Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এবং উচ্ছ্বসিত মোদিজি

ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এবং উচ্ছ্বসিত মোদিজি
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: আগস্টের শেষ সপ্তাহে সমাজমাধ্যমে একটি হ্যাশট্যাগ ভয়ানক ট্রেন্ডিং হয়েছিল—ট্রাম্প ইজ ডেড। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রয়াত। এর নেপথ্যে ছিল অবশ্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্সের একটি সাক্ষাৎকার। ‘ইএসএ টুডে’র সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কি দেশের সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?’ ভান্সের উত্তর ছিল, ‘আমি নিশ্চিত, প্রেসিডেন্ট তাঁর মেয়াদ শেষ করার মতো সুস্থ ও সবল আছেন। কিন্তু গত ২০০ দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি, আমার থেকে ভালো এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের দপ্তর কেউ চালাতে পারবে না।’ ভান্স কিন্তু বলেছিলেন, ট্রাম্প সুস্থ আছেন। তা সত্ত্বেও মিডিয়া তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশটি তুলে নিল। আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল গুজব। সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভিউজ, লাইকস, শেয়ার। একজন সাংবাদিক ট্রাম্পের সাতদিনের শিডিউল প্রকাশ করে দিলেন। তাতে দেখা গেল, ২৬ আগস্টের পর থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ট্রাম্পের সত্যিই জনসমক্ষে কোনও কর্মসূচি নেই! আগুনে আরও ঘি পড়ল। সেটা ছিল ২৮ আগস্ট। ঠিক কথা! দু’দিন ধরে ট্রাম্পকে তো দেখা যায়নি! প্রকাশ্যে চলে এল দু’টি ছবি। একটি ট্রাম্পের ফুলে যাওয়া গোড়ালির, অন্যটি ব্যান্ড-এইড বাঁধা হাতের। কী হয়েছে ওখানে? তাহলে কি সত্যিই...? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর দপ্তর থেকে তারপরও অবশ্য কোনও বিবৃতি দেওয়া হল না। খোঁজ নিতে ফোন গেল না ওভাল অফিসে। এত ভালো বন্ধু! দু’জনে মিলে ‘হাউডি’ করে আনন্দ পান এবং তামাম বিশ্বকে আনন্দ জুগিয়ে থাকেন। দেখা হলেই জড়িয়ে ধরেন। রোজ গার্ডেনে একসঙ্গে হাঁটেন। আমেরিকায় গিয়ে ট্রাম্পের জন্য ভোটভিক্ষা করেন। তারপরও বন্ধুবর চুপ কেন? আসলে ততদিনে ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার থেকে তেল কেনার সাজা চেপেছে (চীন অবশ্য রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি তেল কিনলেও শুল্ক ইস্যুতে বিবেচনা মোডেই রয়েছে আমেরিকা)। লাগাতার ঘোষণা চলছে, ভারত-পাক যুদ্ধ ট্রাম্পের নির্দেশেই থেমেছে। এমনকী, ভারত নাকি ‘শূন্য ট্যারিফ’-এর প্রস্তাবও দিয়েছিল। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এই ঘোষণাও ট্রাম্পের। তখনও ভারতগুরু তথা বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদি সরাসরি ট্রাম্পকে তোপ দেগে কোনও বিবৃতি দেননি (বন্ধু বলে কথা)। বরং খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে এসসিও সম্মেলন এবং গঠনের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া নতুন অক্ষ—ভারত, রাশিয়া, চীন। দুনিয়ার সব খবরের কাগজ থেকে টিভি চ্যানেল, এটাই ব্রেকিং নিউজ। অক্ষ কতটা তৈরি হল? নিজেদের মধ্যে কি কোনও চুক্তি হল? বিশ্ব অর্থনীতি কি তাহলে নতুন দিশায় এগবে? এইসব প্রশ্নের উত্তর নেই। শুধু ড্রাগন-হাতির নাচের খবর। সঙ্গে কিছু ‘খাইয়ে দেওয়া’ আইটেম। যেমন, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর থেকে সরে গিয়েছে বেজিং, ভারতীয় তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে কাজ আউটসোর্সিং বন্ধ করে দিয়েছে আমেরিকা... এইসব আরকী! মোদিজি মুখ খুললেন না। কিন্তু খবর ছড়াল। ঠিক যেভাবে অপারেশন সিন্দুরের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক যেভাবে জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকের আগেই গোটা ভারত জেনে গিয়েছিল, দু’টি স্ল্যাব অবলুপ্ত হতে চলেছে। মোদিজি কিন্তু কিছু বলেননি। কিন্তু এগুলো হয়েছে। কিন্তু এর বাস্তব ভিত কতটা শক্তিশালী? 

Advertisement

কোনও সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতির উপর কতটা প্রভাব ফেলল, তার প্রতিফলন ঘটে শেয়ার বাজারে। নজর করার মতো বিষয় হল, চীন-ড্রাগনের নেত্য, রাশিয়ার আরও কাছাকাছি আসা, বাণিজ্য নিয়ে আশার বাণী... এতকিছুর পরও কিন্তু ভারতের শেয়ার বাজার মারাত্মক কিছু লাফ দেয়নি! প্রথম দিন কিছুটা চাঙ্গা হলেও, বেলাশেষে খুব বেশিরকম পয়েন্ট সঞ্চয় করতে পারেনি সেনসেক্স-নিফটি। বরং দিন দুয়েক রীতিমতো ফ্ল্যাট গিয়েছে বাজার। এমনকী, জিএসটির দ্বিতীয় পর্যায়ের ঘোষণার পরও শেয়ার মার্কেটকে দারুণ আশাবাদী হতে দেখা গেল না। উল্টে ডলারের বিনিময় মূল্য রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলল। অর্থাৎ, একটা বিষয় স্পষ্ট—আমেরিকা আমাদের কাঁধের উপর যে বোঝা চাপিয়েছে, সেটা লাঘব না হওয়া পর্যন্ত বাজার অর্থনীতি অক্সিজেন পাবে না। কারণ চীন-রাশিয়া, নয়া অক্ষ, নতুন ইকনমিক ট্রায়ো... এই সবটাই যে প্রচার স্তরে রয়েছে, সেটা বাজার খুব ভালো বোঝে। যদি কখনও উল্লেখযোগ্যভাবে দানা বাঁধে, তাহলে বিষয়টা অন্য। সেদিন হয়তো সেনসেক্স অন্য কথা বলবে। মার্কেটে বিদেশি অর্থ আসবে। মানুষ মিউচুয়াল ফান্ডের থেকে টাকা সরিয়ে এফডি’তে লাগাবে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও হয়তো সেটা ভালোরকম জানেন। তাই ট্রাম্প সুর নরম করা মাত্র তিনিও গদগদ। ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যাক্স তিনি আমেরিকার উপর চাপাননি। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘আবেগঘন’ বিবৃতিকে রেসিপ্রোকেট করতে দু’বার ভাবেননি মোদিজি। এমনকী এই বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি যে সমানভাবে আগ্রহী এবং হাত বাড়িয়েই আছেন... সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যে শশী থারুর কংগ্রেসের লাইনের বাইরে গিয়ে মোদিজির গুণকীর্তন করেন, তিনি পর্যন্ত বলছেন... স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক বজায় রাখা ভালো, কিন্তু গত কয়েকদিন যাবৎ মার্কিন প্রশাসন আমাদের উপর যা চাপিয়েছে এবং তার ধাক্কা যেভাবে ভারতকে খেতে হয়েছে, তা যেন আমরা ভুলে না যাই। লাগাতার অসম্মান, যুদ্ধ নিয়ে বিবৃতি, ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো—এর জন্য ওদের ক্ষমা করা যায় না। তারপরও অবশ্য মোদিজি ‘রেসিপ্রোকেট’ করবেন। ক্ষমা করারটা ওঁর হাতে নেই। থাকবেও না। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কি আর ক্ষমাঘেন্না করা যায়? তিনি এই সবের ঊর্ধ্বে। আমরা তাঁর অনুগত। বন্ধুত্বের ‘অফার’ করেছেন, এই না কত! ভারতের হিরে ইন্ডাস্ট্রি মার খাচ্ছে। গয়না শিল্পের হর্তাকর্তাদের কপালে ভাঁজ পড়ছে। কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে দেদার। পেট্রল-ডিজেল জাত পণ্যের রপ্তানি কমে যাচ্ছে। এর কোনও বিকল্প রপ্তানি রুটও মোদি সরকার খুঁজে বের করতে পারছে না। ডলারের দাম চড়তে থাকায় আমদানি করা পণ্যের দামও ঊর্ধ্বগামী। এর ভরপাই কে করবে? ট্রাম্প তো করবেন না। তিনি শুধু বন্ধুত্বের গান ধরবেন। আর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাতে তাল দেবেন। কোরাস ধরার জন্য তো গোটা মন্ত্রিসভা রয়েইছে। 
আসলে মোদিজি জানেন, ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি বলে ঢাক পেটালেও অন্দরে ফাঁক অনেকটাই রয়েছে। সবচেয়ে বড় ফাঁক বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা ক্যাপিটাল ইনফ্লো কিন্তু এখনও চেপেচুপে রেখে দিলেই ভালো। গত অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকের তুলনায় চলতি আর্থিক বছরের ওই তিন মাসে ক্যাপিটাল ইনফ্লো কমেছে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ, অ-ভারতীয়রা এদেশের বাজারে লগ্নিতে ভরসা পাচ্ছেন না। উল্টে তাঁরা মার্কেট থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। সেই কারণেই টালমাটাল অবস্থায় থেকে যাচ্ছে শেয়ার বাজার। আর তলানির দিকে ছুটছে ভারতের বৈদেশিক অর্থভাণ্ডার। আমাদের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অবশ্য এরপরও বলবেন, টাকা দুর্বল হচ্ছে না। ডলার শক্তিশালী হচ্ছে। মোদিজি তো সেটাও বলবেন না। কারণ, এই ইস্যুতেই না ২০১৪ সালের আগে লাগাতার মনমোহন সরকারকে তোপ দেগে এসেছেন তিনি! প্রতিটা জনসভায়। প্রত্যেক ভাষণে। তখন ডলারের বিনিময় মূল্য কত ছিল? ৫৫ থেকে ৫৮ টাকার মধ্যে। আর এখন? ৮৮-৮৯ টাকা। প্রত্যেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আপেক্ষিক দৃষ্টিতে উপার্জনও। কিন্তু সঞ্চয় কমেছে। ভোগ্যপণ্যের উপর ব্যয়ের পরিমাণও। আগে যদি মধ্যবিত্ত সংসার খরচ সামলে ভোগ্যপণ্যের উপর উপার্জনের ১০ শতাংশ খরচ করতেন, তাহলে এখন সেই অঙ্কটা ৫ শতাংশের নীচে নেমে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনীতিতে কোথাও তো একটা গলদ রয়েছে। তাই তাকে ঝুড়িতে লুকিয়ে শাক দিয়ে চেপে রাখা হয়েছে। কেউ কিছু বলতে গেলেই তাকে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেখানো হচ্ছে, এই তো জিএসটির নতুন রেট। কিন্তু সেই হার কার্যকরের পরও আদৌ জিনিসপত্রের দাম কতটা কমবে, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না মোদিজির মন্ত্রীরাই। আশঙ্কা রয়েছে, জিএসটি ছাড়ের পূর্ণ সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবে না। মাখন, ঘি, তেল, চাল, ডালের মতো নিত্যপণ্যের হয় এমআরপি বাড়বে, না হয় পরিমাণ ২০-২৫ গ্রাম কমে যাবে। এই আশঙ্কা দূর করার ক্ষমতা মোদিজির নেই। তিনি বা তাঁর মন্ত্রীরা সংস্থাগুলিকে অনুরোধ করতে পারেন, নির্দেশ দিতে পারেন না। কারণ তাহলে তারা বলতেই পারে, আমাদের পণ্যে জিএসটি তো আপনারা শূন্য করে দিয়েছেন, কিন্তু সেই পণ্য তৈরির জন্য কাঁচামাল তো জিএসটি দিয়েই কিনতে হচ্ছে... সেই ক্ষতি কে পূরণ করবে? তখন দেওয়ার মতো উত্তর মন্ত্রীদের কাছে থাকবে না। তাই আমেরিকা যদি নিজে থেকে বরফ গলানোর জন্য ফ্রিজ বন্ধ করে দেয়, তাতে মোদি সরকার উল্লসিত হবেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাই হাতে চাঁদ পেয়েছেন। একেবারে যাকে বলে ব্লাড মুন। চীনকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। রাশিয়া ভালো বন্ধু হলেও একটা স্তর পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকাকে তৈলমর্দন না করলে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। হোক না ওদের শর্তেই করতে হবে ব্যবসা... থাকতে হবে মাথা নিচু করে... শুনতে হবে যুদ্ধ থামানোর আস্ফালন... দেখতে হবে, শত্রু পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে হোয়াইট হাউসে খানাপিনা চলছে... তাও ওরা আমেরিকা বলে কথা! গোটা বিশ্বের বড়দাদা। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময় ট্রেন্ডিং। তাঁর বাণী, পাগলামি, অসুস্থতা, মৃত্যুর গুজব এবং বন্ধুত্বও। আর বিশ্বগুরু? তিনি শুধু প্রচারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ