Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্প বনাম মাস্ক: ব্রোম্যান্স বিচ্ছেদ!

ইলন মাস্কের সঙ্গে কি ফোনে কথা বলবেন? মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ-এর সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনেই রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প বনাম মাস্ক: ব্রোম্যান্স বিচ্ছেদ!
  • ১২ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: ইলন মাস্কের সঙ্গে কি ফোনে কথা বলবেন? মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ-এর সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনেই রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর কটাক্ষসিক্ত জবাব, ‘যে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?’

Advertisement

অথচ, দিন কয়েক আগেও তাঁরা দু’জন ছিলেন ‘বেস্ট বাডিস’! একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। অন্যজন বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের। কেমন সেই বন্ধুত্ব? প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাস্ক ট্রাম্পকে জিতিয়ে আনতে নিজের গাঁটের প্রায় ২০ কোটি ডলার খরচ করেছিলেন। প্রতিদানে কৃতজ্ঞ ট্রাম্প মাস্কের জন্য হোয়াইট হাউসের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এই বিপুল ক্ষমতা রীতিমতো চড়া দামে কিনেছিলেন টেসলা কর্তা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ট্রাম্প ও মাস্কের এই সম্পর্কের নাম দিয়েছিল ‘ব্রোম্যান্স’ (ব্রো, ব্রাদারের সংক্ষিপ্ত রূপ + রোম্যান্স)। গোড়া থেকেই সেই সম্পর্ক ছিল খোলামেলাভাবে ‘ট্রানজ্যাকশনাল’। এর অর্থ, ট্রাম্পকে জেতাতে মাস্ক টাকা ঢালবেন, নির্বাচিত হলে মাস্ক ও তাঁর কোম্পানির জন্য বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত করবেন ট্রাম্প।
হয়েওছিল তাই। ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সিতে অমিত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলেন টেসলা এবং এক্স-এর কর্ণধার মাস্ক। ওয়াশিংটন পোস্ট হিসেব করে বলেছে, কম করে হলেও ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা মাস্ক ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে আদায় করেছেন। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। প্রেসিডেন্ট হয়েই ট্রাম্প মাস্ককে পুরো প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য আমেরিকার সরকারি দক্ষতা বিভাগের (ডিওজিই) পুরো দায়িত্ব তুলে দেন। দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন মাস্ক। তখন লিখেছিলেন, ‘আমি ট্রাম্পকে ভালোবাসি সেভাবেই, যেভাবে একজন বিসমকামী পুরুষ আর একজন পুরুষকে ভালোবাসতে পারে।’ সেই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন মাস্ক। প্রবল আত্মবিশ্বাসী মাস্ক ঘোষণা করেছিলেন, তিনি কম করে হলেও দুই ট্রিলিয়ন ডলারের খরচ কমিয়ে আনবেন।
বাস্তবে ঘটেছে উল্টোই। মাস্ক ঢালাও অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিলেন, প্রায় আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীর চাকরি খেয়ে বসলেন, আমেরিকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলার ব্যবস্থা করলেন। ফলে যা হওয়ার তাই হল। দেখা গেল, এমন সব লোকজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে, যাঁরা না থাকায় বিমানবন্দরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে আবহাওয়া দপ্তরে জরুরি পরিষেবা দেওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মী ছাঁটাই হওয়ায় সোশ্যাল সিকিউরিটির চেক পাঠানো বা রাজস্ব আদায়ের কাজে গাফিলতি বেড়েছে। এ নিয়ে চারদিক থেকে সমালোচনার ঝড় উঠল। আদালত থেকেও ঢালাও ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে রায় এল। ফলে ট্রাম্পকে বাধ্য হয়ে ঘোষিত অনেক কাটছাঁট আবার পুনর্বহাল করতে হল। মাস্ক দাবি করেছিলেন, দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অপচয় ঠেকাবেন। তিন মাস পর দেখা গেল, তিনি বড়জোর দেড়শো বিলিয়ন ডলার কমাতে পেরেছেন।
মাস্ক ও ডিওআইজি যে তাঁর প্রশাসনের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে, এ কথা ট্রাম্প বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলেন। মিডিয়াতে মাস্কের দিনভর উপস্থিতি নিয়েও তাঁর বিরক্তি বেড়ে চলছিল। ফলে উভয়ের সম্মতিতেই মাস্ককে ডিওআইজি থেকে বিদায় নিতে হল। ৩০ মে ছিল মাস্কের হোয়াইট হাউসে চাকরির শেষ দিন। বিদায় দিতে গিয়ে ট্রাম্প আবেগভরা গলায় জানালেন, মাস্ক নিজের ব্যবসায় ফিরে যাচ্ছেন, কিন্তু হোয়াইট হাউস তিনি ছাড়ছেন না। অর্থাৎ বাইরে থেকেও মাস্ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে যাবেন। মাস্ককে ‘দুর্দান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মধুর কথায় বিদায় দিয়েছিলেন। মাস্কও বিতর্ক বাড়াননি শেষ দিনে। জানিয়েছিলেন, এ বার ব্যবসায় মনোনিবেশ করতে চান। সেই কারণেই ইস্তফা।
কিন্তু রাতারাতি বদলে যায় ‘শান্তিপূর্ণ অবস্থান’। গত ৫ জুন প্রায় দুই ঘণ্টার এক্স–যুদ্ধের পর তাঁদের প্রেমকাহিনি পূর্ণ বিচ্ছেদে গড়ায়। যা আমেরিকার ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা তো বটেই। তাঁদের মতভেদের প্রধান কারণ, যে নতুন বাজেট প্রস্তাব কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে গৃহীত হয়েছে তা নিয়েই। মাস্ক সেই প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জঘন্য’ বলে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি ডিওআইজিতে এসেছিলেন ব্যয় কমাতে, অথচ নতুন বাজেট প্রস্তাব গৃহীত হলে আগামী ১০ বছরে মার্কিন ঋণের বোঝা অতিরিক্ত তিন ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। সেটাই মাস্কের আপত্তি। তিনি দাবি করেন, ওই বিল মার্কিন প্রশাসনকে ‘দেউলিয়া’ করে দেবে। ব্যর্থ করবে ডিওজিই-র যাবতীয় সাশ্রয়ের চেষ্টা। এক্স-এ মাস্ক লেখেন, ‘কংগ্রেসের এই বিশাল সাংঘাতিক বিল জঘন্য, শূকরের মাংসে ভরা (পর্ক ফিল্‌ড)।’ তাই এই বাজেট প্রস্তাব বাতিল করতে হবে। অথচ, ট্রাম্প নিজে এই প্রস্তাবকে বলেছেন, ‘বিগ বিউটিফুল বাজেট’। তাঁর ব্যক্তিগত লবিংয়ের ফলেই রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা নিজেদের মতভেদ ভুলে প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছেন। বর্তমানে তা সিনেটের বিবেচনায় রয়েছে, কোনও কোনও সিনেটর কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তিও তুলেছেন। ঠিক সেই সময় বাজেটের বিরুদ্ধে মাস্কের এই ‘যুদ্ধ’ ট্রাম্পকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
নিজের হতাশা ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেছেন, আসলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ট্যাক্স ক্রেডিট বাতিল করায় টেসলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাই মাস্ক চটেছেন এবং পরিকল্পনা করেই ওই ‘সুন্দর’ বিলটির বিরোধিতা করছেন। এই বাজেট প্রস্তাবে কী আছে, সে কথা মাস্ক খুব ভালো করেই জানেন। আপত্তি থাকলে তাঁর আগেই বলা উচিত ছিল। কিন্তু সে কথা বলামাত্রই মাস্ক তাঁর ‘এক্স’ হ্যান্ডলে জানান, ‘সব বাজে কথা। এই বাজেট প্রস্তাব আমি পড়ারই সুযোগ পাইনি। গভীর রাতে চুপি চুপি প্রস্তাবটি পাস হয়েছে।’ এতে ট্রাম্প তাঁর ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। মাস্কের প্রতি নিজের বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর চমৎকার বন্ধুত্ব ছিল, সেই বন্ধুত্ব আর থাকবে কি না, তাতে সন্দেহ আছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মাস্ককে ছাড়াই তিনি আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া প্রদেশে জিততে পারতেন। ট্রাম্পের ওই দাবি সংবলিত ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই একটি পোস্ট করেন মাস্ক। বলেন, ‘আমার জন্যই ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতায় আসতে পেরেছে।’ তর্ক আরও উস্কে দিয়ে তিনি ট্রাম্পের অভিশংসনের দাবিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার দাবি তোলেন। অনেকেই বলছেন, শুধু বাজেট নয়, মাস্কের ক্ষিপ্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ থাকতে পারে। নাসার প্রশাসক হিসেবে মাস্ক তাঁর বন্ধু জ্যারেড আইজাকম্যানের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, ট্রাম্প সেই প্রস্তাব মানেননি। মাস্ক তাঁর ইন্টারনেট কোম্পানি স্টারলিংককে আমেরিকার বিমানবন্দরগুলিতে ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন তাতেও কান দেয়নি। রিপাবলিকান পার্টির নেতারা, যাঁরা এত দিন মাস্ককে ‘বিস্ময় বালক’ ভেবে স্তুতি করে এসেছেন, তাঁরা এরই মধ্যে সুর বদলে ফেলেছেন। যেমন, স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, মাস্ক যত প্রতিভাধরই হোক না কেন, বাজেট প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল।
কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেন মাস্ক। মনে করিয়ে দেন, একসময় ট্রাম্প ও যৌন কেলেঙ্কারির জন্য অভিযুক্ত জেফ্রি এপস্টেইন গলায়-গলায় বন্ধু ছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের বিচার বিভাগ সেই কথা কাউকে জানতে দিতে চায় না। তাঁদের দু’জনের একটি পুরনো ছবিও তিনি এক্সে জুড়ে দেন। মাস্ক লিখেছেন, ‘ভবিষ্যতের জন্য এটাকে মাথায় রেখে দিন। সত্যি সামনে আসবে।’ ঘটনা হল, জেফ্রি এপস্টেইন নামে এক বিতর্কিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ একজনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকেছিলেন ভার্জিনিয়া গিফ্রে নামে এক মহিলা। মামলার নথিতে এপস্টেইন-ঘনিষ্ঠদের যাবতীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। শোনা গিয়েছিল, যৌন কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা। এ-ও শোনা যায় এপস্টেইনের বিলাসবহুল বিমান ‘লোলিতা এক্সপ্রেস’-এ চেপে বেশ কয়েক বার বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। চলতি বছরের গোড়ায় ওই ফাইলের একাংশ প্রকাশ্যে আনা হয়। কিন্তু মাস্ক ওই ফাইলের পুরো অংশ প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, একটি সাক্ষাৎকারে ইলন মাস্ক বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘ইমপিচ’ (পদচ্যুত) করা উচিত। রিপাবলিকানদের মধ্যে যাঁরা ভেবেছিলেন ট্রাম্প ও তাঁর বিপথগামী এই বন্ধুর সম্পর্ক আবার জোড়া লাগানো সম্ভব, তাঁরাই বলছেন এপস্টেইনকে জড়িয়ে অভিযোগ তোলার পর সেই আশাও শেষ। ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছেন, মাস্ক তাঁর বিপক্ষে গিয়েছেন বলে তিনি চিন্তিত নন। তবে এটা আরও আগেই করা উচিত ছিল তাঁর।
এই বিচ্ছেদের ফলে বড় আর্থিক ধাক্কায় পড়তে পারেন মাস্ক। ট্রাম্পের সুরে মাস্কের বিরুদ্ধে সমালোচনা বেজে উঠতেই তাঁর টেসলা কোম্পানির শেয়ারমূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ পড়ে যায়। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, মাস্কের ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে ৮৭৩ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা)! ট্রাম্প বলেছেন, মাস্কের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি আছে, তা–ও তিনি বাতিল করে দেবেন। তবে ট্রাম্পের হুঙ্কারে মাস্ক ভেঙে পড়ার লোক নন। রিপাবলিকান নেতাদের সাবধান করে তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকবেন আর মাত্র সাড়ে তিন বছর। আমি থাকব কম করে হলেও ৪০ বছর। সেই কথাটা মাথায় রেখো।’ ট্রাম্প-মাস্কের ‘দ্বৈরথ’ কোথায় গিয়ে থামবে, প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারির মুখে পিছিয়ে গিয়ে মাস্ক থামবেন, নাকি শেষমেশ ট্রাম্পকেই ‘নত’ হতে হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আপাতত ট্রাম্প-মাস্কের প্রেমকাহিনির প্রথম অধ্যায় শেষ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ