নীতীশ চক্রবর্তী, পানিহাটি: তপ্ত গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকাল। পানিহাটির মহোৎসবতলা গঙ্গার ঘাটে ভিড় বাড়ছে একটু একটু করে। কেউ আড্ডা দিচ্ছেন। কেউ স্রেফ হাঁটছেন। দুপুরেই পানিহাটির বুকে বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে সভা করে গিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বেশিরভাগ জটলায় কথাবার্তার সেটাই হট-টপিক। দুই প্রবীণের কথোপকথন কানে এলে। ‘ভাবা যায়! এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী পানিহাটির বুকে জনসভা করলেন।’ অন্যজন সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘জাতে উঠে গেল আমাদের বিধানসভা কেন্দ্র।’
খুব একটা ভুল বলেননি ওই প্রবীণ! অতীতের নির্বাচনগুলিতে আপাত সাদামাটা এই কেন্দ্রকে নিয়ে তেমন কারও মাথাব্যথা ছিল না। এবারের ভোটে উত্তর শহরতলির সেই পানিহাটি ‘হাইভোল্টেজ’ আসনে পরিণত হয়েছে। সৌজন্যে ‘অভয়ার মা’ তথা বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথ। বছর দুই আগে আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের খবর ধাক্কা দিয়েছিল গোটা সমাজকে। তখন কে জানত, হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে উত্তাল পানিহাটি পরিণত হবে নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মেয়ের মর্মান্তিক পরিণতির সুবিচার দাবি করে একেবারে শেষ মুহূর্তে বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হিসাবে ভোটে লড়ছেন নির্যাতিতার মা। তাই এখন আর শুধু রাজনীতি নয়, আবেগ আর সহানুভূতির উপরও অনেকখানি নির্ভর করছে পানিহাটির প্রার্থীদের ভোট-ভাগ্য।
পানিহাটি কেন্দ্রে এবার কি লড়াইটা ত্রিমুখী? তৃণমূল, বিজেপি এবং সিপিএম? প্রশ্ন শুনে অর্থবোধক হাসি হাসছেন ভোটাররা। তবে নিকাশি, জল জমার সমস্যা থাকলেও এবারের ভোটে সেসব আড়ালে চলে গিয়েছে। মুখ্য হয়ে উঠেছে ‘অভয়া’। যুযুধান দলগুলির প্রার্থী দেখলেই বোঝা যাবে। বিজেপির মতোই অভয়া ইস্যুতে ভর করে ভোট-বৈতরণী পেরতে এখানে কলতান দাশগুপ্তকে প্রার্থী করেছে সিপিএম। অন্যদিকে, বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পরিবর্তে তৃণমূল টিকিট দিয়েছে তাঁরই ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে। এলাকাবাসীর কাছে তিনি পাড়ার ছেলে ‘পুচি’। সেই ইমেজ আর বাবার দক্ষ সাংগঠনিক ক্ষমতার জোরে প্রচার চালাচ্ছেন তীর্থঙ্কর। বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটের লড়াইকে কীভাবে দেখছেন? তীর্থঙ্করবাবু উত্তর, ‘কাকিমার সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। তবে তাঁর দলের বিরুদ্ধে আমার অনেক অভিযোগ রয়েছে। এটা রাজনীতির লড়াই। বিজেপি যেভাবে বাংলার সংস্কৃতি নষ্ট করে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। পানিহাটির মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন। পানিহাটিজুড়ে প্রচুর কাজ হয়েছে। প্রচারে আমার আলাদা করে কিছু বলার বা করার নেই।’ বিজেপি প্রার্থীকে নিয়ে সাবধানী সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তও। তাঁর কথায়, ‘উনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নন। কাকিমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভোটের প্রভাব পড়বে না। কিন্তু সুবিচারের দাবিতে আমাদের লড়াই চলবে। এছাড়া এলাকার সমস্যাগুলি নিয়ে আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি। বোঝাচ্ছি— বামপন্থাই একমাত্র বিকল্প।’
যাঁকে নিয়ে এতে আলোচনা, তাঁর কী বক্তব্য? রত্নাদেবী বলছেন, ‘আমি সুবিচার পাইনি। সেটা পেলে এত মানুষ পথে নামতেন না। মেয়েকে হারিয়েছি। নতুন করে কিছু পাওয়ার নেই আমার। কিন্তু, পানিহাটিবাসীকে অনেক কিছু দেওয়ার আছে। আমি বিধানসভায় গিয়ে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বলতে পারব। মানুষক বলছি, আমার জয় মানে আপনাদেরই জয়।’
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। গঙ্গার ঘাট থেকে টোটোয় চেপে পৌঁছে যাওয়া গেল সোদপুরের সবচেয়ে ‘হ্যাপেনিং স্পট’ ট্রাফিক মোড়ে। নামজাদা ব্র্যান্ডের শো-রুম, খানকতক শপিং মল, গুচ্ছের রেস্তরাঁয় জমজমাট এলাকা। কেনাকাটা সেরে বেরচ্ছিলেন ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা শ্রবণা হালদার। ভোট নিয়ে প্রশ্ন করতেই সটান বলে দিলেন, ‘রাজনীতির অঙ্ক খুব জটিল। অভয়ার মা সেটা বুঝতে পেরেছেন হয়তো। কলকাতা পুলিশ না হয় তাঁর মেয়েকে বিচার দিতে পারেনি। মোদি সরকারের সিবিআই কি পেরেছে? মেয়ের আবেগ উনি ভোট পাওয়ার কাজে লাগাচ্ছেন। উলটোদিকে তৃণমূল কিন্তু মানুষের কাজ করে গিয়েছে। তা সে পাড়ার রাস্তা মেরামত হোক বা এসআইআরে বিপর্যস্ত জনতার পাশে দাঁড়ানো।’
সত্যিই কি তাই? এইচ বি টাউনের বর্ষীয়ান বাসিন্দা নন্দলাল দে বলছেন, ‘অভয়া ইস্যুকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। রাজনৈতিক সংস্রবহীন এলাকার মহিলারা কিন্তু অভয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল।’ তবে অভয়ার পাড়া লাগোয়া ঘোলার এক তৃণমূল কর্মী বেশ আত্মবিশ্বাসী। তাঁর কথায়, ‘ভোটে উন্নয়নই শেষ কথা বলে। অভয়াকে অস্ত্র করে ভোট-বৈতরণী পেরতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু পানিহাটিবাসী জানে, অভয়া আন্দোলনে বিজেপির কখনও কোনো অস্তিত্বই ছিল না।’ হিসাব কষে চলেছে সব পক্ষ। কাদের অঙ্ক মিলল, জানা যাবে ৪ মে। নিজস্ব চিত্র