Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

তিন সন্নাসিনী মঠ

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে নারী এক বিতর্কিত বিষয়। কথামৃত পাঠ করে যে ‘কামিনী-কাঞ্চনের’ প্রতি নিষেধবাক্য আমাদের মনে ধ্বনিত হতে থাকে, তাতে সাধারণভাবে মনে হয় ঠাকুর কি নারী বিদ্বেষী ছিলেন?

তিন সন্নাসিনী মঠ
  • ১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০

পূর্বা সেনগুপ্ত: শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে নারী এক বিতর্কিত বিষয়। কথামৃত পাঠ করে যে ‘কামিনী-কাঞ্চনের’ প্রতি নিষেধবাক্য আমাদের মনে ধ্বনিত হতে থাকে, তাতে সাধারণভাবে মনে হয় ঠাকুর কি নারী বিদ্বেষী ছিলেন? না, তিনি তা ছিলেন না। স্বামী বিবেকানন্দ বারংবার বলেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল নারী ও সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য। তাই তিনি নারী গুরু গ্রহণ করেছিলেন, নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী পূজা করে নারী জাতিকে চরম মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। দক্ষিণেশ্বরে সন্ন্যাসিনী শিষ্যা গৌরী মাকে বলেছিলেন, হিমালয় নয়, এই লোকালয়ের মধ্যে নারীকে সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধিকারে সমৃদ্ধ করে সন্ন্যাসিনী মঠ গড়তে হবে। রামকৃষ্ণ ভাবধারায় প্রথম নারী মঠ ‘শ্রীশ্রীসারদেশ্বরী আশ্রম’ গঠন করেছিলেন সেই গৌরীপুরী দেবীই। আর পরবর্তীতে ভগিনী নিবেদিতা প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ক্রমে গড়ে উঠেছিল বর্তমানের ‘শ্রীশ্রীসারদা মঠ’।

Advertisement

যদিও আজ আমরা এক নতুন অধ্যায়ের কথা আলোচনা করব। সারদেশ্বরী আশ্রম ও সারদা মঠ দক্ষিণেশ্বর ছাড়াও আরও তিনটি নারী মঠ গঠিত হয়েছিল। তবে বাংলায় নয়, দক্ষিণ ভারতে। ফলে সেগুলি আমাদের কাছে ততটা পরিচিত নয়। যে তিন ব্যক্তিত্ব এই উদ্যোগের নেপথ্যে, তাঁরা জন্মসূত্রে বাঙালি। কিন্তু নিজেদের সন্ন্যাস জীবনের অনেকটা অধ্যায় অতিবাহিত করেছিলেন দক্ষিণ ভারতে। এই তিন ব্যক্তিত্ব হলেন—স্বামী নির্মলানন্দ, স্বামী শর্বানন্দ ও স্বামী পরমানন্দ। দক্ষিণ ভারতে রামকৃষ্ণ ভাবধারার প্রচার এবং স্বামী বিবেকানন্দের নারী জাগরণের ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার কাজে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তাঁরা। আবার আশ্চর্যজনকভাবে এই তিনজনই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মূল ধারা থেকে। সেই কারণে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত নারী মঠগুলি রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের ধারকরূপে বিকশিত হতে পারেনি। বরং সমান্তরালভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। তবে প্রচার পেয়েছে সামান্যই।
সময়টা ছিল রামকৃষ্ণ ভাবধারা প্রচারের প্রারম্ভিক ক্ষণ! গোটা দক্ষিণ ভারত তখন স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতায় উদ্দীপ্ত, জাগরিত। শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবনাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে ছোটো ছোটো গোষ্ঠী গঠিত হয়েছে সেখানে। তারা চায় বেলুড় মঠের সঙ্গে সংযুক্ত হতে। স্বামী বিবেকানন্দ তাই গুরুভাই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে পাঠালেন মাদ্রাজে। সেখানেই শুরু হল দক্ষিণ ভারতের রামকৃষ্ণ আন্দোলনের সূচনা। স্বামী শর্বানন্দ বারাণসী অদ্বৈত আশ্রমে স্বামী বিবেকানন্দকে দর্শন করেছিলেন। দু’জনের সাক্ষাত্‌ ছিল একটি নাটকের মতো। বড়ো বড়ো চোখ, যেন তা থেকে আগুন ঝরছে! সমস্ত দেহ অসাধারণ দৈব লক্ষণ। সেই পদ্মলোচন বিবেকানন্দই তেজেন্দ্রনারায়ণ অর্থাত্‌ স্বামী শর্বানন্দকে দেখে বললেন, ‘বে করেছিস?’ জবাবে ‘না’ শুনে বলেছিলেন, ‘আর করিস নি! তোদের মতো  যুবকদের মাধ্যমে এই পৃথিবীকে বদলে দিতে হবে।’
দক্ষিণ ভারতে রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলন প্রচারে মহীশূরে কেন্দ্র স্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চেন্নাই (তৎকালীন মাদ্রাজ), বেঙ্গালুরু (ব্যাঙ্গালোর) আর মাইসুরু (মহীশূর)—এই তিনটি কেন্দ্র ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠেছিল। বেঙ্গালুরুতে রামকৃষ্ণ আশ্রম গড়ে ওঠার নেপথ্যে ছিলেন শ্রীমা সারদাদেবীর মন্ত্রশিষ্য নারায়ন আয়েঙ্গার। পরবর্তীকালে তিনি পরিচিত হন স্বামী শ্রীবাসানন্দ নামে। দক্ষিণ ভারতে রামকৃষ্ণভাব প্রচারে তিনি আন্তরিকভাবে ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাকে গুরুত্ব সহকারে রূপায়িত করেছিলেন স্বামী শর্বানন্দ। বেঙ্গালুরুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রেসিডেন্ট তখন স্বামী নির্মলানন্দ। মাইসুরুর আশ্রম প্রতিষ্ঠার উত্সবে তাঁকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন স্বামী শ্রীবাসানন্দজি। উত্তরে স্বামী নির্মলানন্দ চিঠিতে লেখেন, ‘আমি বৃদ্ধ হয়েছি, উপরন্তু অর্থশূন্য এক কেন্দ্র পরিচালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আপনারা আনন্দ করুন। আমি সেই উত্‌সবে যোগদানে অক্ষম।’ কেন একথা উল্লেখ করলাম, তা পরে জানব। আগে একটু ঘটনাটি বিস্তারে বলি।
১৯২৫ সালের ১১ই জুন মাইসুরুতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন স্বামী শর্বানন্দ। তিনি স্বামী ব্রহ্মানন্দের মন্ত্রশিষ্য হলেও, শ্রীমা এবং স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গ করেছিলেন। স্বামীজির নারী জাগরণের বার্তা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। স্বামীজি বিদেশে থাকাকালীন চিঠিতে বারংবার বলছেন, ‘আগে মা (শ্রীমা সারদা দেবী), তারপরে বাবা। মায়ের মঠ বানিয়ে তিনি স্বস্তি বোধ করবেন।’ কিন্তু দেশে ফিরে সেকাজে কিছু অসুবিধে দেখা দিল। বিশেষ করে স্বামী যোগানন্দ জানালেন, শ্রীমায়ের দেহ থাকতে যদি মায়ের নামে মঠ গঠিত হয় তবে মাকে ধরাতলে রক্ষা করা যাবে না। ব্রহ্মবাদিনীদের জন্ম দিয়ে তিনি শরীর ত্যাগ করবেন। তাই প্রথমে সন্ন্যাসীদের মঠ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু স্বামীজি, শ্রীমা ও স্বামী ব্রহ্মানন্দজির শরীর ত্যাগের ঠিক পরেই আমরা তিনজন সন্ন্যাসীর মধ্যে এই নারী মঠ গঠনের প্রবণতা দেখতে পাই। এঁদের মধ্যে দু’জন ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের মন্ত্রশিষ্য—স্বামী নির্মলানন্দ ও স্বামী পরমানন্দ। স্বামী শর্বানন্দ যে নারী মঠের সূচনা করেছিলেন, সেটির অস্তিত্ব এখনও ঝাড়গ্রামে বর্তমান। স্বামী শর্বানন্দ ও স্বামী পরমানন্দ দু’জনেই চেন্নাইতে ছিলেন স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের মাদ্রাজ মঠ গড়ে তোলার পর্বে। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের দেহরক্ষার পর (১০ জুন, ১৯১১) মাদ্রাজ মঠের দায়িত্ব লাভ করেন স্বামী শর্বানন্দ। তখন পি ভি বেঙ্কটরামন নামে ভক্তের দুই কন্যা শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রহ্মচারিণীর জীবনযাপন করতে থাকেন। শ্রীমায়ের কাছ থেকে তাঁদের দীক্ষালাভের বন্দোবস্ত করেন বেঙ্কটরামন। শ্রীমা তখন রামেশ্বর দর্শন করে বেঙ্গালুরুতে এসেছেন। ১৯১৭ সালে স্বামী সারদানন্দের অনুমতিতে ভগিনী নিবেদিতা স্কুলে আনা হল কন্যাদ্বয়কে। দীর্ঘ চার বছর তাঁরা আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করেন শ্রীমায়ের তত্ত্বাবধানে। ১৯২০ সালে শ্রীমায়ের মহাসমাধির পর দু’জনে চেন্নাই  ফিরে যান। স্বামী সারদানন্দজি তখন আদেশ করলেন, তাঁদের যেন বাড়িতে পাঠানো হয়। তিনি তখন মঠের সেক্রেটারি। কিন্তু দুই কন্যা আর গৃহবাসী হতে চাইলেন না। ১৯২১ সালে তত্‌কালীন অধ্যক্ষ ও শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামী ব্রহ্মানন্দ এসে উপস্থিত হন দক্ষিণ ভারতে। তাঁকে চেন্নাইতে নিয়ে আসেন শর্বানন্দজি। ১৯২১ সালের ১৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েদের মঠ ‘সারদা মাতৃমন্দির’ প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁরা। শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রাতুষ্পুত্র রামলালদা (চট্টোপাধ্যায়) গিয়েছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে। তিনিই সেদিন পূজার্চনা সম্পন্ন করেন। উপস্থিত ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী পার্ষদ স্বামী শিবানন্দ। এই মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠার সময় ওই দুই কন্যার নতুন নামকরণ হয়—ভগিনী সুনন্দা ও ভগিনী সুব্রতা। এই সময়ে আরও পাঁচজন সন্ন্যাসিনী হয়েছিলেন—ভগিনী যুগল কিশোরী, ভগিনী যোগেশ্বরী, ভগিনী যোগমায়া, ভগিনী ভুবনেশ্বরী ও ভগিনী বিশ্বেশ্বরী। এছাড়া মিস চাইল্ডারস নামে এক ইংরেজ ‘ভগিনী শান্তি’ নাম গ্রহণ করে সেখানে যোগদান করেন। সারদা মাতৃমন্দির তাঁরই অর্থনৈতিক আনুকূল্যে পরিচালিত হতে থাকল। ১৯২৬ মাতৃমন্দির চেন্নাই থেকে বেঙ্গালুরুতে স্থানান্তরিত হয়। সেই সময় দেশে ফিরে যান ভগিনী শান্তি। বন্ধ হয়ে যায় আর্থিক সাহায্য। তারপর বেলুড় মঠের নির্দেশে বন্ধ হয়ে গেল সারদা মাতৃমন্দিরও।
স্বামী শর্বানন্দ ছিলেন অসাধারণ কর্মী ও আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী। মঠের আদেশে মুম্বই, নাগপুর, কোয়েম্বাটোরে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।  ভুবনেশ্বরেও একটি নারী মঠ গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। কিন্তু ওড়িশায় বাঙালি মেয়েদের নিয়ে নারী সংঘ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিল। ঝাড়গ্রামের রাজা মল্লদেব তখন রাজ এস্টেটের ম্যানেজার দেবেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের মাধ্যমে আশ্রম গঠনের জন্য জমি প্রদান করলেন। ১৯৪৭ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হল নারী মঠ। স্বামী শর্বানন্দ সেই সময় বেলুড় মঠের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ট্রাস্টি। মঠ কর্তৃপক্ষ তাঁকে নারী মঠের সংস্রব ত্যাগ করে ফিরে আসতে অনুরোধ করেন। স্বামী শর্বানন্দের শর্ত ছিল একটাই, ঝাড়গ্রামের নারী মঠকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কিন্তু বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষ তা দিতে পারল না। ফলস্বরূপ অবধারিতভাবে মঠ ত্যাগ করে করলেন স্বামী শর্বানন্দ। ঝাঁপিয়ে পড়লেন নারী মঠ গঠনে। এখন সেটি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ সারদাপীঠ, কন্যাগুরুকুল’ নামে পরিচিত। একটি নামী স্কুল এই আশ্রম থেকে পরিচালিত হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, স্বামী বিবেকানন্দ যখন নারী মঠ গঠনের এতটাই আগ্রহী ছিলেন, তখন বেলুড় মঠ কেন স্বামী শর্বানন্দের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাল না? আসলে স্বামীজি মেয়েদের মাধ্যমেই মঠ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেখানে পুরুষদের বা পুরুষ মঠের হস্তক্ষেপ তাঁর পছন্দ ছিল না। সেদিক থেকে এই সিদ্ধান্তের একটা অর্থবহ দিক ছিল। কিন্তু তার থেকেও কঠিন বাস্তব ছিল স্বামী নির্মলানন্দ ও ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথের মনোভাব। নারী মঠ গড়ে তোলা নিয়ে স্বামী নির্মলানন্দের বিরাগভাজন হন স্বামী শর্বানন্দ। সারদা মাতৃমন্দিরের অর্থকষ্টের সময় নারী মঠ গঠনের উদ্যোগে কিছু অর্থ দিয়েছিলেন বাগবাজার মায়ের বাড়ির গণেন মহারাজ। তাঁর সঙ্গে বেলুড় মঠের ‘যদুপতি চ্যাটার্জি কেস’ নামে একটি মামলা হয়। যদুপতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর সম্পত্তি মঠের অধ্যক্ষ স্বামী শিবানন্দকে দান করে যান। তা দেখাশোনার ভার দেওয়া হয় ব্রহ্মচারী গণেনকে। মাতৃমন্দিরের অর্থের জন্য স্বামী শর্বানন্দের ৬-৭ হাজার টাকা ঋণ হয়। যদুপতি চট্টোপাধ্যায়ের সম্পত্তি থেকে সেই ঋণ শোধ হলে মঠের বিরুদ্ধে মামলা করেন ব্রহ্মচারী গণেন। কর্মীরূপে কাজ করার পারিশ্রমিক হিসাবে মোটা অঙ্কের অর্থও দাবি করেন। সেই টাকা দিয়ে গণেন মহারাজকে সংঘের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষ। ‘যদুপতি চ্যাটার্জি কেস’ ফাইল থেকে জানা যায়, সে ছিল এক দুর্যোগের ক্ষণ। কিছু সন্ন্যাসী বেলুড় মঠ থেকে বের হয়ে বাগবাজারে ‘বিবেকানন্দ মিশন’ গঠন করেন। সেখানে প্রধান ছিলেন স্বামী নির্মলানন্দ। ব্রহ্মচারী গণেনকে তিনি পূর্ণ সমর্থন করেন। তখনও তিনি বেলুড় মঠের শাখাকেন্দ্র বেঙ্গালুরু মঠের সেক্রেটারি। ফলে মঠের বিরুদ্ধে প্রচুর নিন্দাবাক্য কাগজে প্রকাশিত হতে থাকে। আবার পালটা কার্টুন আঁকা হয় গণেন মহারাজের নামে। স্বামী নির্মলানন্দের পূর্বাশ্রম ছিল বাগবাজার। তাঁর আত্মীয় কিরণচন্দ্র দত্ত ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথের পক্ষে থাকেন। সেই পর্বটি ছিল বেলুড় মঠের এক সংগ্রামের অধ্যায়। বেলুড় মঠ সেই নিন্দাবাক্যে স্থির থেকে নিজেদের সন্ন্যাসী সংঘের আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে স্বামী শর্বানন্দের মঠত্যাগকে নীরবে সম্মতি প্রদান করে।
আশ্চর্যের বিষয়, সারদা মাতৃমন্দির ও বেঙ্গালুরুতে শ্রীমায়ের প্রভাবে যে পাঠচক্রগুলি গড়ে উঠেছিল, তাদের নিয়ে নারী মঠ তৈরি করেন স্বামী নির্মলানন্দ। তখন তিনি ব্যাঙ্গালোর কেসে পরাজিত হয়ে বেলুড় মঠ ত্যাগ করেছেন। তাঁর শেষ জীবন (১৯৩৮) কাটে শিশু ও কিশোরদের নিয়ে, ওট্টাপালমে। পরবর্তীকালে (১৯৪৮) তাঁর শিষ্য স্বামী বিশদানন্দ ওট্টাপালমের নারী মঠটি পরিচালনায় সহায়তা করেন। এখনও সেটির অস্তিত্ব বর্তমান। ওই মঠে যিনি প্রথম সন্ন্যাসিনী হন, তাঁর নাম স্বামিনী বোধানন্দ। মোট সাতজন সন্ন্যাসিনী হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বামিনী প্রসন্নানন্দ, স্বামিনী অম্বিকানন্দ প্রমুখ।
নারী মঠ গঠনে স্বামী পরমানন্দ আবার আর এক অধ্যায়। তাঁকে মঠ থেকে  বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী পার্ষদ স্বামী অভেদানন্দ তাঁর গুরুভাই স্বামী প্রেমানন্দকে চিঠিতে লিখছেন, স্বামী নির্মলানন্দ ও স্বামী পরমানন্দকে (তুলসী ও বসন্ত) বিদেশে এনে ভুল করেছি। পরে স্বামী নির্মলানন্দ নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু স্বামী পরমানন্দ আমেরিকাতেই থেকে যান। ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি নারী সংঘ, ‘আনন্দ আশ্রম’। ১৯২৩ সালে তিনি যখন বস্টনে একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর শিষ্যা ভগিনী দেবমাতার (লঁরা গ্লেন) কাছে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বসন্ত আর ওদেশ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে না।’ সত্যিই তিনি আর ফিরে আসেননি। সেই নারী মঠের প্রধান মুখ ছিলেন বাঙালি কন্যা গায়ত্রী মাতা। এই নারী মঠের অস্তিত্ব আজও রয়েছে। সেটির একটি শাখা রয়েছে দক্ষিণ কলকাতায়। ‘আনন্দ আশ্রম’ নামে সেই শাখাটি মেয়েদের একটি অনাথ আশ্রম রূপে পরিচালিত হয়।
স্বামী নির্মলানন্দের প্রতিষ্ঠিত নারী সংঘ এখনও ওট্টাপালমে বর্তমান। বেঙ্গালুরুতে প্রায় ছত্রিশটি নারী পাঠচক্র এখন রয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে তিনজন ব্যক্তিগতভাবে বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই নারী মঠ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাঁদের তিনজনকেই বেলুড় মঠের থেকে সরে যেতে হয়েছিল। কারণ স্বামীজি চেয়েছিলেন নারীকে আধ্যাত্মিক সংঘ গঠনের ও পরিচালনের অধিকার প্রদান করতে হবে। সেই স্বাধীনতা ও বৈদান্তিক চিন্তার উদারতা নিয়েই  পরবর্তীকালে মেয়েদের মাধ্যমে বেলুড় মঠের সাহায্যে স্বাধীন সারদা মঠের সূচনা হয়। এই সারদা মঠের গঠনের একটি ধারাবাহিকতা ছিল। ধীর হলেও স্থিরগতিতে এই মঠ গঠিত হয়েছিল। সে এক পৃথক অধ্যায়।
নারীর ঈশ্বরলাভের বাসনা আজও সমাজের আঙিনায় বিচিত্র বিষয়। ভ্রাম্যমান মুমুক্ষু পুরুষ সন্ন্যাসীর বেশে একস্থান থেকে অন্যত্র চলেছেন, এ আমাদের অতি পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু নারী? এমনকি তথাগত বুদ্ধ নারীকে সন্ন্যাসের অধিকারদান করে বলেছিলেন, ‘সংঘ ধ্বংসের বীজ আজ বপন করলাম।’ আদি শঙ্করাচার্যও নারীকে সন্ন্যাসের অধিকার প্রদান করেননি। কিন্তু রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দ নারীকে আধ্যাত্মিকতার অধিকার পূর্ণমাত্রায় প্রদান করেছিলেন। শ্রীমাকে কেন্দ্র করে আবার বৈদিক যুগের গার্গী-মৈত্রেয়ীর জন্ম হবে—স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। শুধু দেখেননি, বারংবার তার প্রয়োজনীয়তাও ব্যক্ত করেছেন। তাঁর চিঠিপত্রের মধ্যে তা আমরা দেখতে পাই। স্বামীজি বলেছেন, ভারতীয় নারী, ভারতীয় পরিচ্ছদে যখন ঋষিমুখাসৃত বাণী আবার উচ্চারণ করবে, তখন এক নতুন যুগের আবির্ভাব হবে। একথা ব্যক্ত করে দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ‘এ আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি’। আমরা যে তিনটি নারী মঠের কথা উল্লেখ করলাম, তা ছিল পরিপূর্ণতা লাভের প্রচেষ্টা মাত্র। ইতিহাসে কালচক্রে তার অস্তিত্ব ক্ষীণ হলেও তা ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের নারী জাগরণের আদর্শে অনুরণিত।

সম্পর্কিত সংবাদ