নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: রাজ্য রাজনীতি এখন এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। অভিযোগ-পালটা অভিযোগে সরগরম ভোটমুখী বাংলা। এসআইআর শুরুর দিন থেকেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগে সোচ্চার হয়েছে তৃণমূল। এবার তাদের অভিযোগ আরও চাঞ্চল্যকর! রাজ্যের শাসক দলের দাবি, গত বিধানসভা নির্বাচনে (২০২১) যেসব কেন্দ্রে তাদের বিপুল ‘লিড’ ছিল, বেছে বেছে সেই কেন্দ্রগুলিতে অস্বাভাবিক হারে শুনানির নোটিস ধরানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, একাধিক কেন্দ্রে একুশের ভোটে তৃণমূলের যে জয়ের ব্যবধান ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক ভোটারকে শুনানিতে তলব করা হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, এমন কাণ্ড এমনি এমনি ঘটছে না। এসব আসলে ন্যায্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য সুচিন্তিত পদক্ষেপ।
বসিরহাট উত্তর বিধানসভার কথাই ধরা যাক। গত বিধানসভা নির্বাচনে এখানে তৃণমূলের ৯০ হাজার ভোটের ‘লিড’ ছিল। এই কেন্দ্রে হিয়ারিংয়ের ডাক পেয়েছেন ৯২,৪৫৯ জন। মিনাখাঁয় প্রায় ৪৭ হাজার ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। সেখানে এসআইআরের শুনানিতে ডাক পেয়েছেন ৫৫,৮৮৭ জন। হাড়োয়া বিধানসভার উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ছিল ১ লক্ষ ৩৩ হাজার। সেখানে শুনানির নোটিস পেয়েছেন ৬৬,৮০৮ জন। বাদুড়িয়ায় তৃণমূলের ‘লিড’ ছিল ৪৭ হাজারের। সেখানে শুনানিতে যেতে হচ্ছে ৬৪,৮৬৪ জনকে। আমডাঙায় তৃণমূল জিতেছিল ২৫ হাজার ভোটে। শুনানিতে ডাক পেয়েছেন ৬৯,৩৪২ জন। মধ্যমগ্রামে ৪৭ হাজার ‘লিড’ ছিল তৃণমূলের। শুনানিতে ডাক পেয়েছেন ৬২ হাজার ৫৫৯ জন ভোটার। তৃণমূলের দাবি, এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, বিজেপির হয়ে কীভাবে কাজ করে যাচ্ছে খোদ নির্বাচন কমিশন!
জোড়াফুল শিবিরের বক্তব্য, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক ভোটারকে শুনানিতে তলব করে জনমানসে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বা দোলাচল তৈরি করা হচ্ছে। এসআইআর প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে ভোটের আগে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে মান্যতা দেওয়ার একটা চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। কারণ, দেদার শুনানির নোটিস ধরানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তৃণমূলের এগিয়ে থাকা কেন্দ্রগুলিকেই ‘টার্গেট’ করা হচ্ছে, এমন নয়। সেরকন এলাকাগুলিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে সংখ্যালঘু অংশের ভোটার বেশি।
বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতি বুরহানুল মোকাদ্দিম বলেন, ‘বিজেপি বুঝে গিয়েছে, স্বচ্ছভাবে ভোট হলে তাদের হার নিশ্চিত। তাই নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে যোগ্য ভোটারদের নাম কাটতে চাইছে। মানুষ বিজেপি ও তাদের তোতাপাখি নির্বাচন কমিশনকে বুঝে নিয়েছে।’ হাবড়ার তৃণমূল বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘কমিশন বিজেপির হয়ে কাজ করছে। সেটা প্রমাণ হচ্ছে হিয়ারিংয়ের এই চিত্রে।’ পালটা বসিরহাটের বিজেপি নেতা পলাশ সরকার বলেন, ‘তৃণমূল ভয় পেয়ে এসব প্রলাপ বকছে। অনুপ্রবেশকারীরাই তৃণমূলের অস্ত্র। তবে এবার তা কাজ করবে না।’ তবে কমিশন বরাবর জানিয়ে এসেছে, এসআইআর একটি আইনি প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকায় নাম রাখা নিয়ে কোনো আপত্তি বা দাবি এলে শুনানি বাধ্যতামূলক। এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাবের জায়গা নেই।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তা জেলা উত্তর ২৪ পরগনায় এসআইআরের শুনানি নিয়ে নিত্যদিন বিভিন্ন অভিযোগ আসছে। তৃণমূলের অভিযোগ, ইতিমধ্যে এই জেলায় ১০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এসআইআরের কারণে। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় শুনানির দিন বাড়িয়েছে কমিশন। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বহর ও রাজনৈতিক চাপানউতোর।