


এপ্রিলের দুপুর তখন বিকেলের কাঁধে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। স্ট্যান্ড বাই মোডে রয়েছে সন্ধে। একটু পরে তার ডিউটি শুরু হবে। জঙ্গুলে পথে ধুলোর আলপনা। হঠাৎই দূরে চোখে পড়ল একটা ঘূর্ণায়মাণ সাদাটে আলো। না! আমার চোখে পড়েনি। আলোটা প্রথম দেখলেন প্রমোদ। জিপসির সামনের সিটে বসে আলো লক্ষ্য করে গাড়ি চালাতে নির্দেশ দিলেন। ছুটল জিপসি। আলোর কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি ব্রেক কষল। সামনে তখন শুকনো পাতার বিছানায় বসে রয়েছে কালী। ক্যানোপির ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের রোদ্দুর এসে পড়েছে তার হলুদ, কালো ডোরাকাটা গায়ে। আমরা স্তব্ধ, নিশ্চুপ। কালীর অবশ্য সেসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। বিকেলের আলিস্যি লেগে রয়েছে তার রাজকীয় ভঙ্গিমায়। মিনিট দুয়েক পরে উঠে দাঁড়াল। বিরাট হাই তুলল। খানিক আড়মোড়া ভাঙার প্রচেষ্টা। গোটা তিনেক জিপসির দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল। পাতার বিছানার উপর দিয়ে দুলকি চালে হেঁটে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের গভীরে। আমাদের পরিভাষায় যা ‘কোর’ এরিয়া।
৪৯০ কিলোমিটার ছড়ানো উত্তরপ্রদেশের দুধওয়া ন্যাশনাল পার্ক। সেখানে কিষাণপুর গেটের প্রথম সাফারিতেই ‘কালী’ দর্শন হল। লখনউ বিমানবন্দরে নেমে ৪-৫ ঘণ্টার ড্রাইভে পৌঁছেছিলাম দুধওয়া। লাঞ্চ সেরেই বিকেলের সাফারি। জঙ্গুলে গন্ধ নাকে আসতেই মন ভালো হয়ে গেল। খানিক এগতেই একপাল হরিণ স্বাগত জানায়। তারপর শুরু হল ময়ূর দর্শন। কখনো গাছের ডালে। কখনো রাস্তার উপর পেখম তুলে নৃত্য। তার সঙ্গে কেকাধ্বনি। জঙ্গলের ভিতর একটি জলা জায়গায় একসঙ্গে প্রায় ১০টি ময়ূর পেখম তুলে নাচ দেখাচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, গোটা ৭-৮ ময়ূরীও রয়েছে আশপাশে। তাদের ইমপ্রেস করার চেষ্টায় কোনো খামতি রাখছে না ময়ূর বাহিনী। কিন্তু ময়ূরীর দল সার বেঁধে চলেছে। যেন সন্ধে নেমেছে, এবার বাড়ি ফিরতে হবে, ছোকরা ময়ূরের দলকে এখন পাত্তা না দিলেও চলবে, এমন মনোভাব।
সেখান থেকে গাড়ি মোড় ঘুরতেই ওই আলোর ইশারা চোখে পড়ে আমাদের গাইড প্রমোদের। দুধওয়ার জঙ্গলে কোথাও বাঘের দেখা মিললে মোবাইলের টর্চ জেলে এভাবেই অন্যান্য জিপসিকে সংকেত পাঠানো হয়। জঙ্গলের অন্দরে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না। এই জঙ্গলে কোনো ওয়াকিটকির ব্যবস্থাও নেই। অগত্যা...।
কালীর বয়স ৯ বছর। সঙ্গে দু’টি বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে এই বাঘিনি। যদিও ছানাদের দেখা আমরা পাইনি। জঙ্গলে ভিতর দিয়ে বয়ে গিয়েছে কালী নদী। তাকে আবার কোথাও সারদা নদী নামেও ডাকা হয়। নেপাল থেকে বয়ে আসা নদীর পাড়ে এই বাঘিনির জন্ম হয়েছিল। সে কারণেই ওর নাম হয়েছে কালী। তাকে দেখার পরের অনুভূতি ঠিক লিখে বা বলে বোঝানো যাবে না। তবে পাওনা এখানেই শেষ নয়। জীবন যে কোন বাঁকে কোন সারপ্রাইজ লুকিয়ে রেখেছে, তা বোঝা কঠিন। বাকি দু’টি জিপসি অন্য পথে এগল। আর আমাদেরটা ধরল নতুন এক পথ। কিন্তু খানিক এগতেই বিপদ! ঘন বনে তখন আঁধার ঘনিয়ে আসছে। আর আমাদের গাড়ি গেল বিগড়ে। যেহেতু বাকি গাড়িদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় নেই, তাই ওই পথে কখন অন্য গাড়ি আসবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। শুরু হল অপেক্ষা। পাখির ডাক বাড়ছে চারপাশে। আর বাড়ছে ভয়। এ পথে অন্য গাড়ি আসবে তো? যদিও জিপসির ড্রাইভার এবং গাইড ক্রমাগত মনোবল জোগাচ্ছেন। তাও এ এক অন্য ধরনের অনুভূতি। কিন্তু এই গাড়ি খারাপ হওয়া, এই অপেক্ষার প্রহরের চিত্রনাট্য যে অদৃষ্টে কেউ খুব যত্ন করে লিখেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেল খানিক বাদে। তখন মনে হল, ভাগ্যিস, খারাপ হয়েছিল গাড়ি!
প্রমোদের প্রত্যাশা মতো, মিনিট দশেকের মধ্যে ওই পথে এসে পড়ল অন্য জিপসি। তার পিছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে নেওয়া হল আমাদের গাড়ি। প্রথম গাড়িটি টেনে নিয়ে যাবে দ্বিতীয়টিকে। এই বন্দোবস্ত হওয়ার পর দ্রুত ছুটল জিপসি। ততক্ষণে চারপাশে অন্ধকার নামছে দ্রুত। সাফারির সময়ও প্রায় শেষ। বড়ো রাস্তার কাছাকাছি এসে প্রমোদ একটু চিৎকার করে সতর্ক করলেন, প্রথম গাড়ির চালক এবং গাইডকে। সতর্ক করার কারণ, প্রমোদ লক্ষ করেছেন, বাঁদর ‘কল’ দিচ্ছে। অর্থাৎ কাছাকাছি কোনো বড়ো জানোয়ার রয়েছে। গাড়ি বড়ো রাস্তায় উঠে বাঁদিকে বাঁক নিতেই দেখলাম, অন্য দিক থেকে আসা বড়ো বড়ো ট্রাক অনেকটা দূরত্ব রেখে ন্যাশনাল হাইওয়ের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। সব গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। আর কালো পিচের রাস্তায় সোনালি ঝিলিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটি প্রমাণ আকারের বাঘ। একবার ডানদিকে আর একবার বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে নিল দু’পাশের গাড়ির সারি। তারপর রাস্তা ক্রস করে একদিকের জঙ্গল থেকে পৌঁছে গেল অন্যদিকের জঙ্গলে। তার ডোরাকাটা চেহারা কালচে সবুজ অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইল সব গাড়ি। পড়ে পাওয়া চোদ্দোআনা এমন সব মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য জীবনকে ধন্যবাদ জানালাম।
পরের দিন দুধওয়া গেটে আবার নতুন চমক আমাদের অপেক্ষায় ছিল। জঙ্গলে ঢোকার অনেকটা আগে থেকেই সেদিন নজরে পড়ছে উইয়ের বড়ো বড়ো ঢিবি। যে জঙ্গলে যত বেশি উইয়ের ঢিবি থাকে, তার বাস্তুতন্ত্র তত ভালো। দুধওয়ায় জঙ্গলের চরিত্র কিষাণপুরের তুলনায় একেবারে আলাদা। এখানে সবুজ অনেক নিবিড়। জঙ্গল অনেক গভীর। আদিম অনুভূতির গা ছমছমে পরিবেশ এখানে বেশি। ঘণ্টা খানেক সাফারির পর সামনে এল এক ধূসর শেয়াল। সে গাড়ির আগে আগে লাফিয়ে লাফিয়ে চলল। যেন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। তারপর হঠাৎই বাঁদিকে পিঠটান দিল। জঙ্গলে সেদিন কয়েকটি জিপসির দাঁতাল দর্শন হয়েছে। এ খবর পেয়েছি আগেই। যখন তখন সে দেখা দিতে পারে, এই উত্তেজনা ছিলই। সে তো দেখা দিলই, সঙ্গে তার দলবল। সাধারণত দাঁতাল হাতি একাই জঙ্গলে ঘোরে। কিন্তু দুধওয়ার অন্দরে ছোটো, বড়ো মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০টি জঙ্গলি হাতির দলের দেখা পেলাম। বড়ো ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে খানিক দূরে তারা খাবার খেতে ব্যস্ত। কেউ বা ধুলো মাখছে গায়ে। কেউ কান নাড়িয়ে দিচ্ছে নানা সংকেত। আর তাদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই দাঁতাল! চকচকে রোদ্দুরে ঝলসে উঠছে তার দুধসাদা দাঁত।
জিপসি ফের এগল। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতেই শুকনো পাতায় কার যেন দৌড়নোর শব্দ। গাড়ি ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানেই। ঘন গাছের পিছন থেকে উঁকি দিল ছোটো ঘোড়ার মতো একটা প্রাণী। প্রমোদ বললেন, নীলগাই। শব্দহীন অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে মুহূর্ত। ধূসর নীল রঙের প্রাণীটা হালকা পায়ে যেন জগিং করতে বেরিয়েছে। সামান্য পোজ দিয়েই ব্যস্ত ভাবে চলে গেল নিজের কাজে। ফের এগলাম আমরা। এদিক ওদিক চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে খুঁজে চলেছেন প্রমোদ। হঠাৎই বললেন, ওই দূরে গন্ডার রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাইনোকুলারে চোখ রাখলাম। কিন্তু কোথায় গন্ডার? এ তো উইয়ের ঢিবি মনে হচ্ছে! উপায় বাতলে দিলেন প্রমোদ। চলুন, একটু ঘুরপথে আর একটু সামনে থেকে দেখার চেষ্টা করি। জিপসি ছুটল নতুন পথে। যেখানে এসে দাঁড়াল সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, মা গন্ডার, সঙ্গে ছানা। দু’জনেই ঘাস খেতে খেতে সামনের দিকে এগচ্ছে। আর মাঝে মধ্যে মুখ তুলে জরিপ করে নিচ্ছে আশপাশ।
দুধওয়া ন্যাশনাল পার্কে ঢোকার চারটি গেট। একটি দুধওয়া। কিষাণপুরে দু’টি এবং অপর একটি কাতারনিয়া ঘাট। এই ট্রিপে দুধওয়া এবং কিষাণপুরে সাফারির সুযোগ হয়েছিল। ২০২২ সালের হিসেব অনুযায়ী কিষাণপুরে ছিল ৪১টি বাঘ। ৩৫টি বাঘ ছিল দুধওয়ায়। মর্নিং সাফারির সময় ভোর ৫.৩০ থেকে সকাল ৯.৩০ পর্যন্ত। আর বিকেলে জঙ্গলে ঢোকার গেট খোলে দুপুর ৩.৩০-এ। ৬.৩০-র মধ্যে সব জিপসিকে মূল গেটে পৌঁছনো বাধ্যতামূলক। এই নিয়মেই চলে এখানকার জঙ্গল।
সবুজের যে কত ভিন্নতা রয়েছে, তা জঙ্গল আপনাকে শেখাবে। তার উপর আলোর খেলা যেন পৃথিবীর সেরা ম্যাজিক। কোনো প্রাণীর দেখা পাওয়াটা ব্রাউনি পয়েন্ট। সেটা না হলেও শুধু জঙ্গলের শব্দ, গন্ধ, মায়া উপভোগ করতে জানতে হয়। আসলে চেকলিস্টে টিক দেওয়ার অভ্যেস থাকলে জঙ্গল আপনার জন্য নয়। শুধু জঙ্গলকে ভালোবেসে বেড়াতে যান। ব্রাউনি পয়েন্ট জোগাড় করে দেবে জীবন।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য