সঞ্জীবকুমার দে: রণেনঠাকুর বললেন, ‘ওই গাছে যে ভূত আছে এটা তোমরা জানলে কী করে?’
যারা গিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন আমতা আমতা করে বলল, ‘আজ্ঞে গগন চক্কোত্তি বলেছে।’
‘তিনি আবার কে?’
‘আমাদের গাঁয়ের একমাত্র পুরোহিত। খুব সাত্ত্বিক মানুষ।’
‘সে ঠিক আছে, কিন্তু তিনি কী দেখেছেন, নিশ্চিত হয়ে বলতে হবে। অযথা নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। আমি গেলাম, গিয়ে দেখলাম কিচ্ছু নেই! তাড়াব কাকে? তখন সময়ও নষ্ট, পয়সাও নষ্ট। এমন বহু জায়গায় ঘটেছে।’
লোকগুলো যে উৎসাহ নিয়ে গিয়েছিল, এক ফুৎকারে সব নিভে গেল। তবে আশাহত হলেও সকলে বুঝল তারা কোনো বুজরুকের কাছে আসেননি। তা যদি হত, লোকটি এককথায় যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে যেতেন। ইনি সত্যিই উঁচুদরের মানুষ। পারলে ইনিই পারবেন খেয়াতলার ভূত তাড়াতে। পাঁচটা গাঁয়ের লোক খামোকাই তাঁর গুণগান করে না।
দমে গেলেও জায়গা ছেড়ে নড়ল না কেউ। হাত কচলাতে লাগল।
এদের মুখে আর কথা নেই দেখে এবার নীরবতা ভাঙলেন রণেনঠাকুর নিজে— ‘তোমাদের গগন চক্কোত্তিকে সঙ্গে আনা উচিত ছিল।’
আবার নীরবতা।
একটু চুপ থেকে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কি কিছু দেখেছ?’
‘না আজ্ঞে। তবে অনুভব করেছি,’ বলল একজন।
‘কী রকম?’
‘ওই গাছটির কাছে গেলেই কেমন যেন গা ছমছম করে! পা দুটো ভারী হয়ে যায়! বাতাস ছাড়াই গাছের পাতাগুলো নড়াচাড়া করে ওঠে!’
‘হুম।’ শব্দটা করেই একেবারে চুপ করে গেলেন রণেনঠাকুর।
....
তা যাইহোক, রণেনঠাকুর একদিন এসে পা রাখলেন বদনপুর গাঁয়ে। কে কী ভাবে তাঁর আপ্যায়ন করবে সে নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। সে সব অগ্রাহ্য করে তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর খোঁজ করলেন। লোক ছুটল গগন চক্রবর্তীর বাড়ি। ফিরে জানাল, তিনি বাড়ি নেই। গেছেন খেয়া পেরিয়ে সদরে। কোনো যজমানের বাড়ি। কারও শ্রাদ্ধের কাজে।
রণেনঠাকুর বললেন, ‘তাঁর বয়ান পেলে ভালো হত। কিন্তু আমার হাতে নষ্ট করার মতো সময় নেই। আমাকে গাছটা দেখিয়ে দাও।’
উৎসাহে লোকজন চলল তাঁকে সঙ্গে নিয়ে।
গাঁয়ের প্রায় শেষ প্রান্তেই সেই গাছ। একটু দূরেই নদী। গাছের কিছুটা দূর দিয়ে পথ চলে গেছে নদীর খেয়াঘাটের দিকে। অর্থাৎ পথটা ওপারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দূর থেকে গাছটা দেখে নিয়ে সকলকে বিদায় নিতে বললেন রণেনঠাকুর। বললেন, ‘তোমাদের কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। তবে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ তার হবে কি না, হলেও কী ঘটবে, কিছুই জানি না। তাই কারও উঁকিঝুঁকি না মারাই ভালো। যে যার কাজে চলে যাও। আমাকে আমার মতো কাজ করতে দাও। আমি তোমাদের ফলাফল সব জানিয়ে তবেই ফিরব।’
তাই হল। সকলে বিদায় নিতে পায়ে পায়ে গাছতলায় এসে দাঁড়ালেন রণেনঠাকুর। গাছটাকে যে সকলে এড়িয়ে চলে তা বোঝা গেল বিঘতপুরু স্তূপাকার ঝরে পড়া শুকনো পাতা আর ছড়ানো ছিটানো ভেঙে পড়া শুকনো ডালপালায়।
কাঁধের উড়নিটা দিয়ে ঝেড়ে সে সবের মধ্যে একটু জায়গা করে নিয়ে বসলেন তিনি। মধ্যাহ্নকাল। তপ্ত চারদিক। তার মধ্যে ঘন সবুজ পাতায় ছাওয়া গাছটার নীচে বসে, নদীর দিক থেকে বয়ে আসা মনোরম বাতাসে শরীর এলিয়ে দিলেন তিনি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ লেগে এল তাঁর।
কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানা নেই। হঠাৎ কেমন একটা অনুভূতিতে হুঁশ ফিরল রণেনঠাকুরের। চোখ খুলতেই দেখলেন পায়ের কাছে দু’হাত জোড় করে বসে কেউ একজন। ধড়ফড় করে উঠে বসে জানতে চাইলেন, ‘এ কী! আমার পায়ের কাছে এমন করে বসে কেন?’
‘কী করব তবে বলেন? আপনি গুণীজন, সম্মাননীয়। আপনি নীচে শুয়ে, আমি আপনার মাথার উপর থাকি কী করে?’
গাছের উপরদিকে একবার চাইলেন রণেনঠাকুর। তারপর বললেন, ‘এই গাছে বাস?’
‘আজ্ঞে।’
‘কে তুমি? নাম কী?’
‘সে সব আর মনে নাই। সব পূর্বাশ্রমের কথা। তবে কেউ তো বটে!’
একটু থমকালেন রণেনঠাকুর। না, এ তো এলেবেলে কেউ নয়! খুব সাবধানে এগতে হবে। বললেন, ‘তা ঠিক। তবে ভূত তো?’
‘আজ্ঞে, তাই তো দাঁড়ায়!’
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। নীরবতা ভাঙল শেষে ভূত মহাশয়, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি ভিনগাঁয়ের লোক। এখানে সকলে এই স্থানটা এড়ায়ে চলে। পশুপাখি, সাপখোপ সবাই। তা আপনি এখানে কী মনে করে?’
‘তোমাকে তাড়াবার জন্য আমাকে এখানে ডাকা হয়েছে ভাই।’
‘বলেন কী!’ বিস্ময় বৃক্ষবাসী ভূতের গলায়, ‘আমি কার কী ক্ষেতি করেছি? কাউরে ভয় দেখাইনি কোনোদিন। ঢেলা মারিনি। কারও খাবারদাবার কেড়ে খাইনি। আমারে তাও তাড়াতি চান?’
রণেনঠাকুর চুপ করে থাকেন। ভূতও বেদনার্ত।
মায়া হল রণেনঠাকুরের। বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম— তুমি খুবই নিরীহ ভূত। দুনিয়ায় এই নিরীহদেরই বড়ো জ্বালা।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল লোকটা, ‘জানেন, আমি যে এখানে আছি কাউরে দেখাও দিইনি কক্ষনো! এই আপনারে দেখে আজ এখানে প্রথম প্রকট হলাম।’
‘না, একথা তো ঠিক নয়! গগন চক্কোতি নাকি তোমাকে চাক্ষুষ দেখেছে!’
‘সেটা হতি পারে না। আমি স্বেচ্ছায় দেখা দিইনি কারওরে। কথাটা বিশ্বেস করবেন না গুরুজি। লোকটা খুব ধড়িবাজ। লোক ঠকায়।’
‘না, না, লোকটা পুরোহিত। পুজোআচ্চা নিয়ে থাকে।’
‘আরে, প্রচুর ভুলভাল মন্ত্র পড়ে। জানে না কিচ্ছু! ওর ওইসব ভুল মন্ত্র পড়ার জন্যই কত মৃতমানুষ মুক্তি পাওয়ার বদলে ভূত হয়ি গেছে জানেন আপনি? এই তো আজও গেছে নদী পেরায়ে একজনার শ্রাদ্ধের কাজ করতে। দেখেন না আরও এক সজ্জন ভূত হল বলি!’
‘বল কী!’
‘হ আজ্ঞে!’
‘সাংঘাতিক!’ রণেনঠাকুর আঁতকে ওঠেন, ‘তোমারও কি একারণেই ভূতদশা?’
‘না না গুরুজি, অন্য কারণ। অপমৃত্যু।’
‘আহা। কীভাবে?’
‘ভয়ংকর বন্যায়। সাঁতার জানি নে। চালার উপর আশ্রয়ে ছিলাম। চোখে ঘুমের ঢুলুনি। হঠাৎ পিছলে পড়ে ডুবে মরি গেলাম।’
‘তারপর?’
‘ভাসতে ভাসতে আসি এই নদীপারে আটকে ছিলাম। জল নামতি, এখানে কারা যেন সৎকার করিছিল এই গাছের কাছেপিঠেই। কেতজ্ঞতায় সেই থেকে রয়ে গেছি এখানে।’
‘কবেকার কথা?’
‘সে বহু আগে।’
রণেনঠাকুর চুপ করে থাকেন।
‘তবে আপনার কাছে আজ যা শুনলাম গুরুজি, তাতে আর এখানে থাকা চলে না। কিন্তু যাই কোথায়? ভূতেদের থাকার মতো নিরাপদ আর একটা স্থান পাই কোনখানে? তাছাড়া আমি এই ঠাঁই ছাড়লেই এই গাছটা ওরা কেটে ফেলবে।’
‘বল কী?’
‘আজ্ঞে, মতলববাজ লোকজনেরা তো জমি কেনে ইমারত তোলার জন্য। গাছ কাটা মানা। একবার ভূত আছে রটায়ে দিলে তো লোকজনেরা আর কেউ নালিশ দিবে না। ওইরকম কোনো লোকই গগন চক্কোত্তির মুখ দিয়ে তাই এটা বলাতেছে।’
‘হ্যাঁ এটা সম্ভব।’ রণেনঠাকুর ভেবে বললেন, ‘তবে গগন চক্কোত্তি তোমাকে দেখেনি বলছ? আন্দাজে কথা ছেড়েছে?’
‘মনে হয়।’
‘তবে তো লোকটাকে শায়েস্তা করতেই হয়! বেশ, আমি ব্যবস্থা করছি।’ রণেনঠাকুর হাঁটা দিলেন।
কিছুক্ষণ নদীর ধারে, এদিক সেদিক সময় কাটিয়ে ঠিক সন্ধ্যার সময় তিনি গাঁয়ে প্রবেশ করলেন। কৌতূহলী লোকজন ভিড় করে ঘিরে ধরল। মাতব্বর একজনের বাড়িতে তাঁর খাওয়ার ব্যবস্থা। খেতে বসে শুনলেন গগন চক্কোত্তি ফিরেছেন। বললেন, তবে তাঁর বাড়িতেই যাওয়া হোক। সেখানে গিয়ে তিনি ব্যাপারটার সুরাহা করবেন।
ভিড় করে এসেছে গাঁয়ের লোকজন। গগন চক্কোত্তির দাওয়ায় বসে বাড়িটা ভালো করে লক্ষ করলেন রণেনঠাকুর। দাওয়ায় দেখলেন একটা ছোটো খাটের খোলা নানা অংশ, বিছানা, ছাতা, খড়ম, গামছা, কাপড়, আরও পিতল-কাঁসার বাসনপত্র ইত্যাদি। বুঝলেন সবই পারলৌকিক ক্রিয়ার নানা বস্তু। তবে কিছুই নতুন নয়।
অর্থাৎ শুধু পুজোআচ্চা নয়, ভাড়া দিয়ে এসবের জন্য বাড়তি পয়সাও আদায় করেন চক্কোত্তি। ব্যবসা ভালোই।
ভণিতা না করে সোজাসুজি কথা শুরু করলেন রণেনঠাকুর— ‘ওই গাছে যে আছে, সে নামতে রাজি, কিন্তু বিনিময়ে একটা গাছ চাইছে। তা এই গাঁয়ে তোমরা কার বাড়িতে ঠাঁই দিতে চাও জানাও। ব্যবস্থা করি।’
সবাই নীরব। ‘চুপ থাকলে হবে না। জলদি বল। আমি ব্যবস্থা করে যাই। আমার হাতে সময় বড়ো কম।’
তাও রা ফোটে না কারও মুখে। অধৈর্য হয়ে বললেন শেষে— ‘তার অবশ্য পছন্দ চক্কোত্তিবাড়ির তেঁতুলগাছটা। তা চক্কোত্তি, কোথায় তোমার তেঁতুলগাছ?’
সকলে হইহই করে আঙুল নির্দেশ করে দেখিয়ে দিল— ‘ওই তো!’
‘তা তুমি কি এটা দিতে অনুমতি দিচ্ছ চক্কোত্তিমশাই?’
চক্কোত্তি ডুকরে উঠলেন, ‘না না না, ওরে বাবা! বিপদে পড়ে যাব!’
‘বিপদে তো তুমি পড়েই আছ হে চক্কোত্তি! এক একটা শ্রাদ্ধের কাজ করে আসছ আর সঙ্গে করে এক একটা ভূত বাড়িয়েই চলেছ। সেই ভূতের মুখেই শুনলুম, তোমার ভুলভাল মন্ত্রের জন্যই নাকি এই অবস্থা। সেইসব ভূতেরা নাকি জোট বাঁধছে। একদিন ওইসব ভাড়া দেওয়া জিনিসপত্র সহ তোমার ডিঙি নাকি ওরা নদীতে উলটে ছাড়বে!’
চক্কোতি কেঁপে, ঘেমে হেঁচকি তুলতে লাগল।
গাঁয়ের মাতব্বররা তক্ষুনি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাল— ওই ভূত তো কারও ক্ষতি করে না। আছে থাক। লাভ কী খামোকা তাঁকে খুঁচিয়ে! সুতরাং ফিরে গেলেন রণেনঠাকুর। আর পরামর্শ দিয়ে গেলেন, ‘ঠিকঠাক মন্ত্র রপ্ত করে তারপরে যেও শ্রাদ্ধের কাজে, নইলে মরবে। বুঝলে।’
....
দিন পাঁচেক পর সেই ভূত গিয়ে হাজির রণেনঠাকুরের কাছে। ঠাকুর বিস্মিত— ‘আরে তুমি?’
‘পেন্নাম দিতে এলাম ঠাকুর। আপনার জন্য গাছটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেল। আর আমিও চক্কোতিবাড়ির তেঁতুলগাছে ঠাঁই পেলাম গো। তবে গগন চক্কোতিকে আমার গাছটা ছেড়ে দিতে হল। তিনি গত পরশু গত হয়েছেন। যদিও সদ্য, তবুও আমার মতো, কেউ তো বটে।’
অঙ্কন: সুব্রত মাজী



