রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: মাত্র পাঁচ মাস আগের কথা। বিধানসভা ভোটে উগ্র হিন্দুত্বের জিগির তুলেছিল বঙ্গ বিজেপি। ফলস্বরূপ ৪৬ শতাংশ রাজ্যবাসীর সমর্থনে ২০৭টি আসনে জিতে বাংলায় প্রথমবার সরকার গড়েছে পদ্ম পার্টি। দুর্গাপুজোর ঠিক আগে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর কেন্দ্রে উপনির্বাচন। আবার কালীপুজো মিটলে কলকাতা-হাওড়া সহ একাধিক কর্পোরেশন ও পুরসভার ভোট। পালাবদলের সরকারের অ্যাসিড টেস্ট। বিরোধী পরিসর ছন্নছাড়া হলেও তাই এতটুকু ফাঁক রাখতে চাইছে না বিজেপি। তাই পরীক্ষিত ‘হিন্দু লাইন’ মেনেই আসন্ন ভোট বৈতরণী পেরতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। এক্ষেত্রে দলের সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি রাজ্য সরকারের বিবিধ সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা উপনির্বাচনে কতটা ডিভিডেন্ড দেয়, তা নিয়ে অঙ্ক কষা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্যের এক মন্ত্রীর কথায়, ‘বৃহস্পতিবারই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে অন্নপূর্ণা যোজনা পাওয়ার যোগ্য সব হিন্দু মহিলার অ্যাকাউন্টে ৩ হাজার টাকা ঢুকে গিয়েছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভোটমুখী এই দুই কেন্দ্রে বিশেষ ড্রাইভ নেওয়া হয়েছিল।’
ওই মন্ত্রী আরও বলেন, ‘নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে একটা বড়ো সংখ্যায় মুসলমান ভোটার রয়েছে। ভোট ঘোষণার বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার শুরু করেছে। গত ১৫ বছরে এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রের হিন্দু বাসিন্দাদের উপর ঘটা করে রোজকার অত্যচারের স্মৃতি তুলে ধরছেন স্বয়ংসেবকরা। লাভ জিহাদ-ল্যান্ড জিহাদের শিকার হাওয়া ভোটারদের সামনে রেখে হিন্দু ঐক্য আরও মজুবত করতে সচেষ্ট আরএসএস।’ বঙ্গ বিজেপির রাজ্য কমিটির এক নেতার দাবি, ‘রেজিনগরে এখনও দলীয় সংগঠন ততটা শক্তিশালী নয়। তাই আরএসএস ও সরকারি প্রকল্পকে মূলধন করেই মুর্শিদাবাদের ওই কেন্দ্রে ভোটে নামছি আমরা।’ তাঁর কথায়, ‘হুমায়ুন কবির-কালীঘাট তৃণমূল-ঋতব্রত তৃণমূল-বাম-কংগ্রেসের ভোট ভাগাভাগিতে মুসলমান ভোট ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। আমরা কাঙ্ক্ষিত হিন্দু ভোট পেলেই রেজিনগরে ‘পদ্ম ফোটা’ স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে গড়া নন্দীগ্রামে অবশ্য এগিয়ে থেকেই শুরু করছে বিজেপি। একদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর স্বচ্ছ ভাবমুর্তি। অন্যদিকে, তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মায়ের সমর্থনে মানুষের আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি। নন্দীগ্রামের একটি ব্লকে মুসলমান ভোটাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ফ্যাক্টর সেই ‘জাগ্রত সনাতন’। বিজেপির ওই রাজ্য কমিটির নেতার দাবি, ‘গত বিধানসভা ভোটে বাম ও কংগ্রেস মিলিতভাবে মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট এবার টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।’ সেটাই বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দেবে বলে মনে করেন ওই নেতা। তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দিনে বিজেপির লক্ষ্য রাজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি হিন্দু ভোটারদের সমর্থন। সেই লক্ষ্যে আমরা দলগত ও প্রশাসনিকভাবে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছি। গত ৫০ বছরে বাম-তৃণমূলের সরকার মুসলমান তোষণের নামে হিন্দুদের আর্থ-সামাজিকভাবে বঞ্চিত করেছে। সেই শোষণের শেষের শুরু হয়েছে।’ তবে রাষ্ট্রবাদী মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে বাংলার প্রকৃত উন্নয়নে শরিক হতে বিজেপির নীতিগত কোনো সমস্যা নেই বলেই জানিয়েছেন ওই নেতা।