Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্প বনাম পুতিন: এক চূড়ান্ত সংঘাতের প্রস্তুতি?

পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি যান না কেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খুব কাছেই দেখা যায় একজন ব্ল্যাক অথবা গ্রে স্যুট পরিহিত দীর্ঘদেহী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন উদাসীন ভাবে।

ট্রাম্প বনাম পুতিন: এক চূড়ান্ত সংঘাতের প্রস্তুতি?
  • ৪ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি যান না কেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খুব কাছেই দেখা যায় একজন ব্ল্যাক অথবা গ্রে স্যুট পরিহিত দীর্ঘদেহী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন উদাসীন ভাবে। চোখ দেখার উপায় নেই। সিংহভাগ সময় তাঁর চোখে থাকে সানগ্লাস। হাতে ধরা লেদার বাউন্ড অ্যালুমিনিয়াম একটি ব্রিফকেস। ইনি কি সিক্রেট এজেন্টের নিরাপত্তারক্ষী? না। ইনি হলেন পেন্টাগনের মিলিটারি এইড। তাঁর হাতে থাকা ওই ব্রিফকেসের ওজন ২০ কেজি মতো। ব্রিফকেসের সাংকেতিক নাম ‘ফুটবল’। 

Advertisement

যদি কোনওদিন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনও অনুষ্ঠান চলাকালীন, সরাসরি সম্প্রচারে দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা যায় যে, প্রেসিডেন্ট ওই সঙ্গীকে ইশারা করে কাছে ডাকছেন এবং দ্রুত কোনও নিরালা ও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে গিয়ে ওই ব্রিফকেস খোলার নির্দেশ দিচ্ছেন, তাহলে বুঝতে হবে, সেটা পৃথিবীর কোনও অংশে ধ্বংসের প্রাক মুহূর্ত। কারণ, ওই ‘ফুটবল’ নামক ব্রিফকেস আসলে নিউক্লিয়ার কমান্ড। কোনও প্রেসিডেন্ট ওই ফুটবল ক্যারিয়ারকে ডাকার অর্থ তিনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র নিক্ষেপের নির্দেশ দিতে চলেছেন। 
আমেরিকার নিয়ম হল, এক এবং একমাত্র প্রেসিডেন্টের একক ও পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের। পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের কোনও বাটন থাকে না। সাধারণ আলাপচারিতায় বলা হয়ে থাকে যে, নিউক্লিয়ার বাটনে পুশ করলেই সঙ্গে সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র নিক্ষেপ প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়। বাটন বলে আসলে কিছুই থাকে না। ওই ফুটবল আসলে একটি কমিউনিকেশন ডিভাইস। ফুটবলের মধ্যে থাকে একটি প্লাস্টিক শিট। যা মাইক্রোচিপ সংবলিত। সেটা তৎক্ষণাৎ প্রেসিডেন্টকে সংযুক্ত করে দেবে পেন্টাগনের সঙ্গে। সেখানে যে অফিসার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি প্রেসিডেন্টকে পাঠাবেন একটি সিক্রেট চ্যালেঞ্জ কোড। সেটি কেমন কোড? কেউ জানে না। কেমন ধরনের হতে পারে তার আন্দাজ করা হয়। হয়তো চার্লি ডেলটা কিংবা জুলু ট্যাঙ্গো। কিন্তু আসলে এই কোডনেমের ফর্মুলা কীভাবে তৈরি হয়, কতদিন অন্তর পাল্টে যায়, সেটা টপ সিক্রেট। জানে শুধু পেন্টাগনের কয়েকজন অফিসার এবং খোদ প্রেসিডেন্ট। যে সাংকেতিক চ্যালেঞ্জিং কোড পাঠানো হবে প্রেসিডেন্টের কাছে, সেটা কোথায় যাবে? একটি কার্ডে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পকেটে সর্বদা থাকে সেই কার্ড। যা দেখতে ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডের মতো। এই কার্ডের সাংকেতিক নাম ‘দ্য বিস্কিট’। সেটি পকেট থেকে বের করলেই প্রেসিডেন্ট দেখবেন কোন কোড এসেছে। তিনি আবার ‘ফুটবল’ খুলে সেই ডিজিটাল কি-বোর্ডে সেই কোড টাইপ করবেন। ব্যস! ওটাই শেষ নির্দেশ। মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স আমেরিকার এয়ারফোর্স এবং নেভি অপারেশনাল ইউনিটে পাঠিয়ে দেবেন কমান্ড।  তারপর...। 
হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ম্যানহাটন প্রোজেক্টের প্রধান মেজর জেনারেল লেসলি গ্রোভসকে বলেছিলেন, আর তৃতীয় বোমা ফেলার দরকার নেই। আরও ১ লক্ষ মানুষকে হত্যা করাটা বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। 
আমেরিকা আণবিক বোমা তৈরি করেছে। আমেরিকাই আণবিক বোমা ফেলেছে। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর এখন সেই আমেরিকাকে সবথেকে বেশি দেখা যায় বিশ্বের অভিভাবক হতে। কারা কতটা পরমাণু অস্ত্র করতে পারবে কিংবা তার শর্তাবলি কী হবে, সেটা আমেরিকা স্থির করবে। তার সন্দেহ হয়েছে ইরানের কাছে অনেক হিসাব বহির্ভূত পরমাণু অস্ত্র আছে। তাই সে একদিন ইরানে প্রবেশ করে একের পর এক সেইসব পরমাণু ফেসিলিটি সেন্টার ধ্বংস করে দিল। কিন্তু আমেরিকা নিজে কী করছে? ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর মিলিটারি বাজেট বহুগুণ বাড়িয়ে ১০ গুণ বেশি সামরিক অস্ত্র তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তার আগে হোয়াইট হাউসের এক অ্যাডভাইসরকে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকার কাছে এত পরমাণু অস্ত্র আছে কেন, যদি ব্যবহারই না করতে পারি! 
পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা বহু বছর ধরেই প্রায় অসম্ভব হয়েই ছিল। কিন্তু হঠাৎ লক্ষ করা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে এমন কিছু নেতার আবির্ভাব ঘটেছে যাঁদের পক্ষে যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব। ইজরায়েলের বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যেভাবে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছেন প্যালেস্টাইনে, সন্দেহ তৈরি হচ্ছে প্যালেস্টাইন নামক রাষ্ট্র আগামী দিনে আর হয়তো থাকবেই না। আর এই প্রোজেক্টে ট্রাম্পের সমর্থন নেই এটা হতে পারে না। কিন্তু প্রকাশ্যে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে নাকি দূরত্ব তৈরি হয়েছে এই নিয়ে। কিন্তু ইজরায়েলের অস্তিত্ব টিকে আছে আমেরিকার দৌলতে। সেখানে নেতানিয়াহু আমেরিকাকে অমান্য করবেন এটা কি বিশ্বাসযোগ্য। 
২০২৫ সাল এমন একটি পৃথিবীকে সামনে নিয়ে এসেছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা বনাম রাশিয়ার মধ্যে বহু সংঘাত হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি একপ্রকার আগ্নেয়গিরির উপর বসে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্লাদিমির পুতিন দুজনেই কোনও সাধারণ রাষ্ট্রনায়ক নন। তাঁদের দুজনেরই কোনও ভালো মানুষ হওয়ার সাধ নেই। তাঁদের কেউ নিজেদের শান্তি, সৌজন্য, সৌভ্রাতৃত্বের দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান না। এরকম পৃথিবী আগে আসেনি, যখন বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী দুই অক্ষ প্রায় মনেপ্রাণে যে কোনও সময় একে অপরকে ধ্বংস করে দেওয়ার মনোভাব বুকে রেখে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে রাশিয়া ও চীন। অন্যদিকে আমেরিকা। 
আন্তর্জাতিক মহলের অভিমত হল, পরমাণু যুদ্ধ হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন দেশ আগে ব্যবহার করবে পরমাণু অস্ত্র। আগামী দিনে নার্ভের লড়াই এটাই হতে চলেছে যে, ফার্স্ট ইউজ কে করবে? বিশ্বজুড়ে প্রবল উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ একটাই। ট্রাম্প এবং পুতিন, এই দুজনেই সেই মানুষ নন, যাঁরা মন থেকে বলবেন যে, আমরা আগে পরমাণু অস্ত্র নিক্ষেপ করব না। বরং তাঁরা দুজনেই হয়তো মনেপ্রাণে চাইছেন, অপর পক্ষের বাড়াবাড়ি দেখলে আমরা অপেক্ষা কিংবা সহিষ্ণুতা দেখাব না। আগেই নিউক্লিয়ার কমান্ড অ্যাকটিভ করব। যা হওয়ার হবে। আমেরিকার থেকেও পরমাণু ওভারহেডের সংখ্যা রাশিয়ার বেশি। দুজনের কাছে সাড়ে পাঁচ  হাজারের বেশি পরমাণু অস্ত্র। 
উত্তর কোরিয়া এবং পাকিস্তান। দুই উন্মাদ রাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র সম্ভার দিয়ে বসে আছে। তাদের বিশ্বাস নেই। ন্যাটো কিংবা আমেরিকা অতিরিক্ত রাশিয়া বিরোধিতা করলে রাশিয়া যে কোনও সময় ইউক্রেনে লিমিটেড ইউজের পরমাণু অস্ত্র নিক্ষেপ করবে। সেই হুমকি পুতিন দিয়েই রেখেছেন। 
বিশ্ব কূটনৈতিক এবং সামরিক স্ট্র্যাটেজিগত প্রযুক্তিতে সবথেকে বড় আশঙ্কার নাম হল ফলস অ্যালার্ম! অর্থাৎ সর্বদা নিখুঁত হলেও সম্ভাবনা থেকেই যায় প্রতিপক্ষের কোনও একটি আক্রমণ ঘটতে চলেছে বলে আগাম সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে কোনও দেশ পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি করে ফেলল। তারপর জানা গেল ওটা ছিল ফলস অ্যালার্ম। অর্থাৎ আদৌ প্রতিপক্ষ আক্রমণ করেনি। অথচ ততক্ষণে পাল্টা আক্রমণ হয়ে গিয়েছে। যার অবধারিত পরিণতি হতে পারে পরমাণু অস্ত্র। ১৯৮০ সালের জুন মাসে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসর ব্রেজনিস্কির কাছে মধ্যরাতে একটি ফোন এসেছিল। পেন্টাগনের  চিফ অফ কমান্ড স্টাফ উত্তেজিত হয়ে জানাচ্ছেন সোভিয়েট ইউনিয়ন অন্তত কয়েক হাজার মিসাইল নিক্ষেপ করেছে আমেরিকাকে লক্ষ্য করে। আমাদের কী করণীয়? ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসর মনে মনে স্থির করলেন পরমাণু অস্ত্র দিয়ে রাশিয়াকে চিরকালের মতো ঠান্ডা করা হবে। সেই মতোই তিনি প্রেসিডেন্টকে মধ্যরাতে ফোন করে কথা বলতে গেলেন। সেই কথা বলার আগে আবার তাঁকে সেই মিলিটারি অফিসার ফোন করে বললেন, স্যার, ভুল হয়ে গিয়েছে। কম্পিউটার ভুল সংকেত দিয়েছে। এরকম কোনও মিসাইল অ্যাটাক সোভিয়েট করেনি। ফলস অ্যালার্ম! ওই ফোন আসতে মাত্র ১০ মিনিট দেরি হলে আমেরিকার পরমাণু বোমা হয়তো আছড়ে পড়ত সোভিয়েট ইউনিয়নের উপর। সোভিয়েট কি চুপ করে থাকত? একটা সামান্য ভুলে পৃথিবীর ইতিহাস ও ভূগোল পাল্টে যেত হয়তো।
এসব শঙ্কার কথা আসছে কেন? আসছে, কারণ পুতিন এবং ট্রাম্পের আচরণ খুব স্বাভাবিক লাগছে না সামরিক বিশেষজ্ঞদের কাছে! তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেখে মনে হচ্ছে একটি চূড়ান্ত সংঘাত যেন চাইছেন দুজনেই! কেউ কারও বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন না প্রকাশ্যে। কিন্তু ঘুঁটি যে সাজাচ্ছেন সেটা স্পষ্ট। কোনদিকে যাচ্ছে পৃথিবী? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ