Bartaman Logo
১২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মম, ছোটোরা সিঁদুর পরে না

সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে মমতা শঙ্কর।

মম, ছোটোরা সিঁদুর পরে না
  • ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে মমতা শঙ্কর।

Advertisement

• ছোটোবেলা থেকে বাবা উদয় শঙ্কর আর মা অমলা শঙ্করের শাসন দু’রকম ছিল। দেখেছি, দাদার প্রতি মা একটু বেশি দুর্বল ছিলেন। আর আমি ছিলাম বাবার বেশি প্রিয়। ভালোবাসার দিক থেকে দু’জনেই ছিলেন সমান। মা কিংবা বাবা কেউই আমাদের দুই ভাই-বোনকে জোর করে কিছু করাননি। বাবা অনেকটা স্বশিক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন। মাকে বলতেন, ‘ওকে ওর মতো ছেড়ে দাও। ও দেখুক, চারপাশ। দেখতে দেখতেই সব শিখে যাবে।’ মা কিন্তু শুধু দেখে শেখায় বিশ্বাসী ছিলেন না। দেখে শেখার পাশাপাশি ছোটোখাটো বাড়ির কাজে, ট্রুপের কাজে হাত লাগাতেও বলতেন। আমি দেখতাম একদিকে নাচের অনুশীলন চলছে, ড্রেস, আলো সবকিছু তৈরি হয়েছে। আমার উপর আলাদা করে কোনো চাপ ছিল না। যেটা ইচ্ছে সেটাই করতে পারতাম। তবে এতকিছুর মধ্যেও মূল ডিসিপ্লিনের বাইরে যাওয়ার জো ছিল না। আমাদের বাড়িতে একজন দক্ষিণ ভারতীয় গৃহসহায়ক ছিলেন। তাঁকে যদি বলতাম, জল দাও! মা শুনলেই রেগে যেতেন। বলতেন, ‘নিজে ওঠো, একটা গ্লাসে জল নাও তারপর খেতে বোসো।’ কারও প্রতি অর্ডার করা একেবারে পছন্দ করতেন না। নিজের কাজ নিজেই করা পছন্দ করতেন। অর্ডার করা অবশ্য আমিও ছোটো থেকেই পছন্দ করি না। আমার আবার একটা মজার ব্যাপার ছিল। আমাকে রাগ করে বা অর্ডারের ভঙ্গিতে কেউ কিছু করতে বললে কিছুতেই সে কাজ আমাকে দিয়ে করানো যেত না। একটু আদর করে বললে আমি সঙ্গে সঙ্গে করে দিতাম। তাই ছোটোবেলা থেকেই আমরা দুই ভাইবোন অর্ডার করতে শিখিনি। এখনও পারি না। দাদা আমার চেয়ে ১২ বছরের বড়ো। ও তো ছোটো থেকেই হোস্টেলে বড়ো হয়েছে। আমিই বেশি ছিলাম মা-বাবার সঙ্গে। খাবার নষ্ট করাও মা-বাবা পছন্দ করতেন না। মা বলতেন, ‘যতটুকু খাবে, ততটুকুই পাতে নেওয়া অভ্যাস করো। আবার লাগলে আবার নাও। কিন্তু নষ্ট কোরো না।’ 
আর একটা জিনিস বাবা-মা খুব অপছন্দ করতেন, কোনো জায়গা থেকে বাড়ি ফিরে চটি-জুতো যেমন তেমন করে খোলা! ওঁরা বলতেন, চটি-জুতো কী অবস্থায় আছে দেখে বোঝা যায় বাড়ির রুচি ও শিক্ষা কেমন। এমন খুব ছোটো ছোটো জিনিস ছোটো থেকেই মা আমাদের শিক্ষা দিতেন। এছাড়া কাজের নেপথ্যে যে বুদ্ধির প্রয়োজন, সে শিক্ষাও মায়ের থেকে পেয়েছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কী সুন্দর অনেক কাজ সেরে ফেলতেন মা! এই যে এখন সিলিন্ডার নিয়ে এত সমস্যা, সেই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে, তখন তো উনুন, মাকে দেখেছি একটা কিছু উনুনে চাপিয়েছেন। রান্নাটা হচ্ছে, তার উপরেই আর একটা কানাউঁচু বাটি বসিয়ে জল গরম করে নিলেন।  রান্নার কাজে লাগবে। 
আমাদের বাড়িতে বরাবরই বাঙালি প্রথা, বাঙালি সংস্কৃতি মেনে চলা হত। বিজয়ার পর সকল আত্মীয়দের হাতে লিখে চিঠি দিতে মা খুব ভালোবাসতেন। আমাদেরও নিয়ম ছিল চিঠি লেখার। যখন খুব ছোটো, লিখতে পারি না, তখন আমাদের হাতে আলতা লাগিয়ে সেই ছাপ পোস্টকার্ডে তুলে পাঠাতেন মা। সঙ্গে লিখে দিতেন, ‘আমাদের প্রণাম নিও।’ আমাদের বাড়িতে পুজোআচ্চা নিয়ে বাড়াবাড়ি কিছু দেখিনি। তবে পুজোর জায়গা ছিল। অনেক সময় আমার উপর ভার পড়ত জায়গাটা পরিষ্কার করে রাখার। মা সব দায়িত্ব ছোটো থেকেই দিয়েছেন। মা বলতেন, ‘একজন শিশুকে বড়ো করা একটা চারাগাছকে বড়ো করার মতো। কখনো তাকে ছায়ায় রাখব, কখনো রোদে। আর চারপাশে বেড়া দিতে হবে, যাতে খারাপ কিছু তাকে ছুঁতে না পারে।’
মায়ের কথা বলতে বসলে নিজেরই কত দুষ্টুমির কথা যে মনে পড়ে যাচ্ছে! খুব ছোটোবেলা থেকেই আমি শাড়ি পরতে ভালোবাসতাম! একদম ঘরোয়া ভাবে মা-মাসিরা যেমন শাড়ি পরতেন, মা আমাকে ওরকমভাবে শাড়ি পরিয়ে দিতেন। আমিও সারা বাড়িতে শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াতাম। ছোটো থেকেই আমি খুব গিন্নিবান্নি। আমার তো সেই শিশুকাল থেকে স্বপ্ন ছিল, আমার খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হবে আর ছ’টা মেয়ে হবে। কেন ছ’টা তার কোনো জুতসই উত্তর নেই। এমনিই ছ’টা। আমার খুব ইচ্ছে ছিল যে ছ’টা মেয়ে হবে। আবার ঠিক করেছিলাম, সব মেয়েদের নাম শেষ হবে ‘শ্রী’ দিয়ে। যেমন, চিরশ্রী, রূপশ্রী, ঋতশ্রী..., বাবা তো খুব হাসতেন এসব শুনে। মা বলতেন, শেষে আর নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন নাম হবে বিশ্রী আর কুশ্রী! আর আমি কী রেগে যেতাম! 
আরও সব অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনা ছিল আমার। তখন আর কত বছর বয়স? বছর পাঁচেক। আমি তখন থেকেই সিঁদুর পরতে যে কী ভালোবাসি! তখন তো অত বুঝি না, ছেলেমানুষ। আমার কাজই ছিল রোজ স্নান সেরে এসে মাঝখানে সিঁথি কেটে সিঁদুর আর একটা টিপ পরে, পুতুল কোলে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। আবার যেমন তেমন করে পরতাম না, একেবারে মায়ের মতো করে চিরুণির ডগা দিয়ে! মা বলতেন, ‘মম, সিঁদুর ছোটোরা পরে না! এটা বড়োদের জিনিস।’ সে আর কে কার কথা শোনে! মা দেখলেন, আরে! এ তো কিছুতেই শুনছে না। রোজ সিঁদুর পরছে! তখন মা 
একটা ফন্দি আঁটলেন। আমাকে একদিন বলল, ‘জানিস তো মম, বিয়ের আগে যদি কেউ সিঁদুর 
পরে, তার আর বিয়ে হয় না!’ 
ব্যস, কখনো বিয়ে হয় না! ওরে বাবা! আমার শুনেই মাথায় বাজ। বিয়ে না হলে তো আমার জীবনে আর কিছুই হওয়ার নেই। সেদিন থেকেই ছোটোবেলায় সিঁদুর পরা বন্ধ করে দিলাম। এইভাবে মা আমার দুষ্টুমিগুলো ম্যানেজ করতেন। 
আর একটা কাণ্ড মনে পড়ে গেল। বলেই ফেলি বরং! আমার তো ছোটো থেকেই খুব বড়ো হওয়ার শখ। ছোটোবেলায় মা-বাবার বন্ধু বা আত্মীয়রা যদি কখনো আমাকে বলতেন, ‘যাও, এখানে বড়োদের কথা হচ্ছে!’ তখন আমার প্রচণ্ড অভিমান হতো। আমাকে আর ওখান থেকে কেউ নড়ানো যেত না। একবার কী হল, আমি তো প্রায় সাড়ে তিন-চার বছর বয়স থেকেই নাচ করছি। একদিন মা দেখছেন, নাচের সময় আমার আন্ডার আর্ম ভিজে। মা ভাবছেন, এইটুকু মেয়ের কী করে আন্ডারআর্ম ঘামে ভিজে যাবে? ব্যাপারটা কী! মা বেশ তক্কে তক্কে ছিলেন। দেখেন, আমি বড়োদের মতো হব বলে নাচের ফাঁকে বাথরুমে গিয়ে টুলে উঠে কল থেকে জল নিয়ে ব্লাউজ ভিজিয়ে আসছি। মা তো দেখেই আমাকে প্রায় মারতে যান। বাবাকে নালিশ করলেন। শুনে বাবার কী হাসি! 
ছোটো থেকে মায়ের কাছে শাসন যেমন পেয়েছি, তেমন পেয়েছি শিষ্টাচার, রুচিবোধের শিক্ষা। আমার মা ছিলেন সর্বগুণসম্পন্না আদর্শ নারী। ফ্যাশন ও সাজগোজের দিকে মায়ের ছিল কড়া নজর। আমার যাবতীয় সাজগোজ ও রুচিবোধ মায়ের থেকেই শেখা। মা সবসময় ফ্যাশনকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি। যা নিজেকে মানায় সেটা পরতে বলতেন। সাজের মধ্যে উগ্রতা বা অশালীনতা পছন্দ করতেন না। পোশাক কেমন পরব সব মা শিখিয়েছে। পরিবারের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, সব ভাই-বোন মিলে আলপনা দেওয়া, নাড়ু পাকানো এসবই আমরা দুই ভাই-বোন পরিবারের থেকে শিখেছি। মাকে দেখতাম সব বাঙালি আচার, অনুষ্ঠান বাড়িতে করতেন। 
আমাদের সব আত্মীয়ই কাছাকাছি থাকতেন। তাই বিকেলে হত জমায়েত। সে আড্ডায় ছোটো-বড়ো সকলে থাকত। ছোটোরা অনেক কিছু শিখত ওই আড্ডা থেকে। আমাদের দুই ভাই-বোনের বেড়ে ওঠা ও রুচি তৈরির নেপথ্যে পরিবার ও মায়ের হাতযশ সবচেয়ে বেশি।

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ