ওয়াশিংটন: তিনি আমেরিকাকে ফের ‘মহান’ করার ব্রত নিয়েছেন। দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্যের ‘স্বার্থরক্ষা’য় বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যের উপর চাপিয়েছেন চড়া হারে শুল্ক। তবে তাঁর এই ‘শুল্কযুদ্ধে’র ধাক্কায় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করেছে আমেরিকাতেই। সুর চড়াচ্ছেন খোদ মার্কিন অর্থনীতিবিদরাই। এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধাক্কা দিল তাঁর নিজের দেশের আদালতই। শুক্রবার আমেরিকার এক ফেডারেল আপিল কোর্ট স্পষ্ট জানাল, জরুরি ক্ষমতার অধীনে প্রেসিডেন্টের আরোপ করা সিংহভাগ শুল্কই বেআইনি। তিনি নিজের ক্ষমতা অতিক্রম করেছেন। অর্থাৎ, শুল্ক আরোপের মাত্র চার মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির একেবারে মেরুদণ্ডে আঘাত করল আদালত। যদিও আপিল কোর্টের এই রায় এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের জন্য ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। ফলে শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত আইনি লড়াই এবার মার্কিন শীর্ষ আদালতে পৌঁছে যাবে। আপিল কোর্ট তাঁর শুল্কনীতিকে ‘বেআইনি’ বললেও স্বভাবসুলভ বেপরোয়া ট্রাম্প নিজের ‘ট্রুথ’ সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রায়কে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আক্রমণ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সদর্প ঘোষণা, ‘সব শুল্ক এখনও বহাল আছে। সুপ্রিম কোর্ট আমাদের পক্ষেই রায় দেবে।’
বিতর্কিত ‘ট্রাম্প ট্যারিফে’র কারণেই রাশিয়া-চীন-ভারতের মধ্যে মার্কিন বিরোধী নয়া অক্ষের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। এনিয়ে নিজের দেশে প্রবল সমালোচনা সত্ত্বেও ভ্রূক্ষেপ নেই ট্রাম্পের। আবার আপিল আদালতের রায়ের সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না তিনি। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে সাফ লিখেছেন, ‘এই শুল্কগুলি সরে গেলে দেশের জন্য তা হবে সম্পূর্ণ বিপর্যয়। এই রায় বহাল থাকতে দিলে আক্ষরিক অর্থেই তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেবে।’ হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ প্যাটেল পৃথক একটি বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের ট্যারিফ বহালই থাকছে। আমরা চূড়ান্ত জয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছি।’ ওয়াশিংটনে ফেডারেল সার্কিট আপিল কোর্টে ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করে পৃথকভাবে আবেদন করেছিল আমেরিকার পাঁচটি ছোট ব্যবসায়িক সংস্থা ও ডেমোক্র্যাটিক শাসনাধীন ১২টি প্রদেশ। তাদের যুক্তি ছিল, শুল্ক ও কর সংক্রান্ত ক্ষমতা মার্কিন কংগ্রেসের হাতে দিয়েছে সংবিধান। ট্রাম্প তা লঙ্ঘন করেছেন। এই আবেদনের ভিত্তিতেই আপিল কোর্টের ১১জন বিচারকের মধ্যে সাতজনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। ১৯৭৭ সালের ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে’র (আইইইপিএ) অধীনেই শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট আইন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে একাধিক পদক্ষেপের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেখানে শুল্ক বা কর আরোপের ক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা নেই। অর্থাৎ, ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে’ বর্ণিত ক্ষমতা অতিক্রম করেছেন ট্রাম্প। আদালত মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরোপ করা দু’ধরনের শুল্ককে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যযুদ্ধের অঙ্গ হিসেবে এপ্রিল মাসে জারি হওয়া ‘পাল্টা শুল্ক’ এবং ফেব্রুয়ারিতে চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে জারি হওয়া ট্যারিফ। তবে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানি সহ অন্যান্য যেসব ক্ষেত্রে অন্যান্য আইনের অধীনে ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করেছেন, সেগুলি এই রায়ের অধীনে পড়বে না।