নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রামের পহেলগাঁও বলা হয় কপাটকাটার ঝিল উপত্যকাকে। জামবনীর ছড়ানো ছেটানো জঙ্গল পথে উপত্যকাটি আত্মগোপন করে আছে। জঙ্গলের ভিতর স্বচ্ছ জলের বিশাল ঝিল। বর্ষা এলেই উড়ে আসে পরিযায়ী বালিহাঁসের দল। জ্যোৎস্না রাতে হাতির পাল ঝিলে জল খেতে আসে। বাইরের জগতের মানুষের কাছে আজও অজানা ঝিল উপত্যকা। ধীরে ধীরে হলেওএই এলাকা নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দিচ্ছে।
দহিজুড়ি থেকে পরিহাটি যাওয়ার পথে বুড়িশোলের জঙ্গল। ডানদিকে মোরামের পথ ধরে এগলেই কপাটকাটার সবুজ উপত্যকার দেখা মিলবে। এক মাইলের বেশি এলাকাজুড়ে উপত্যকাটি ছড়িয়ে আছে। পশ্চিম দিক ঘন শাল বনের গভীরজঙ্গল। উত্তরে মালাবতীর বনভূমি। বুড়িশোল বা কুশাবনির জঙ্গল পার হলেই ঝিল উপত্যকার সৌন্দর্য চোখে পড়বে। ভোরের আলোয় ঝিলের জলের রং লাল হয়ে ওঠে। দিনে সূর্যের রোদে জলের রং রুপোলি রূপ ধারণ করে। ঝিলেছোট ছোট মাছেরা মনের আনন্দে খেলা করে। উপত্যকার গাছে গাছে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় নীলকন্ঠ পাখিরা। উপত্যকারচারপাশে ছোট ছোট গ্ৰাম। স্থানীয় মানুষের জীবন জঙ্গল ও উপত্যকাকে কেন্দ্র করে চলে। একদশক আগে জঙ্গলঘেরা উপত্যকায় বনপার্টির দল সশস্ত্র ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। ঝিল উপত্যকা মাওবাদীদের রেড করিডরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। কপাটকাটা বাইরের জগৎ থেকেনতুন করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।
ঋতুতে ঋতুতে বদলানো ঝিল উপত্যকার রূপের কথা নতুন করে শোনা যাচ্ছে। প্রখর গ্ৰীষ্মে উপত্যকার সকাল ও সন্ধ্যার রূপ মনোরম। বর্ষায় সবুজ আচ্ছাদনের গালিচায় চারপাশ ঢেকে যায়। শীতে পরিযায়ী পাখির দল ঝিলের জলে ভেসে বেড়ায়। ঝিল উপত্যকার উত্তর প্রান্ত যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে খালের উপর ছোট সেতু রয়েছে। সেতুর একদিকে বেলপাহাড়ী, অপর দিকে বিনপুর-১ ব্লকে যাওয়া যায়। কপাটকাটা গ্ৰামের বাসিন্দা তিরিশ বছরের ডাক্তার সরেন বলেন, কাজের প্রয়োজনে এলাকার মানুষ বাইরে যান। খুব প্রয়োজন না পড়লে জঙ্গল ও এই উপত্যকার মধ্যেই আমরা জীবন কাটাতে ভালোবাসি। নির্জন এই এলাকায় ছোট পর্যটকদের আসতে দেখিনা। বনপার্টির লোকেরা আসায় বাইরের মানুষের এখানে আসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।এখন ভয়ের পরিবেশ আর নেই। বাইরের মানুষজনের আনাগোনা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বুড়িশোল গ্ৰামের বাসিন্দা রঞ্জিত মাহাত বলেন, কুশবনি বা বুড়িশোলের জঙ্গলের উত্তরে ঝিল উপত্যকা। পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচয় পেলে এখানে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের আর্থিক আয় বাড়বে। এখনও এই এলাকার কথা খুব বেশি মানুষজন জানেননা, যা আমাদের কাছেও বিস্ময়। ঝাড়গ্রাম হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ঝাড়গ্রামে এমন অনেক জায়গা আছে, যা আজও অজানা রয়ে গিয়েছে। পর্যটকরা এখানে এলে নতুন এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুখোমুখী হবেন। স্থানীয় আদিবাসী যুবক-যুবতীরা কাজ পাবেন। জেলার পর্যটনের প্রসার ঘটবে। ঝাড়গ্রাম পর্যটন দপ্তরের আধিকারিক বিধান ঘোষ বলেন, কপাটকাটার ঝিল উপত্যকাকে পর্যটনস্থল হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে।-নিজস্ব চিত্র