অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: বছর ঘুরলেই বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার শাখা সংগঠনে বেশ কিছু রদবদল করল শাসকদল তৃণমূল। দলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের রাশ টানতেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, শাখা সংগঠনে পদগুলির শীর্ষে সামঞ্জস্য রেখেই নেতৃত্বদের বসানো হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, জেলা সভাপতি মহুয়ামৈত্রর অঙ্গুলি হেলনেই বিধানসভার নির্বাচনের আগেই এই রদবদল। যাতে ভোটের সময় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কাঁটায় বিদ্ধ হতে না হয় দলকে। পাশাপাশি, কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার সাংগঠনিক রাশওযাতে পুরোপুরি মহুয়ার হাতে থাকে, সেটাও রদবদলের লক্ষ্য হতে পারে বলে রাজনীতির কারবারিদের ধারণা। তৃণমূলের জেলা সভাপতি অবশ্য এসব সমীকরণে না গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের শাখা সংগঠনে বেশি কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। ছাব্বিশে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আমাদের সংগঠনে আরও মজবুত হতে চলেছে। সেই মতো কাজ করা হচ্ছে।’
তৃণমূলের ঘোষণা অনুযায়ী, কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলায় যুব সভাপতিকে বদল করা হয়েছে। এতদিন পদেরদায়িত্বে ছিলেন সুশান্ত মণ্ডল। তাঁকে তৃণমূল কংগ্রেসের যুবর রাজ্য কমিটির সম্পাদক করা হয়েছে। সেই জায়গায় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলার অয়ন দত্তকে। এর পিছনে তৃণমূলের কূটনৈতিক চাল রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, তৃণমূলের দাপুটে প্রাক্তন ও প্রয়াত জেলা সভাপতি গৌরীদত্তের ছেলে হলেন অয়ন দত্ত। রাজনৈতিক মহলের দাবি, প্রাক্তন জেলা সভাপতি গৌরী দত্তের সময় করিমপুরের বিধায়ক হিসেবে জেলা রাজনীতিতে উত্থান হয়েছিল মহুয়া মৈত্রের। গৌরীবাবু জেলা সভাপতি থাকাকালীন ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে সাংসদ হন তিনি। তারপর থেকে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ থেকে গৌরী দত্তকে সরিয়ে মহুয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একুশে বিধানসভা নির্বাচনের আগে গৌরী দত্ত ও তাঁর ছেলে অয়ন দত্ত বিজেপিতে যোগ দেন। সেইসঙ্গে ঘাসফুল শিবিরের সঙ্গে দত্তবাড়ির সম্পর্কে ছিন্ন হয়। ২০২২ সালের পুরসভা নির্বাচনে অয়ন দত্ত নির্দল হিসেবে জয়ী হন।পরে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। জনপ্রতিনিধি হলেও দীর্ঘ সময় তৃণমূলের জেলার রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন তিনি। একসময় মহুয়া-বিরোধী গোষ্ঠীর লোক হিসেবেই পরিচিতি ছিল তাঁর। সম্প্রতি সেই বরফ গলেছে। সেই কারণেই বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে মহুয়ার হাত ধরেই অয়নের জেলার রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন হল।
গত লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগরের অন্তর্গত কৃষ্ণনগর শহরে তৃণমূলের মুখ পুড়েছিল। অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে শহরের নেতৃত্বের অভাবের বিষয়টি। সেই অভাব না মেটাতে পারলে আসছে বিধানসভা নির্বাচনেও কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা আসনে তৃণমূলের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন ছিল। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন নেতারা। সেই জায়গায় কাউন্সিলার অয়ন দত্তকে যুব সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে রাজনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে তৃণমূল। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অয়ন এদিন অবশ্য বলেন, ‘দল আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দলের কাছে কৃতজ্ঞ। সকলকে নিয়ে চলব। সংগঠনকে আরও মজবুত করাই আমার লক্ষ্য।’ এদিকে, কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার আইএনটিটিইউসির জেলা সভাপতি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তেহট্টের জুলফিকার আলি খানকে।অতীতে তাঁকে মহুয়া গোষ্ঠী ও বিধায়ক গোষ্ঠী উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে দেখা গিয়েছে। বিধায়ক তাপস সাহার মৃত্যুর পর তেহট্টর বিধানসভা রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্যই জুলফিকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এনিয়ে নবনিযুক্ত সভাপতি বলেন, দল আমাকে যে গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন তাতে আমি খুশি। তাঁদের আস্থার মর্যাদা রেখে সকলকে নিয়ে চলব। ছাব্বিশের বিধানসভাই আমাদের পাখির চোখ। পাশাপাশি কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী পদে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মল্লিকা চট্টোপাধ্যায়কে।