কেলেঙ্কারির আরেক নাম ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’। ২০১৪ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বছরখানেকের মধ্যে ২০১৫-র ২২ জানুয়ারি পানিপথে দাঁড়িয়ে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে এই প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। প্রধানত লিঙ্গবৈষম্যের অবসান ঘটানো এবং নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তাঁর এই কর্মসূচি বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নারী কল্যাণে তাঁর এই ঘোষণায় সাড়া পড়ে যায়। তার পরের এক দশক এই প্রকল্পের জয়গান শোনা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি প্রকল্পের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছে, এই কর্মসূচি বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করেছে। এই প্রকল্প কন্যা-শিশুদের শিক্ষা ও সুযোগের অ্যাক্সেস নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করেছে। বৈষম্য দূর করতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রকল্পটি কন্যা-শিশুদের শিক্ষা ও স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী এও দাবি করেন, মেয়েদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দশ বছরের পূর্তির দিনে নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেসব দাবি করেছেন তার অন্তত কিছুটা সত্যি হলেও যে কোনও ভারতীয়ের ছাতি ফুলে ৫৬ ইঞ্চি হয়ে যেত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একটা চেনা কৌশল হল, প্রকাশ্যে তিনি যা বলেন পরে আর তার দায়িত্ব নেন না। যেহেতু তিনি খুব একটা সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন না তাই তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। আর বিরোধীদের সমালোচনা তিনি বিশেষ কানে তোলেন না।
Advertisement
অথচ এই প্রকল্পের প্রায় শুরু থেকেই বিতর্ক পিছু নিয়েছে। প্রথম বিতর্ক উঠেছে প্রকল্পের প্রচারে বিজ্ঞাপনের খরচ নিয়ে। সত্যি যাকে বলে ‘মুখ’ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। বিজেপি সাংসদ হিনা গাভিটের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি কয়েকবছর আগে রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই প্রকল্পে মোট ৪৪৬ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে কেন্দ্র। তার ৭৯.৯১ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাবদ। এই তথ্য সামনে আসতেই বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, কাজের বদলে প্রচারই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সংসদে পেশ করা সেই রিপোর্টে এও দেখা গিয়েছে, ওই চার বছরের প্রতিবছর বিজ্ঞাপনে খরচের হারও বাড়ানো হয়েছে। বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞাপনের একটা বড় জায়গা জুড়ে থেকেছে প্রধানমন্ত্রীর মুখের ছবি। প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর দাবি নিয়েও। নারী শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা, নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী লম্বা-চওড়া দাবি করলেও ঘটনা হল, মোদি জমানায় দেশে প্রতি ঘণ্টায় ৪৩টি নারী নির্যাতনের রেকর্ড হচ্ছে। সমাজে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দলিত-উপজাতি শ্রেণির নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ২২টি অপরাধের রেকর্ড হচ্ছে। হাতরাস কিংবা উন্নাও-এর দলিত কন্যা, মণিপুরের নির্যাতিতা মহিলা কিংবা চ্যাম্পিয়ান মহিলা কুস্তিগির— প্রায় সব ক্ষেত্রেই মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় প্রশ্ন উঠেছে। এও দেখা গিয়েছে, মোদি সরকার নির্যাতিতাদের পাশে না দাঁড়িয়ে অপরাধীদের কখনও বা আড়াল করার চেষ্টা করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যের দাবি আর নারী নির্যাতনের এই বাস্তব ছবির মধ্যেই ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প নিয়ে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মোদি সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রক স্বীকার করেছে, গত দশ বছরে এই প্রকল্পে মোট ৯৫২ কোটি ৪ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হলেও তার মধ্যে ৪৫৫ কোটি টাকার কোনও হিসাব নেই! মন্ত্রক জানিয়েছে, মোট বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত রাজ্যগুলিকে দেওয়া হয়েছে ৪৯৬ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা। বাকি ৪৫৫ কোটি টাকা ভ্যানিশ! এও সম্ভব! আবার ৩৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত খরচ করতে পেরেছে ৩৭০ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা। বাকি ১২৬ কোটি পড়ে রয়েছে রাজ্যগুলির কোষাগারে। সরকারি অর্থের এমন নয়ছয়ের হিসাব তুলে ধরেছে কেন্দ্রেরই একটি মন্ত্রক। তবু স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’ এ নিয়ে ‘রা’ কাটছেন না! কারণ তাহলে যে তাঁর সরকারকে জনমানসে বেআব্রু হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যের দাবি আর নারী নির্যাতনের এই বাস্তব ছবির মধ্যেই ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প নিয়ে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মোদি সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রক স্বীকার করেছে, গত দশ বছরে এই প্রকল্পে মোট ৯৫২ কোটি ৪ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হলেও তার মধ্যে ৪৫৫ কোটি টাকার কোনও হিসাব নেই! মন্ত্রক জানিয়েছে, মোট বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত রাজ্যগুলিকে দেওয়া হয়েছে ৪৯৬ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা। বাকি ৪৫৫ কোটি টাকা ভ্যানিশ! এও সম্ভব! আবার ৩৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত খরচ করতে পেরেছে ৩৭০ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা। বাকি ১২৬ কোটি পড়ে রয়েছে রাজ্যগুলির কোষাগারে। সরকারি অর্থের এমন নয়ছয়ের হিসাব তুলে ধরেছে কেন্দ্রেরই একটি মন্ত্রক। তবু স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’ এ নিয়ে ‘রা’ কাটছেন না! কারণ তাহলে যে তাঁর সরকারকে জনমানসে বেআব্রু হতে হবে।


