কলকাতায় বাঘ
  • ১ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়: ‘কলকাত্তা মে বাঘ হ্যায় ইয়া নেহি হ্যায়?’ 

Advertisement

হঠাৎ যদি লালমোহন গাঙ্গুলি প্রশ্নটা করে বসতেন, ফেলুদা ইনটেলিজেন্ট মানুষ, নিশ্চয় বলতেন, ‘আলিপুরে চিড়িয়াখানায় যান, পেয়ে পাবেন।’ তবে সময়টা যদি দুশো বছর আগে হত? তাহলে ফেলু মিত্তিরকে বলতে হত, ‘আজকের কাগজ দেখেননি। খুলে দেখুন লেখা আছে, দুই ইংরেজ শ্যামপুকুরের কাছে বাঘ শিকার করতে গিয়েছিল।’ সংলাপটি কাল্পনিক। তবে বাঘ শিকারের ঘটনাটি বাস্তবে ঘটেছিল। খবরের কাগজেও বেরিয়েছিল। এছাড়াও বইপত্র ঘাঁটলে কলকাতায় যে এককালে বাঘ ছিল, তার বিস্তর উল্লেখ খুঁজে পাওয়া যায়।
সুন্দরবনে প্রায়শই বাঘের হানার খবর মেলে আজকালকার খবরের কাগজে। এছাড়া কলকাতায় বাঘ ছিল, এটি ‘ফ্যাক্ট না মিথ’ তা নিয়েও বেশ আলোচনা, বিতর্ক রয়েছে। সেই কৌতূহলের খোঁজে কেউ যদি বইয়ের পাতা উল্টোন, কী পেতে পারেন?
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সংবাদপত্রে সেকালের কথা’ বইয়ে আছে, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৮৩৭ সালের খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ। ব্রজেন্দ্রনাথবাবু লিখছেন, ‘মৃগয়া কাৰ্য্যানুরক্ত শ্রীযুত বাবু দীননাথ দত্ত ও শ্রীযুত মকান সাহেব ও অন্যান্য কয়েকজন সাহেব কুকুর ও পিস্তল ও দুই চুঙ্গীর বন্দুক লইয়া সংপ্রতি শ্যামপুকুরের দিগে ব্যাঘ্র মৃগয়ার্থ গমন করিলেন...। বাবুর বড় সৌভাগ্য তিনি কিঞ্চিৎ দূরে গমন করিলে একটা অতিবৃহৎ চিতা বাঘ তাঁহার অতিনিকটে ঝাঁপটা মারিয়া চলিয়া গেল...। শহরের ঐ অঞ্চলে অত্যন্ত জঙ্গল হইয়াছে এই ক্ষণে কয়েক দিবসাবধি পোলীসের কয়েক জন ঐ বন কাটিতে নিযুক্ত হইয়াছে।’ 
এটি একটি প্রকাশিত খবর। আরও আছে...
যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ‘বাংলার ডাকাত’ নামে বিখ্যাত বইটিতে লিখে গিয়েছেন, ‘দক্ষিণ কলিকাতার একটি বিখ্যাত পথের নাম মনোহরপুকুর রোড। আজকাল সেখানে বড় বড় লোকের বাড়ি। সুপ্রশস্ত রাজপথ, শৌখিন পল্লী। প্রায় দুইশত বৎসর আগে এ অঞ্চল কেমন ছিল সে-কথা সকলের ধারণার অতীত। চারিদিকে ঘন বনজঙ্গল, খাল, বিল, জলা, হোগলা বন। এমন দুর্গম বনমধ্যে বাস করিত-একজন বিখ্যাত ডাকাত। তাহার নাম ছিল মনোহর বাগ্দী। মনোহরও ছিল দুর্দান্ত ডাকাত। পলাশীর যুদ্ধের শেষে দেশে চলিতেছিল অরাজকতা, অভাব, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি নানা অশান্তি। সেকালের কালীঘাটের কালী-দর্শনে আসিত দক্ষিণ হইতে বহু স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বালিকা। বনের মধ্য দিয়া ছিল সংকীর্ণ পথ-সে পথে আসিত যাত্রীর দল। এই নিবিড় বনে ছিল মনোহরের আস্তানাই বল, আর আড্ডাই বল, যাহা ইচ্ছা বলিতে পার। বাড়িতে দুইখানি ছিল মাটির দেওয়াল দেওয়া ঘর। ঘরে খড়ের ছাউনি। মনোহরের স্ত্রী ছিল না। এক বুড়ি পিসি তাহার রান্নাবান্না করিত। তাহার বাড়ির অল্প দূরে ছিল ছোট্ট একটি ভাঙ্গা মন্দির, পাষাণী কালীমূর্তি। মূর্তিটি আকারে ছোট হইলেও অতি ভীষণদর্শনা ছিল। ডাকাতেরা এই কালীমূর্তির নাম দিয়াছিল কঙ্কালমালিনী। নিত্য পূজা হইত কঙ্কালমালিনীর, নিত্য হইত ছাগবলি, মহিষবলি। কিন্তু পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় হইত নরবলি। এইভাবে বহু হতভাগা এই পথে যাইতে প্রাণ হারাইয়াছে।
এক সন্ধ্যায় কালীঘাটে কালীমাতার পূজা ও অর্চনা করিয়া তিনজন লোক সেইপথে ফিরিতেছিল, তাহাদের বাস রাজপুর গ্রামে। একটি বৃদ্ধ পুরুষ, তাহার সঙ্গে ছিল একজন স্ত্রীলোক এবং পাঁচ-ছয় বৎসরের একটি বালক, শিশু বলিলেই চলে। অন্ধকার হইয়াছে। নিবিড় বনে পথ হারাইয়া কিন্তু দূরে একটি আলো দেখিতে পাইয়া ঐ তিনজন যাত্রী সেদিক লক্ষ্য করিয়া লতাগুল্ম, কাঁটাবন উত্তীর্ণ হইয়া সেদিক পানে দ্রুত চলিয়া আসিতেছিল। পথে ছিল ছোট একটি খাল-আশেপাশে ডোবা-খালের গায়ে গভীর হোগলা-বন। সেই হোগলা-বনের আড়ালে থাকিয়া একটা বাঘ খালে জল খাইতেছিল। বৃদ্ধ আগে আগে খাল পার হইবার জন্য যেমন জলের কিনারায় আসিয়াছে, অমনি বাঘটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়িল পথিকের দিকে। নিমেষ-মধ্যে বাঘ ঝাঁপাইয়া পড়িল বৃদ্ধের উপর, তাহার ঘাড় কামড়াইয়া লইয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় বাঘের একটা থাবা পড়িয়াছিল স্ত্রীলোকটির গায়ে। জল রক্তে লাল হইয়া গেল। স্ত্রীলোক ও বালকটি পড়িয়া গেল খালের পাড়ে। কাদা ও জলের ভিতর তাহাদের দেহ হইল নিমজ্জিত। সে পথে ফিরিতেছিল মনোহর ও তাহার সঙ্গী ডাকাতেরা। একজন ডাকাত আগে আগে মশাল হাতে আসিতেছিল। অন্যদের হাতেও ছিল মশাল। সেই আলোকে তাহারা দেখিতে পাইল স্ত্রীলোকটি ও বালকটিকে। মশালধারী চিৎকার করিয়া কহিল সর্দার, হেথা একটা মাইয়া মানুষ আর ছাইলা মইরা পইড়া আছে। মনোহর উত্তর করিল-কে মারলে? বোধ হয় বড় শিয়াল হবে। বাঘকে তাহারা বলিত বড় শিয়াল। মনোহর আসিয়া দেখিয়া বলিল-নিয়ে চল, বোধ হয় বেঁচে আছে। সর্দারের হুকুমে ডাকাতেরা স্ত্রীলোকটি ও বালকটিকে মনোহরের বাড়িতে লইয়া আসিল। ডাকাতদের সেবা-শুশ্রুষা ও যত্ন-চেষ্টায় স্ত্রীলোকটি বাঁচিল না। মনোহর ছেলেটাকে লইয়া পড়িল মহা ফ্যাসাদে-কার ছেলে, বাড়ি কোথায়? কে সন্ধান করিবে? শেষটায় মনোহর বালকটিকে নিজের কাছে রেখে দেন।’
এছাড়া সত্যাশ্রয়ী ঘটনা অবলম্বনে প্রমথনাথ বিশীর লেখা ‘কেরি সাহেবের মুন্সি’ উপন্যাসেও বাঘের গল্প, ‘অনেক রাতে ঠেলা খেয়ে কেরী সাহেব জেগে উঠল, দেখল যে পত্নী পাশে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। কেরী শুধাল, ডরোথি, কি হয়েছে? ডরোথি নীরব, দেহ ভয়ে কম্পমান। হঠাৎ অসুখ-বিসুখ হয়েছে আশঙ্কায় কেরী উঠে দাঁড়িয়ে পত্নীকে চৌকির উপরে বসাল, জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে বল তো? কি হয়েছে! শুনতে পাচ্ছ না?-এতক্ষণে ডরোথির বাকস্ফূর্তি হল। কি শুনব? ঐ যে বাইরে গর্জন, কি যে ডাকছে! এবারে কেরী সত্যই শুনতে পেল, বাইরে কোন একটা জন্তুর গর্জন। ভীত ডরোথি ফিস ফিস স্বরে শুধাল, ওটা কি ডাকে? কেরী বলল, বাঘের ডাক তো স্বকর্ণে কখনও শুনি নি, তবু যতদূর বুঝতে পারছি বাঘের ডাক বলেই মনে হচ্ছে, জঙ্গুলে দেশ কিনা। ওটা কি সত্যিকার বাঘ? শুধাল মৃতপ্রায় পত্নী। কেরী হেসে বলল, ডিয়ার, সত্যি বাঘ ছাড়া এত রাতে আর কি ডাকবে! যদি আক্রমণ কবে? সামনে পেলে আক্রমণ করে বইকি কি সর্বনাশ! তাতে আবার জানালাগুলো সব খোলা! এই বলে ডরোথি গরাদহীন বড় বড় খোলা জানালাগুলোর দিকে তাকাল। বাঘ লোকালয়ে কখনও আসে না  কেমন করে জানলে? তুমি কি বাঘ দেখেছ কখনও? তবে? আমি বই-এ পড়েছি যে, বাঘ পশুর মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র। তার হাতে পড়লে আর নিস্তার নেই। কিন্তু তার হাতে পড়বে কেন? পড়তে বাধাই বা কি? যেখানে ঘরের পাশে বন, বনের মধ্যে বাঘ! বন তো ঘরের পাশে নয়। অবশ্যই পাশে। কেটি বলছিল যে, পাশেই প্রকাণ্ড বন, তুমি মিছে ভয় পাচ্ছ, তেমন বাঘের ভয় হলে এখানে মানুষ থাকতে পারত না।’ 
সমাচার দর্পণ। ১৮১৯ সাল। প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, সে বছর সুন্দরবন থেকে বেরিয়ে একটা বাঘ এসে উপস্থিত হয়ছিল গৌরীপুর গ্রামে। গৌরীপুরের অবস্থান ছিল এখনকার দমদমের পাশে। বাঘটা শুড়িটোলা, বাগমারী এবং বেলগাছী এই তিনটে গ্রামে আনাগোনা করে শেষে গৌরীপুরে এসে হাজির হয় এবং এক মহিলাকে হত্যা করে। 
সংবাদ প্রভাকর। ১৮৪৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত খবর, দক্ষিণ কলকাতার জনবসতি এলাকায় বাঘের উপদ্রব এতটাই বেড়েছিল যে, মানুষ সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় পেত। ১৭৮৪ সালের একটি প্রশাসনিক রিপোর্টে উল্লেখ, কলকাতার দক্ষিণ অংশে জঙ্গল কাটার সময় বাঘের কবলে পড়ে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছিল। এছাড়াও শোনা যায়, সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল এলাকায় একটি বাঘ শিকার করেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। ১৭৫৮ সালের দিকে গোবিন্দপুর (ফোর্ট উইলিয়াম ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এলাকা) ও তার পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ দিকের এলাকাগুলি ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা।
কলকাতার নিকটবর্তী এলাকা সিমুলিয়া। ১৮৪৯ সাল। ১৯ এপ্রিল। সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় বাঘের আক্রমণের খবর প্রকাশ হল। ১৩ এপ্রিল বাঘ একটি সাত মাসের মেয়েকে মুখে নিয়ে পালাচ্ছিল। তা দেখতে পেয়ে পাড়ার লোক চেঁচামেচি শুরু করে। ভয় পেয়ে শিকার ফেলেই পালায় বাঘটি। তার পরেরদিন আবার হানা দেয় প্রাণীটি। দেড় বছরের এক শিশুকে তুলে নিয়ে যায়। এরপরও ইংরেজ প্রশাসন বাঘ ধরার কোনোরকম চেষ্টা করেনি। তারপর পত্রিকায় লেখা হয়, ‘এইক্ষণে পুলিসাধ্যক্ষ মহাশয় পল্লীস্থ লোকেরা কথিত ভয়ানক জন্তুর নিপাত বিহিত মনোযোগ করুন।’ কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে বাঘের উপদ্রবের ঘটনা নতুন নয়।
এ তো হল কলকাতায় বাঘের আতঙ্কের সব গল্প। এছাড়াও বাঘ নিয়ে চমকে দেওয়া কিছু ঘটনাও ঘটত তৎকালীন হাফ গ্রাম হাফ শহর কলকাতায়। সেই প্রতিবেদন কিছুকাল আগে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রে। ঘটনাটি ২২২ বছর আগের। নভেম্বর মাসের ১৪ তারিখ। দ্য বেঙ্গল গেজেট পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন ঘিরে তোলপাড় শহর কলকাতা। তাতে লেখা, ‘২৩০ নং লালবাজারে মিঃ স্মিথের দোকানে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা সুন্দরবনের বৃহৎ বাঘ বিক্রয় করা হইবে। চারিমাস বয়সের দুইটি বাঘের ছানা ও একটি চিতাবাঘও বিক্রয় করা হইবে।’ বাঘগুলিকে দেখার জন্য আট আনা দাম পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছিল। সে বাঘ কেউ কিনেছিল কি না, তা জানা যায় না। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন তৎকালীন বঙ্গসমাজে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। বহু ইতিহাসবেত্তার কলমে তার উল্লেখও আছে। অনেকে বলেন, বাঘ বিক্রির বিজ্ঞাপন শহরে অবশ্য সেই প্রথম নয়। এর আগেও ওই খবরের কাগজে একটি বাঘ বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল।
কলকাতার ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন হরিপদ ভৌমিক। তিনি বলেছিলেন, ‘১৭ নভেম্বর ১৭৮৫ সালে আরও একটি বাঘের বিজ্ঞাপনের তথ্য পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছিল, একটি সুন্দরবনের বাঘ ও বাঘিনী বিক্রয়নার্থে প্রস্তুত আছে। স্বভাবে উগ্র প্রকৃতির নহে, অনেকটা পোষ মানা। ইউরোপে জাহাজে করে পাঠাইবার উপযুক্ত। ১৮০০ সিকা টাকার কমে বিক্রয় করা হইবে না।’ সেই বাঘও লালবাজারেই বিক্রি হয়েছিল বলে জানা যায়।
এ সবই আজ ইতিহাসের পাতায় ঢুকে গিয়েছে। লালবাজারের ২৩০ নম্বর ঠিকানারও আজ হদিশ মেলে না। তবে ২০০ বছর আগে লালবাজার স্ট্রিটকে সুলভে বাঘের প্রাপ্তিস্থান হিসাবে যে অনেকে চিনত, তা স্পষ্ট। দীর্ঘ দু’শতক ধরে এরকম কত ইতিহাস ও বিস্মৃতি সঙ্গী করে যে এ শহরের তিলোত্তমা হয়ে ওঠা, ভাবলে বিস্ময় জাগে।  
হরিপদ ভৌমিক তাঁর কলির শহর কলকাতা বইতে বাঘের আগমন প্রসঙ্গে লেখেন, ‘এটা তো আর চিড়িয়াখানা বা সার্কাসের বাঘ নয়, সুতরাং কি করে বাঘ কলকাতায় এল, এ নিয়ে তখন সকলেই চিন্তিত। সে সময় গঙ্গাসাগরের বন কেটে ইংরেজরা সেখানে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছিল। ১৮১৯ খ্রীস্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বরের সমাচার দর্পণে দেখা যায়, গঙ্গাসাগর উপদ্বীপের বন কাটিয়া সে স্থান সুন্দর প্রস্তুত হইতেছে। ফলে সুন্দরবনের বাঘ কলকাতায় আসতে পারে বলে সে সময় অনেকেই অনুমান করেন। সবার সঙ্গে সমাচার দর্পণেরও অনুমান হয় যে, সে ব্যাঘ্র গঙ্গাসাগর হইতে আসিয়াছিল। যদি গঙ্গাসাগরের বন কাটাইয়া ব্যাঘ্র দূর করিয়া সেখানে মানুষের বসতি হয় এবং সেই ব্যাঘ্র এ দেশে আসিয়া মনুষ্যদিগকে দূর করিয়া বসতি করে তবে কেবল বাঘ ও মনুষ্যদের স্থান পরীবর্তন হয় মাত্র।’ হরিপদবাবু তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে সুন্দরবনের জঙ্গল বুজিয়ে তার উপর রাতারাতি গড়ে উঠেছিল শহর কলকাতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি শিয়ালদহে পুকুর খোঁড়ার সময় মাটির তলা থেকে প্রচুর সুন্দরী গাছের গুঁড়ি উদ্ধার করা হয়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এ অঞ্চলে একসময় স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল সুন্দরবন। 
আড়াইশো বছর আগের ছেঁড়া কোনো মানচিত্র যদি হাতে আসে, তা দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাবে, আজকের যাদবপুর, গড়িয়া ও টালিগঞ্জ ছিল সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলের অংশ। ১৮৪৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দক্ষিণ কলকাতার জনবসতি এলাকায় বাঘের উপদ্রব এতটাই বেড়েছিল যে মানুষ সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় পেত। সে সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত। ১৭৫৬-’৫৮ সালের ম্যাপ অনুযায়ী, আজকের যাদবপুর, গড়িয়া ও টালিগঞ্জ ছিল সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলের অংশ। ফলে সে সময় বাঘের হানায় শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত খবর হিসাবে উঠে আসত। ১৭৮৪ সালের একটি রেকর্ড অনুযায়ী, কলকাতার দক্ষিণ অংশে জঙ্গল কাটার সময় বাঘের কবলে পড়ে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। তৎকালীন প্রশাসনিক রিপোর্টেও এর উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ধীরে বনাঞ্চল ধ্বংস করে নগরায়ণ ঘটিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশরা। তখন জঙ্গলের যারা আসল অধিবাসী সেই বাঘ মানুষের অনুপ্রবেশে নিরন্তর বাধা দিয়ে গিয়েছে। তাদের হানায় অংসখ্য মানুষের মৃত্যু। তবে মৃতদের কেউই ব্রিটিশ নয়। বেশিরভাগই শ্রমজীবী দেশের মানুষ। এরপর বাঘ তাড়িয়ে আর মানুষের প্রাণের বিনিময়ে কেনা জমিতে বাড়ি তৈরি করে ব্রিটিশরা নিশ্চিন্তে বসবাস শুরু করে নবনির্মিত ইমারতে। আর ভিটে ছাড়া হতে থাকে বাঘ। ইংরেজদের আরাম আয়েসের সুযোগ করে দিতে নির্বিচারে চলে জঙ্গল কাটা। তা করতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয় হাজার হাজার দেশীয় শ্রমজীবী মানুষকে। আর তার পাশাপাশি নিজের বন ছে঩ড়ে পালাতে হয় বাঘকেও। নয়তো প্রাণ দিতে হয় গুলিতে। কলকাতার বাঘ প্রসঙ্গ উঠলে এ বাস্তব ঘটনাগুলি এড়িয়ে যাওয়া যায় না, বারবার মনে পড়ে, বারবার ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মন, বারবার মন ভারাক্রান্ত হয় দেশের শ্রমজীবী মানুষদের দুর্দশার কথা ভেবে।
কলির শহর কলকাতায় লেখা, ‘সভ্য লোকালয়ের বাসিন্দাদের মনে ত্রাস জাগিয়ে মাঝে মধ্যেই গহিন বনের জীবদের আনাগোনা ঘটতে লাগল কলকাতার রাজপথে। বন ক্রমে ছোট হয়ে আসে। আর জনারণ্যে ঢুকে পড়ার জন্য আমরা বাঘকে শাপশাপান্ত করি। কে কার ভিটে খেল, একবার ভেবে দেখবেন!’