Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘মাথাটা মুখে পুরে নিল...’ সুন্দরবনের গল্পদাদু আশিস, বাঘের হাত থেকে বাঁচার কাহিনি শুনতে ভিড় করেন বিদেশিরাও

চোখের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে বাঘের ভয়াবহ মুখটা। লালা গড়িয়ে পড়ল চোখের উপর। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফেরে আট মাস পর।

‘মাথাটা মুখে পুরে নিল...’ সুন্দরবনের গল্পদাদু আশিস, বাঘের হাত থেকে বাঁচার কাহিনি শুনতে ভিড় করেন বিদেশিরাও
  • ১০ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: চোখের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে বাঘের ভয়াবহ মুখটা। লালা গড়িয়ে পড়ল চোখের উপর। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফেরে আট মাস পর। আয়নায় চোখে পড়ে, মাথার চতুর্দিকজুড়ে কাটাছেঁড়া। ক্ষতের দগদগে দাগ।

Advertisement

পরে জানলেন, যেভাবে মানুষ মাছের মুড়ো খায় সেভাবে তাঁর মাথাটা মুখে পুরে নিয়েছিল ভয়ঙ্কর জানোয়ারটা। গল্পে লেখা থাকে, ‘কড়মড় করে চিবিয়ে খেয়েছে বাঘ।’ এ ক্ষেত্রে অবশ্য সেভাবে চেবানোর সুযোগ পায়নি জন্তুটি। তবে তার দাঁতের চাপে খুলি ফেটে যাওয়ার শব্দ নিশ্চয় শুনতে পেয়েছিলেন আশিস দাসের সঙ্গীরা। 
আশিস বেঁচে যান। তবে কর্মক্ষমতা হারাতে হয়। কিন্তু এখন তিনিই সেলিব্রিটি। দুবাই, আমেরিকা, উত্তর কোরিয়া থেকে পর্যটকরা আসেন। গল্প শোনেন। তথ্যচিত্র তৈরি হয়।
এখন তাঁর মাথার চারপাশে শুকনো গাছের শিকড়ের মতো ছড়িয়ে থাকা শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। মাথা কামানো, নেড়া। চোখ এখনও আনমনা। দোভাষী সঙ্গে নিয়ে আসেন বিদেশিরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় গল্প শুনতে-গোসাবা ব্লকের বালি দ্বীপে বাড়ি আশিসের। ২০২২ সাল। জানুয়ারি মাসের কনকনে সকালে গ্রাম থেকে বেরিয়ে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বিদ্যাধরী নদীর দিকে রওনা দিয়েছিলেন। সঙ্গে কয়েকজন সঙ্গী। টানা সাতদিন মাছ ধরলেন। সকলে ক্লান্ত। বিকেলে নৌকা নোঙর করা হল। বাড়ি ফেরার কথা পরেরদিন। সঙ্গীরা রান্নাবান্না বসালেন। আশিসের শরীরটা খারাপ। নৌকার এক কোণে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। প্রবল আর্ত চিৎকারে হঠাৎ তন্দ্রা ভাঙে। মুখ থেকে চাদর সরালেন। এরপর গোটা বিষয়টি শিকারের গল্পের মতো। 
বাঘের বিশাল মুখটা, গড়িয়ে পড়া লালা, চোখের হিংস্র দৃষ্টি, ধারাল শ্ব-দন্ত, শ্বাসপ্রশ্বাস যেন গা পুড়িয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে বিশাল হাঁ-টা এগিয়ে আসছে। আশিসের ততক্ষণে দমবন্ধ। যেন স্লো মোশনে মাথাটা নিজের মুখে ঢুকিয়ে নিচ্ছে সুন্দরবনের রাজা। এরপর আশিসের জ্ঞান ফেরে সেই হাসপাতালে। তারপর জেনেছেন, নখের আঁচড়ে ফালাফাল গোটা পিঠ। কান ক্ষতবিক্ষত। অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়ে আশিস এখন পর্যটকদের বলেন, ‘তারপর কী হয়েছিল কিছুই মনে নেই এখন।’ প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল। তারপর কলকাতার একাধিক নামকরা হাসপাতাল। মাথায় একাধিক অস্ত্রোপচার। চিকিৎসার জন্য বাড়ির লোক সাত বিঘা জমি বিক্রি করেন। এখনও একটি অপারেশন বাকি। মোটেও কাজ করতে পারেন না আশিস। যেখানে যেখানে জন্তুটা কামড়েছিল সে জায়গাগুলি টিপটিপ করে। খুব যন্ত্রণা। এই কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে গোসাবাজুড়ে। ট্যুর অপারেটররা তাতে কল্পনার রং মিশিয়ে পর্যটকদের বলেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আশিস অচিরেই বিখ্যাত। গল্প শুনতে বিদেশিদের ভিড়। বহু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে বিদেশি পর্যটকরা অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ চান বেঁচে যাওয়ার রোমহর্ষক কাহিনি নিজের কানে শুনে। বাঘের কামড়ের লড়াইয়ে জিতেও আশিসের কিন্তু বিশ্রাম নেই। এখন লড়াই দারিদ্রের সঙ্গে। আরও একটি অস্ত্রোপচারের টাকা লাগবে। খেয়ে পরে বাঁচতে হবে। পর্যটকরা টুকটাক সাহায্য করেন। সে ক্ষুদ্র সাহায্যই এখন জীবন চালাতে ভরসা। নিজের গল্পটা তাই নিজেই রোজ একবার ঝালিয়ে নেন। আরও ভালো করে গল্প শোনালে যদি বেশি সাহায্য মেলে, অপারেশনের টাকাটার কিছুটা সুরাহা হয়।  আশিস দাস। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ