নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রামের জমাবনী ব্লকের পড়িহাটি প্রাচীন জনপদ। জৈন বণিকদের তামা ও লোহা নিষ্কাশনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেই সময়ের হাতির তাণ্ডবের স্মৃতিই কি বহন করে চলেছে অষ্টভুজা দেবী মূর্তি? দু’ হাত দিয়ে মাথার উপর ধরে রেখেছেন উগ্ৰ রূপের হাতির মূর্তি। ভীষণদর্শনা বিরল এই দেবী রঙ্কিনীকে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় জমান।
পড়িহাটি গ্ৰামের অদূরে রঙ্কিনী বন। একশো বছর আগে এই বন থেকেই অষ্টভুজার মূর্তি উদ্ধার হয়। খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরে মূর্তিটিকে এনে স্থাপন করা হয়েছিল।পরবর্তীতে মন্দির তৈরি করা হয়। শতবর্ষ ধরে সেই মূর্তি আজ ও পূজিত হয়ে চলেছে।মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির সামনে পাথরের পদদ্বয় ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের পদদ্বয়বলে কোনও কোনও গবেষক দাবি করেছেন। মন্দিরের ভিতরে অষ্টভুজা দেবী মূর্তি রয়েছে।ছয়টি হাতেই রয়েছে অস্ত্র। মাথার উপরের থাকা দু’টি হাতে একটি হাতি ধরে রেখেছেন।প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতার মূর্তিটি বেলে পাথর দিয়ে তৈরি। পূর্বে এই মূর্তির রঙ লাল ছিল। রঙ্কিনী কি জৈনদের যক্ষিণী দেবী? যক্ষিণী দেবীর মাথার হাতির মূর্তি থাকার কোনও উল্লেখ অবশ্য পাওয়া যায়না। ঝাড়খণ্ডে হুবহু এমন একটি মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। মূর্তি দু’টির অতীত ইতিহাস আজও রহস্যে ঢাকা। মন্দিরে নিত্যদিন সকালে পুজো হয়। বিপত্তারিণী পুজো দিতে ভক্তরা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসেন। গ্ৰামের কাছেই সাতসকড়া বা সাতসকটের প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশে পড়ে রয়েছে। জনশ্রুতি এটি ছিল সূর্য মন্দির।ভগ্নাবশেষের পাশে আজও জৈনদের দাহভূমির স্মৃতি চিহ্নের খাম্বা দাঁড়িয়ে রয়েছে। নানা ধর্মের স্মৃতি চিহ্ন বহন করে চলা পড়িহাটী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে পড়িহাটির দূরত্ব প্রায় কুড়ি কিমি। দহিজুড়ি হয়ে বেলপাহাড়ী যাওয়ার মাঝে পড়িহাটী। পড়িহাটি বাজার থেকে ডান দিকের ছোট রাস্তা ধরে এগলেই মন্দিরটির দেখা যাবে। গ্ৰামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তপনকুমার পানি বলেন,পড়িহাটী একসময় জৈন বণিকদের বড় বাণিজ্য কেন্দ্রস্থল ছিল। এই এলাকার দক্ষিণ দিক দিয়ে ডুলুং নদী প্রবাহিত হচ্ছে। ডুলুং নদী হয়ে সুবর্ণরেখার পথে ধাতু বাণিজ্য চলত। জঙ্গলে হাতির উপদ্রব সম্ভবত তখনও ছিল। না হলে এই ধরনের মূর্তি তৈরি হতোনা। মূর্তিটি দেখলেই বোঝা যায় ছয় হাতে শস্ত্রে সজ্জিত দেবী হাতিটিকে যেন ছুঁড়ে ফেলতে চাইছে। মন্দিরে জাঁকজমক করে বিপত্তারিণী পুজো হয়। এই পুজোর মধ্যে হাতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অতীত স্মৃতি থাকতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মানিক দাস বলেন, বংশ পরম্পরায় আমরা এই মন্দির দেখাশোনা করি। ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, স্থানীয় জঙ্গল থেকে মূর্তটি নিয়ে আসা হয়েছিল। এক সাধু এই মন্দিরে আসতেন। তারপর থেকেই এই দেবী রঙ্কিনী রূপে পূজিত হয়ে আসছেন।আগে ছাগ বলি হতো। এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ভক্তরা যেমন আসেন, তেমন পর্যটকরাও এই মূর্তি দর্শন করে যান।