পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: শান্তিনিকেতন-বোলপুরে বেশ ক’বছর ধরে ‘দ্বারবন্ধ’ বসন্ত উৎসবের। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এখন ঘরোয়াভাবে রবীন্দ্র-ঐতিহ্য পালন করে। সেই উৎসবে একমাত্র পড়ুয়া ছাড়া বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ফলে, পর্যটকদের মনে ফাগুন আর ডাক দেয় না বোলপুরকে ঘিরে। বরং তাঁদের এখন মন মজেছে রাঙা পলাশ-শিমুলে। অতঃপর, সবার গন্তব্য পুরুলিয়া।
আজ, শুক্রবার দোল উৎসব। পর্যটকদের মন রাঙাতে তৈরি রাঙামাটির জেলা। বসন্তে খানিক বেশি রঙিন থাকে পুরুলিয়া। গাছে গাছে শিমুল-পলাশের রূপ-সৌন্দর্য্য। যেন গনগনে আগুন! জ্বলছে জয়চণ্ডী থেকে অযোধ্যা। সেই আগুনে নিজেদের পোড়াতে চান বসন্ত অনুরাগীরা। ফলে, তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও। রবিবার পর্যন্ত জেলার হোটেল, লজ, সরকারি অতিথি নিবাস, কটেজ, রিসর্ট—সবই প্রায় ‘হাউসফুল’! ঋতু বৈচিত্রে রূপবদল করে পুরুলিয়া। শীতে এক রূপ। গ্রীষ্মে রুক্ষ-শুষ্ক অন্য এক পুরুলিয়া। বর্ষায় সবুজের মুগ্ধতা, চেনা দায়! শরতে অন্য রূপ। তবে, সব ঋতুকে ছাপিয়ে বসন্তে অতি জাগ্রত পুরুলিয়ার যৌবন। যেন মনমোহিনী সুবেশা এক ‘তরুণী’। শিমুল-পলাশে মোড়া তার গোটা শরীর। খোঁপায় গোঁজা সাদা কিংবা হলদে পলাশ। এমন ঈর্ষণীয় সৌন্দর্য্যের সান্নিধ্য পেতে কে না চায়! তাই, সবার উচাটন মন প্রতি বসন্তে ছুটে গিয়ে থমকে থামে জেলার পথে-প্রান্তরে। তবে, বছর তিনেক ছবিটা বেশ ভিন্ন। নিরিবিলিতে পুরুলিয়ায় বসন্ত-বিলাস ভোগ করার দিন বোধহয় শেষ! নেপথ্যে, বোলপুরের বসন্ত উৎসবের খোলা দ্বার বন্ধ আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলত।
বৃহস্পতিবার কথা হচ্ছিল পুরুলিয়া ডিস্ট্রিক্ট হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহিত লাটার সঙ্গে। পর্যটকদের ভিড় দেখে বেশ খুশিই তিনি। বলছিলেন, ‘দলবেঁধে সবাই পুরুলিয়া আসছেন। শুক্রবার থেকে আগামী রবিবার পর্যন্ত হোটেলগুলির সব ঘর বুক। অযোধ্যা থেকে শুরু করে বড়ন্তি, গড় পঞ্চকোট—সব জায়গাতেই হোটেল, হোমস্টে পরিপূর্ণ। শহরের হোটেলগুলিতেও একই অবস্থা।’ মোহিতবাবু মানছেন, তাঁদের এই লক্ষ্মীলাভে অনুঘটকের কাজ করেছে শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবে বহিরাগত অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা।
এবার বান্ধবীদের সঙ্গে বসন্ত-উদযাপনে বোলপুর যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল হুগলির চুঁচুড়ার বাসিন্দা সুরভি অধিকারীর। ভেবেছিলেন, শান্তিনিকেতনের দোল দেখবেন। পূর্ণিমার সন্ধ্যায় কোপাইয়ের ধারে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারবেন। কিন্ত যেভাবে পর্যটকদের জন্য দরজা বন্ধ করেছে শান্তিনিকেতন, তাতে বেজায় ক্ষুব্ধ সুরভিরা। অগত্যা, পরিকল্পনা বদলে সটান পুরুলিয়ায়। সুরভি বলছিলেন, ‘এখানে শিমুল-পলাশে মন রাঙানোর আনন্দটাই আলাদা। না এলে বড্ড মিস করতাম।’
পুরুলিয়ায় আগেও এসেছেন কলকাতার বাসিন্দা দীপান্বিতা পাল, সৌরভ চট্টোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে ফের এসে পৌঁছেছেন দু’জনে। দীপান্বিতা বলছিলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিকল্পনা করে করে অবশেষে পুরুলিয়া আসতে পারলাম। বসন্তে এই জেলার যে রূপ দেখলাম, তা ভুলব না।’ তবে, বসন্ত মানেই পুরুলিয়ায় শুধু পলাশ কিংবা শিমুল নায়। মাদার, কুসুমের লাল কচি পাতা আর মহুয়ার মাতাল করা গন্ধ রয়েছে। রয়েছে পুরুলিয়ার নিজস্ব লোকগান ঝুমুর, লোকনৃত্য ছৌ, সঙ্গে শালপাতায় পোড়া মাংস, দেশি মুরগির পাতলা ঝোল আর মোটা চালের ভাত। পর্যটকদের সমাগমে খুশি চরিদার ছৌ শিল্পীরাও। তাঁদের কথায়, ‘বসন্ত উৎসব মিটে গেলে গরম পড়ে যাবে। তখন আর দলবেঁধে পর্যটকরা আসবেন না। মুখোশও বিক্রি হবে না। যা বিক্রি করার এই সময়েই করে ফেলতে হবে।’
তবে, মুখোশের আড়ালে নয়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পুরুলিয়ার রূপ-সৌন্দর্য্য উপভোগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন ছৌশিল্পীরা।