শ্রীকান্ত পড়্যা, ভগবানপুর: গ্রামের একাধিক পরিবারের মূল জীবিকা লোকঠকানো। এক-দু’বছর নয়, প্রায় ৬০বছর ধরে ভগবানপুর থানার নারায়ণদাঁড়ি গ্রামের মণ্ডলপাড়ার বেশকিছু পরিবারের এটাই মূল পেশা। টাকা ডবল করার টোপ দিয়ে ‘সায়েন্টিফিক’ উপায়ে চিটিং করে মানুষ ঠকিয়ে উপার্জনই লক্ষ্য। শুধুমাত্র পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিস নয়, গোটা রাজ্যের বিভিন্ন থানা থেকে পুলিসের টিম এই গ্রামে হানা দিয়েছে। ভিনরাজ্য থেকেও পুলিস এই গ্রামে একাধিকবার হানা দিয়েছে। মানুষ ঠকানোকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়ায় গ্রামের বদনাম রয়েছে। যেকারণে গ্রামের অনেক গৃহস্থ ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। যদিও গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ চাইছেন, বিপথগামীরা মানুষ ঠকানোর কারবার থেকে সরে আসুক। তাতে গ্রামের দুর্নাম ঘুচবে।
Advertisement
দীঘাগামী ১১৬বি জাতীয় সড়কে বাজাবেড়িয়া বাসস্টপ থেকে দু’কিলোমিটার ভিতরে নারায়ণদাঁড়ি গ্রাম। ওই গ্রামের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা মণীন্দ্রনাথ মণ্ডল বহুবার পুলিসের হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁর হাত ধরে টাকা ডবল করার নামে মানুষ ঠকানোর এক নতুন পেশা জন্ম নিয়েছিল। মণীন্দ্রনাথ বেঁচে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে বাচনভঙ্গিতে মুন্সিয়ানা রপ্ত করে অসংখ্য মানুষকে ঠকানোর অভিযোগ ছিল। শুধু তাই নয়, ওই ব্যক্তি মানুষ ঠকানোর পাঠশালা খুলেছিলেন। সেখানে এরাজ্যের পাশাপাশি বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও লোকজন এসে প্রতারণার কৌশল শিখত। মণীন্দ্রনাথ মারা গেলেও তাঁর অসংখ্য শিক্ষানবিশ ওই পেশায় জড়িত। নারায়ণদাঁড়ি গ্রামের একটা বড় অংশ এই পেশা ছাড়তে পারেনি। গ্রামের অনেকেই জেল খেটেছে। রাজ্যের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাই থেকে বর্ধমানের প্রাক্তন পুলিস সুপারের আত্মীয় সহ অনেকে নারায়ণদাঁড়ি গ্রামের এই ঠগবাজদের খপ্পরে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছেন। ঠগবাজদের এই গ্যাংয়ের অপারেশন অভিনব। নানা জায়গায় কল সেন্টার খুলে আর্থিকভাবে সম্পন্ন ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়। দীঘার হোটেল বিক্রি কিংবা সোনার গণেশ মূর্তি বিক্রির মতো মোটা অঙ্কের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি কম দামে বিক্রির টোপ ফেলা হয়। ক্রেতা জোগাড় হলে চণ্ডীপুর কিংবা বাজকুলে নামিয়ে গাড়িতে তুলে একটা ছিমছাম অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। গদি দেওয়া চেয়ারে একজন স্যুট-বুট পরে বসে থাকে। নিজেকে টাঁকশালের কর্মী পরিচয় দেয়। টাঁকশাল থেকে আসল নোটের কাগজ বের করে নিজেদের মেশিনে ছাপিয়েছে বলে গল্প ফাঁদে। ওই নোট বাজারে চালাতে পারলেই ডবল অঙ্কের টাকা দেওয়ার টোপ। নমুনা হিসেবে চার-পাঁচটা পাঁচশোর নোট ফ্রি। এভাবে অরিজিনাল নোট দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়। স্রেফ কথায় কথায় চার-পাঁচটা পাঁচশো টাকার নোট তুলে বাজারে চালানো যায় কিনা পরখ করতে দেওয়া হয়। আসল ওইসব নোট দিয়ে কেনাকাটায় কোনও অসুবিধা হয় না। এভাবে ওই গ্যাং প্রথমে ‘শিকারে’র আস্থা অর্জন করে। এরপরই শুরু হয় প্রতারকদের আসল খেলা। নানা কৌশলে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে পথে বসিয়ে দেয়। নারায়ণদাঁড়ি প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্কুলের জমিদাতা চন্দনেশ্বর প্রধান বলেন, মানুষ ঠকানোর জন্য আমাদের গ্রামের বদনাম রয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন হলে খুব ভালো হয়। গ্রামের আর এক বাসিন্দা শেখ মুস্তাফি বলেন, গ্রামের একাধিক পরিবার মানুষ ঠকানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য দেবব্রত দাস বলেন, এখন আগের থেকে পরিস্থিতি একটু ভালো হয়েছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতা সাধন দাসঅধিকারী বলেন, মণীন্দ্রনাথ মণ্ডলের হাত ধরে এই গ্রামে মানুষ ঠকানোর গ্যাং তৈরি হয়। রাজ্যের বহু মানুষ ঠকেছেন।



