Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অর্থনীতির নিয়মেই হারবেন ট্রাম্প

বেশিরভাগ অভিধান অনুসারে, ‘ট্যারিফ’ বা ‘শুল্ক’ একটি বিশেষ্য পদ এবং এর অর্থ একটি দেশে আমদানির উপর আরোপিত কর।

অর্থনীতির নিয়মেই হারবেন ট্রাম্প
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেশিরভাগ অভিধান অনুসারে, ‘ট্যারিফ’ বা ‘শুল্ক’ একটি বিশেষ্য পদ এবং এর অর্থ একটি দেশে আমদানির উপর আরোপিত কর। কখনও কখনও রপ্তানির উপরও কর ধার্য হয়ে থাকে। ‘শুল্ক’ শব্দটির ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার কম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌজন্যে সেই ব্যতিক্রমী ব্যবহার এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বেশিরভাগ দেশকে ‘ট্যারিফড’ বা ‘শুল্কবিদ্ধ’ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে দুটি দ্বীপও—হার্ড এবং ম্যাকডোনাল্ড। এই দুই স্থানে পেঙ্গুইনই হল একমাত্র জীবন্ত প্রাণী। সবাই জানে, পেঙ্গুইনরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনও কিছুই রপ্তানি করে না। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের উপর আরোপিত চড়া শুল্কই ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলবে’। অর্থাৎ তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ (এমএজিএ বা ম্যাগা) স্লোগানকে সার্থক করে তুলবে। গত ২ এপ্রিল তিনি একটি শুল্ক-তালিকা প্রকাশ করেন। তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ‘ক্যালকুলেশনটি’ করা হয়েছিল একটি সহজ সূত্র ধরে। এক-একটি টার্গেট‍ দেশের জন্য শুল্ক ধার্য করা হয়েছে এই নিয়মে: ওই দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির অর্ধেক পরিমাণকে, টার্গেট দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য রপ্তানি করে তার মূল্য দিয়ে ভাগ করার পর যে ভাগফল দাঁড়ায় সেই পরিমাণ। 

Advertisement

তাঁর ভক্ত ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতার ট্যুইস্ট দিতে গিয়ে ট্রাম্প যে কাণ্ডটি করেছেন তার ফল সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিভাধর ব্যক্তিদের অভিবাসন বন্ধ না-হলেও তা শ্লথ হবেই। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পণ্য-বাণিজ্য। ধাক্কা খাবে সরবরাহ শৃঙ্খল। অন্তত সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হবে পরিষেবা বাণিজ্য। শুল্ক এবং পাল্টা-শুল্কের নয়া ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ‘ক্যাপিটাল ফ্লো’ কালহরণ করবে। সোজা কথায়, স্বাভাবিক গতি হারাবে মূলধন। পুঁজিকে অনুসরণ করার কারণে কিছু পরিষেবাও বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। আমদানিকৃত ভোগ‌্যপণ্যের উপর চড়া শুল্ক বহন করতে হিমশিম খাবেন মার্কিন নাগরিকরা। এই ডামাডোলে সরবরাহ ব্যাহত হবে, দেখা দেবে মুদ্রাস্ফীতি এবং চাকরি খোয়াবেন বহু নরনারী। আমেরিকানরাই ক্ষুব্ধ হবেন সবচেয়ে বেশি। এমনকী, ‘ম্যাগা-আমেরিকানরাও’ মুদ্রাস্ফীতির আঁচ টের পাবেন। বিশ্ব অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত ট্রাম্পের আমেরিকা। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞরা এইভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন শুরু থেকেই। কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত না করে ভারতসহ একাধিক বড় দেশের উপর শুল্ক আরোপের চরম রাস্তাই বেছে নিয়েছেন। এই ‘বিষবৃক্ষ’ ইতিমধ্যেই ফল দিতে শুরু করেছে। জিনিসপত্রের দাম চড়তে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রেই। সুর চড়াচ্ছেন স্বয়ং মার্কিন অর্থনীতিবিদরাই। এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধাক্কা দিল আমেরিকারই আদালত। শুক্রবার আমেরিকার এক ফেডারেল আপিল কোর্ট স্পষ্ট জানাল, জরুরি ক্ষমতার অধীনে প্রেসিডেন্টের আরোপ করা বেশিরভাগ শুল্কই ‘বেআইনি’। তিনি নিজের ক্ষমতা অতিক্রম করেছেন। অর্থাৎ, শুল্ক আরোপের মাত্র চারমাসের মধ্যেই ট্রাম্পের বাণিজ্য-নীতির একেবারে মেরুদণ্ডে আঘাত করল আদালত। যদিও আপিল কোর্টের এই রায় এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত আইনি লড়াই এবার মার্কিন শীর্ষ আদালতে পৌঁছে যাবে। আপিল কোর্ট তাঁর শুল্কনীতিকে ‘বেআইনি’ বললেও স্বভাবসুলভ বেপরোয়া ট্রাম্প নিজের ‘ট্রুথ’ সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রায়কে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আক্রমণ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সদর্প ঘোষণা, ‘সব শুল্ক এখনও বহাল আছে। সুপ্রিম কোর্ট আমাদের পক্ষেই রায় দেবে।’ 
বিতর্কিত ট্রাম্প ট্যারিফের কারণেই রাশিয়া-চীন-ভারতের মধ্যে মার্কিন-বিরোধী নয়া অক্ষের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। এই সংবাদ স্বঘোষিত ‘বিশ্বপ্রভু’র জন্য কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। তার মধ্যে এসে গিয়েছে কোর্টের গুঁতো। যাই হোক, আমেরিকার ম্যাও এবার আমেরিকাকেই সামলাতে হবে। ভারতের মতো দেশকে ভাবতে হবে নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য নিয়ে। আমরা আগ বাড়িয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ঝগড়া করব না। আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে সবসমই। কারণ কূটনৈতিক মীমাংসার চেয়ে উত্তম কিছু নেই। কেননা, মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস, ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই) এবং ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) হ্রাসের ধাক্কা ভারতের উপরেও আসতে পারে। সেটা সাময়িক হলেও কাম্য নয়। তবে আমেরিকার অনুকম্পার প্রত্যাশা কখনোই নয়। আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্বের দিনও শেষ। বরং দীর্ঘমেয়াদি সুন্দর বিকল্পও আমাদের রাখতে হবে। বাজার বাড়াতে হবে দেশের অভ্যন্তরে। তার জন্য দেশবাসীর আয়বৃদ্ধি জরুরি। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন বাজার এবং বন্ধুদের বেছে নিতে হবে। বাণিজ্য বাড়াতে হবে নতুন মিত্রদের সঙ্গে। আর এইভাবেই প্রতিহত করতে হবে ট্রাম্পের অশুভ প্রয়াসকে। শেষমেশ অর্থনীতির নিয়মই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ