


পক্ষে
সুনীতা নাইয়া
বিয়েবাড়িতে বসে পাত পেড়ে খাওয়াই আমাদের বাঙালি জীবনের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। এখন যতই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুফের ব্যবস্থা হোক না কেন বসে খাওয়ার মধ্যে আলাদা এক তৃপ্তির অনুভূতি হয়। বয়স্করা অনেকেই আছেন যাঁরা এখনও বুফেতে খাওয়ায় অভ্যস্ত নয়। যতই আমরা আধুনিক হই না কেন বিয়েবাড়িতে বসে খাওয়ার রীতি চিরদিনই জনপ্রিয় থাকবে।
চাকুরিজীবী
সুপ্রিয়া সেন
বিয়েবাড়ি মানে হইচই মজা ঠাট্টা, আর দেদার খাওয়াদাওয়া। বাড়ির বয়স্ক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষরা চেয়ারে বসে সারাদিন রান্না পরিদর্শন করতেন। মাটিতে মাদুরের আসনে বসে কলাপাতা, মাটির গ্লাসে খাওয়া হত। ছোটোরা অতি উৎসাহে নুন, লেবু, জলের ভার নিত। পরিবেশনের ভার পাড়ার দাদারা বা বাড়ির কাকারা নিত। ‘আর এক পিস মাছ, আর একটা রসগোল্লা..!’ নানা আন্তরিক অনুরোধ চলত। বুফে সিস্টেম চালু হওয়ার পর খাওয়াদাওয়া নিয়ে কারও দায়িত্ব থাকে না। যে যার নিজের মতো খেয়ে চলে যায়। এখানে ঝরঝরে ভাব আছে কিন্তু নিজের হাতে পরিবেশনের আন্তরিক আদর ভালোবাসা নেই!
গৃহবধূ
পম্পা ঘোষ
সমস্ত ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেও বিয়েবাড়িতে বুফে ব্যবস্থার চেয়ে বসে খাওয়ানোই আভিজাত্য এবং প্রকৃত আতিথেয়তার পরিচায়ক। বাঙালির কাছে আজও অতিথি নারায়ণ। চিরন্তন সংস্কৃতিতে আপ্যায়ণ মানেই হল অতিথিকে পরম যত্নে বসিয়ে খাওয়ানো, যেখানে পরিবেশনকারীর আন্তরিকতা উৎসবের আনন্দকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া বসে খাওয়ার পদ্ধতিতে বিশৃঙ্খলা ও খাবারের অপচয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। কারণ পরিবেশনকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার পাতে তুলে দেন। ব্যক্তিগত আরাম এবং অতিথিদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করতে পঙ্ক্তি ভোজ বা বসে খাওয়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল একটি পদ্ধতি নয়, বরং পারিবারিক সৌজন্য ও সুশৃঙ্খল আভিজাত্যের মূর্ত প্রতীক।
গৃহবধূ
অর্পিতা দাস
কথাতেই আছে ভোজনরসিক বাঙালি ভোজেই তৃপ্ত। বর্তমান ইঁদুরদৌড়ের যুগে বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তৃপ্তমনে খাওয়াটা বোধহয় হয় না। সেখানে ভোজ একটি বিশেষ সুযোগ। বুফে খাওয়ায় খাওয়া তো হয় কিন্তু তাতে স্বাদ থাকে কই? আমরা যতই বিদেশিয়ানা আপন করে নিই না কেন, স্বচ্ছন্দ এখনও বসে খাওয়াতেই। বসে খাওয়ায় আলোচনা থাকে যা ভোজের রসনাতৃপ্তিকে আরও উন্নত করে তোলে। অনেক মানুষ থাকেন যারা দাঁড়িয়ে খেতে পছন্দ করেন না, তাদের জন্য বুফে পদ্ধতি একেবারে নৈব নৈব চ। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বসে খাওয়ানোতে চারদিক অপরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু যাঁরা এসব পরিষ্কার করে আমাদের একটা সুন্দর পরিবেশ প্রদান করেন, তাঁদের কাছে এটা একটা রোজগারের স্থান। অবশ্য যাঁরা জীবনে রসিকতা পছন্দ করেন তাঁরা বসার টেবিল ধরার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেন। তাই আমরা যতই এগিয়ে যাই না কেন, বাঙালি আজও বসে খাওয়াতেই হয়তো আটকে পড়েছে।
স্কুল ছাত্রী
বিপক্ষে
মনোজিৎ দাস
এখন বিয়েবাড়িতে বসে খাওয়ার চেয়ে বুফে খাওয়াই ভালো উপায়। যে যার পছন্দ মতো খাবার নিয়ে খেতে পারে, এতে খাবার অপচয় কম হয়। এছাড়া যে যার সময়মতো খাবার খেতে পারে। সময় নষ্ট বা কারও জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। বসে খাওয়াতে খাবার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, কখন পাত খালি হবে। এছাড়া পছন্দের মতো খাবার খেতে অপেক্ষা করতে হয়, কারণ পরিবেশনকারীকে পরপর খাবার পরিবেশন করতে হয়। অপচয়ও হয় অনেক। একবার বসলে হঠাৎ ওঠা যায় না, যতক্ষণ খাওয়া সমাপ্ত না হয়। যত দিন যাচ্ছে যে কোনো অনুষ্ঠানে বুফেই একমাত্র খাওয়ার ভালো উপায় হয়ে উঠছে।
ফ্রিলান্সার
আবির লাল বিশ্বাস
‘কোনো মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর সহজ পন্থা তার পেট দিয়েই’— এই চিরন্তন সত্য আজও অটুট। কোনো অনুষ্ঠানে ঢুকেই যদি চোখে পড়ে সাজানো বুফে টেবিল আর মকটেল কাউন্টার, মন যেন আগেই তৃপ্ত হয়ে যায়। বুফে সিস্টেমে অতিথিরা নিজের পছন্দমতো খাবার নেন। না আছে তাড়া, না কোনো বাধ্যবাধকতা। বিয়ে, পার্টি বা অফিস অনুষ্ঠানে এটি আজকের ট্রেন্ড। বৈচিত্র, স্বাধীনতা আর কম অপচয়ের এক নিখুঁত মেলবন্ধন। অনেক মানুষের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাও বটে।
শিক্ষক
রুদ্রনীল কুণ্ডু
বর্তমান যুগে বিয়েবাড়িতে বসে খাওয়ার প্রথাটি আমার কাছে অত্যন্ত সেকেলে মনে হয়। বুফে বা দাঁড়িয়ে খাওয়ার পদ্ধতি কেবল আধুনিকতা নয়, বরং এটি দক্ষতা এবং সেলফ সার্ভিসের এক অনন্য সংমিশ্রণ। যেখানে বসে খাওয়ার দীর্ঘ সারিতে অতিথিদের পদের পর পদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে বুফে দেয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। একজন অতিথি নিজের পছন্দ ও ডায়েট অনুযায়ী খাবার বেছে নিতে পারেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, এটি খাবারের অপচয় রোধে অত্যন্ত কার্যকর। কারণ এখানে কেউ জোরপূর্বক কারও থালায় খাবার তুলে
দেয় না।
ছাত্র
কুশল রায়
বিয়েবাড়িতে বুফেতে খাওয়াই ভালো। পঙ্ক্তি ভোজনে কিছু অসুবিধা থাকে। প্রথমত ব্যাচ ভরতি না হলে পরিবেশন শুরু হয় না। দ্বিতীয়ত, পাত ফাঁকা হয়ে গেলেও হাত শুকিয়ে পরের পদ আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়। আবার দিন হিসেবে নিরামিষ আমিষের আলাদা হয়ে বসার বিড়ম্বনা থাকে। জোর করে খাবার প্লেটে ঢেলে দিয়ে গেলে তা একপাশে সরিয়ে রাখার মতো দৃষ্টিকটূ কাজও করতে হয়। এসব ঝামেলা বুফেতে খেলে
থাকে না।
শিক্ষক