সংবাদদাতা, কাটোয়া: অসমের ঐতিহ্যবাহী গামছার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পূর্বস্থলীর তাঁতশিল্প। গোটা পূর্বস্থলী জুড়েই গামছা বোনা হচ্ছে। কাজ পাচ্ছেন তাঁতশিল্পীরা৷ হাসি ফুটছে তাঁদের মুখে। গুজরাতের সুরাত শাড়ির দৌলতে পূর্বস্থলীর হস্তচালিত তাঁতশিল্পের বাজার ধ্বংস হয়েছে আগেই। কাপড় বোনা ছেড়ে তাঁতশিল্পীরা নতুন কাজের সন্ধানে পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। কেউবা দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন৷ তবে, অসমের ঐতিহ্যবাহী মেখলা শাড়ির পর এখন গামছা বুনে নতুন স্বপ্ন দেখছেন তাঁতিরা৷
অসমকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয় সে রাজ্যের মেখলা শাড়ি ও গামছা। অসমিয়াদের কাছে দু’টি পোশাকই যথেষ্ট মর্যাদার। তাঁদের বিহু উৎসবে গামছা সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে, অসমজুড়েই গামছা বোনা হয়৷ পর্যটকদের কাছে এর কদরও বেশ ভালো। পাটের সূতো ছাড়াও রেশম সূতো দিয়ে এমন গামছা তৈরি হয়। পাশের লাল নকশা হাতে বুনে ফুটিয়ে তুলতে হয়৷ সেই গামছা এবার পূর্বস্থলীর বহু গ্রামে তৈরি হচ্ছে। তাঁতশিল্পীরা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন। পুরানো হস্তচালিত তাঁত যন্ত্র আবার চালু হয়েছে৷ পূর্বস্থলী-২ ব্লকের লক্ষ্মীপুর ডাঙাপাড়া, পূর্বস্থলী-১ ব্লকের শ্রীরামপুর, সমুদ্রগড়, ধাত্রীগ্রামেও শুরু হয়েছে গামছা বোনার কাজ৷ এক একটি গামছা বুনে তাঁতিরা তিরিশ টাকা করে মজুরি পাচ্ছেন৷
অসম থেকে বরাত নিয়ে এসে গামছা বুনছেন পূর্বস্থলীর তাঁতশিল্পীরা। সাদা কাপড়ের উপর দু’ পাড়ে লাল নকশা। এটাই অসমের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বহন করে৷ অসমিয়াদের অস্মিতাকে জাহির করে। পূর্বস্থলীর লক্ষ্মীপুর ডাঙাপাড়ার বাসিন্দা আল আমীন শেখ বলেন, ‘আমরা অসম থেকে বরাত পাই মেখলা শাড়ি বোনার৷ এখন আবার গামছাও বরাত আসছে৷ তারপর আমরা তা বাড়িতে হস্তচালিত বা পাওয়ারলুম তাঁতযন্ত্রে বুনে আবার তা অসমে পাঠিয়ে দিই৷ তাতে অন্তত আবার হস্তচালিত তাঁতশিল্পের কদর বাড়ছে।’ সমুদ্রগড়ের হাটসিমলা এলাকার তাঁতশিল্পী ঝন্টু বসাক, প্রণব দাসরা বলেন, ‘শাড়ি বুনে আমাদের আর মজুরি মেলে না৷ তাই অসমের গামছার যা কারুকাজ রয়েছে, সবই আমরা তা হাতে বুনে দিই৷ আর পুরোটাই সাদা কাপড়ের উপর হয়৷ সারাদিনে হাতে বুনলে ৩ থেকে ৪ টে বোনা হয়৷ আর পাওয়ারলুমে সারাদিনে ১০-১২টা গামছা বোনা হয়। এতে ভালোই মজুরি পাচ্ছি। মহাজনরা সূতো দিয়ে আমাদের দিয়ে বুনিয়ে আবার ওরাই অসম নিয়ে যাচ্ছেন৷ অন্তত সংসারটা চলে যাচ্ছে৷’ আর এক তাঁতশিল্পী বলেন, ‘আমাদের হস্তচালিত তাঁত শিল্পটাকে প্রথম ধ্বংস করেছে পাওয়ারলুম শাড়ি৷ তারপর পুরো বাংলার তাঁত শিল্প ধ্বংস করেছে গুজরাতের সুরাত শাড়ি৷ এখন আবার আমরা অসমের ঐতিহ্যবাহী গামছা বুনে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি৷ ধীরে ধীরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁত শিল্পের বাজার চাঙা হচ্ছে৷’
পূর্বস্থলী এলাকাকে পূর্ব বর্ধমান জেলার ‘তাঁতবলয়’ বলা হয়। পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমাতেই সবচেয়ে বেশি তাঁতশিল্পী রয়েছেন। বাবুইডাঙা, লক্ষ্মীপুর, তামাঘাটায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক হাজার হস্তচালিত তাঁতযন্ত্র৷ দেশ ভাগের পর ওপারবাংলা থেকে তাঁতশিল্পীরা এদেশে পূর্বস্থলী সহ নানা জায়গায় ঘর বেঁধেছেন। তাঁদের হাত ধরেই নতুন করে রাজ্যে তাঁতশিল্পে জোয়ার এসেছিল। এখন অসমের ঐতিহ্যবাহী গামছার দৌলতে হস্তচালিত তাঁতের সুদিন ফিরছে। - নিজস্ব চিত্র