতিয়ার ছিল কি ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা? ঘটনা যাই হোক, এই নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরেই কমিশন মানতে বাধ্য হয়েছে বর্তমান ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত নয়। তাতে বিস্তর গোলমাল রয়েছে। এখন দেখার, সত্যিই তিন মাসের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হয় কি না। নাকি বিজেপির চাপে আবারও কোনও ‘অজুহাত’ সামনে আনা হবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ