Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এক মাসে আবেদন তিন লক্ষ, এরই নাম আস্থা

বীরভূমের নলহাটি পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়ার নইমুদ্দিন শেখ স্ত্রী, পুত্র নিয়ে মহারাষ্ট্রের ভাণ্ডুপে থাকতেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে সেখানে ছিলেন। পেশায় নির্মাণ শ্রমিক নইমুদ্দিন আচমকাই নিখোঁজ হয়ে গেলেন।

এক মাসে আবেদন তিন লক্ষ, এরই নাম আস্থা
  • ৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ঘটনা-১: বীরভূমের নলহাটি পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়ার নইমুদ্দিন শেখ স্ত্রী, পুত্র নিয়ে মহারাষ্ট্রের ভাণ্ডুপে থাকতেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে সেখানে ছিলেন। পেশায় নির্মাণ শ্রমিক নইমুদ্দিন আচমকাই নিখোঁজ হয়ে গেলেন। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ধারে তাঁকে পাওয়া গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল বটে। কিন্তু বাঁচলেন না। তাঁকে খুন করা হয়েছে। কী অপরাধ তাঁর? নইমুদ্দিনের বাবা গোলাম মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, ছেলে যে সংস্থায় কাজ করত সেখানে তার বকেয়া বাবদ পাওনা হয়েছিল প্রায় আট লক্ষ টাকা। ছেলে টাকা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেই ওরা মেরে দিল। টাকা না দেওয়াই ওদের উদ্দেশ্য। 

Advertisement

ঘটনা-২: রাহুল সিংয়ের বাড়ি নলহাটি শহরেরই ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। কাজ করতেন মুম্বইয়ে। সেখানে এক শেঠের কাছে কাজ করতেন। তাঁর পারিশ্রমিকের টাকা আটকে রেখেছিল। বারবার অনুরোধ করেও হকের টাকা আদায় করতে না পেরে থানার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। থানায় নালিশ জানানোয় ব্যাপক চটেছিল শেঠ। পরিযায়ী শ্রমিকের এমন ‘বেয়াদপি’ কেন সহ্য করবে শেঠ? তার উপর শ্রমিক যখন বাঙালি, তখন তাকে যেমন খুশি তেমন সাজা দেওয়া যায়! তাই শেঠের বিরুদ্ধে থানায় নালিশের শাস্তি হিসেবে কেটে দিল দু’টি কান। রাহুল পালিয়ে না এলে তাঁকেও হয়তো ফিরতে হতো নইমুদ্দিনের মতোই কফিনবন্দি হয়ে।
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের উপর অত্যাচার বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। বাংলায় কথা বললেই বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘বাংলাদেশি’। ভারতবর্ষের নাগরিকের বৈধ প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও মারধর ও আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটছে আকছার। এমনকী, বংশ পরম্পরায় এদেশে বসবাসকারী বাঙালিদেরও জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়ায় তাঁদের ফের ভারতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এই ধরনের ঘটনা দিনের পর দিন ঘটেছে এবং ঘটে চলছে। যুগ যুগ ধরে মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশায় কাজ করছেন এমন শ্রমিকরা প্রাণ বাঁচাতে সব ফেলে বাংলায় ফিরে আসছেন। 
এই সমস্ত অত্যাচারের ঘটনা বহুল চর্চিত। কিন্তু নইমুদ্দিন এবং রাহুল সিংয়ের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। বকেয়া প্রাপ্য চাইলে কান কেটে নেওয়া হবে? বছরের পর বছর আটকে রাখা মজুরি চাইলে খুন হতে হবে? এ কেমন কথা? মৃতের এবং আক্রান্তের পরিবারের তোলা অভিযোগ সত্যি হলে বলতেই হবে, সেখানে জঙ্গলের রাজত্ব চলছে। কিছু ধান্দাবাজ মানুষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাঙালি শ্রমিকদের ‘ক্রীতদাস’ বানিয়ে রাখতে চাইছে। অভিযোগকারী বাঙালি বলেই পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না। উল্টে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে পাঠানোর হুমকি। এটাকে শুধু বাংলা ও বাঙালির উপর অত্যাচার ভাবলে ভুল হবে। এটা শ্রমের উপর আঘাত। শ্রমিককে তাঁর ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার এক জঘন্য চক্রান্ত।
বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা গোটা দেশে ছড়িয়ে রয়েছেন। আবার উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার লোকজনও বাংলায় রয়েছেন। প্রত্যেকেই তাঁদের কর্মদক্ষতার জোরে পেশায় টিকে আছেন। যেমন বাংলার স্পঞ্জ আয়রন কারখানার অধিকাংশ শ্রমিকই হয় ঝাড়খণ্ডের, বিহারের অথবা ওড়িশার। এই কাজ করার জন্য যে শারীরিক শক্তি এবং সহনশীলতা থাকার দরকার তা অধিকাংশ বাঙালির মধ্যে নেই। একইভাবে নির্মাণকাজে মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের কদর রয়েছে গোটা দেশে। তাই মুম্বই হোক বা দিল্লি, সর্বত্র বাংলার নির্মাণ শ্রমিকদের চাহিদা আকাশছোঁয়া। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে বাংলার শ্রমিকদের উপর লাগাতার অত্যাচার চালানো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির হাত থেকে বাংলার শ্রমিকদের রক্ষা করার জন্য মুখমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চালু করেছেন ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প। ভিনরাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা চাইলে বাংলায় ফিরতে পারেন। তাঁদের ফেরার খরচ দেবে সরকার। এছাড়াও তাঁরা যাতে এ রাজ্যে কাজ না পাওয়া পর্যন্ত ডাল-ভাত খেয়ে কাটাতে পারেন, তারজন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে এক বছর ধরে পাবেন। পাশাপাশি তাঁদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। দেওয়া হবে খাদ্যসাথী ও স্বাস্থ্যসাথী কার্ড। এমনকী, তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্বও সরকার নেবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রমশ্রী প্রকল্প ঘোষণা করামাত্র বিরোধীরা হইচই শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো জনপ্রিয় প্রকল্পগুলি ঘোষণার সময়েও বিরোধীরা রে-রে করে উঠেছিল। সবুজসাথীর সাইকেল দু’বছর দিয়েই বন্ধ হয়ে যাবে। স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডে এক কাপ চাও জুটবে না। আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তো বিরোধীদের চোখে ছিল ‘ভিক্ষে’। এভাবেই প্রতিটি প্রকল্প নিয়ে বিরোধীরা অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু বিরোধীদের দুর্ভাগ্য, তারা যে সমস্ত প্রকল্পের সমালোচনা করেছে সেগুলিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশ্বের দরবারেও হয়েছে উচ্চ প্রশংসিত। এমনকী, তাদের দল যেসব রাজ্যে সরকারে আছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে সেখানেও মমতার দেখানো কর্মসূচি চালু করতে বাধ্য হচ্ছে। এটাই ভবিতব্য। 
বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী সব ধর্মের মানুষই অত্যাচারিত হচ্ছে। তবে, সংখ্যালঘু হলে মাত্রা ছাড়াচ্ছে অত্যাচার। তাই প্রাণ বাঁচাতে বাংলায় ফিরে আসতে চাইছেন অনেকেই। বাংলায় ফেরার প্রবণতা মুর্শিদাবাদ জেলায় সবচেয়ে বেশি। অত্যাচারের শিকার হয়ে কেউ ফিরতে চাইলে ট্রেন ও গাড়িভাড়া বাবদ সরকার পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই টাকাও দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক আশ্বস্ত করেছেন, যাঁরা অত্যাচারিত হয়ে বাংলায় ফিরছেন তাঁরা প্রত্যেকেই শ্রমশ্রী প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিকই গোটা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কোনও রাজ্য সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বাংলার মতো কোনও ‘পুনর্বাসন’ প্রকল্প চালু করেনি। বলা ভালো প্রয়োজনও হয়নি। কারণ রাগটা বাঙালি এবং বাংলাভাষীর উপর। তাই পরিকল্পিতভাবে শুধু বাঙালিদের উপরই অত্যাচার চালানো হচ্ছে। তা থেকে মুক্তি দিতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শ্রমশ্রী’র মতো একটা প্রকল্প চালু করেছেন। কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা নিলেই এই প্রকল্প হয়ে উঠবে যুগান্তকারী।
অতীত থেকে শিক্ষা নিলে ভবিষ্যতের চলার পথ মসৃণ হয়। শ্রমশ্রী প্রকল্পের বেনিফিসিয়ারি ঠিক 
করার ক্ষেত্রে উমপুনের ঘটনার কথা স্মরণে রাখা দরকার। সুপার সাইক্লোনিক ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশা লাঘব করতে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছিলেন শাসক দলের বহু নেতা। ঝড়ের কারণে বাড়িতে আঁচড় লাগেনি এমন নেতারাও ক্ষতিপূরণ নিয়েছিলেন। কোনও কোনও প্রধান রাতের অন্ধকারে তালিকা তৈরির সময় পরিবারের চার, পাঁচজনের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা ক্ষতিপূরণও পেয়েছিলেন।  বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই অনেকে লজ্জায় টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য প্রশাসনের অফিসে লাইন দিয়েছিলেন। আর যাদের লাজলজ্জা নেই, তাদের কাছ থেকে টাকা ফেরানোর জন্য করতে হয়েছিল এফআইআর। শুধু পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকেই ফেরানো হয়েছিল প্রায় এক কোটি টাকা। 
উমপুনের ঘটনার পর থেকে সরকারি প্রকল্পের বেনিফিসিয়ারির তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব অফিসারদেরই দেওয়া হচ্ছে। তাতে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপোষণের অভিযোগ অনেকটাই কমেছে। মমতা ব঩ন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তকে বিরোধীরা মাত্রাতিরিক্ত প্রশাসন নির্ভরতা বলে কটাক্ষ করতেই পারেন। কিন্তু স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গেলে এছাড়া অন্য কোনও রাস্তাও নেই। সেই স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে শ্রমশ্রী প্রকল্পেও। আর সেটা করতে পারলেই এই প্রকল্প বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে হবে ‘লাইফ লাইন’।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারে আলোড়ন ফেলেছে। প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার জন্য রাজ্যজুড়ে আবেদনপত্র জমা পড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লক্ষ ৫ হাজার ৬৪০জন আবেদন করেছেন। এঁরা সবাই যোগ্য, এমনটা নয়। আবেদনকারীদের তথ্য সরেজমিনে খতিয়ে দেখেই টাকা দেওয়া দরকার। কিন্তু এক মাসে এই বিপুল সংখ্যক আবেদনেই বোঝা যায়, মুখ্যমন্ত্রীর উপর গরিব মানুষের আস্থা কোন পর্যায়ে। আর এই আস্থা শুধু ভাষণে জন্মায় না, কথা দিয়ে কথা রাখলেই তা তৈরি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি কথা দিলে কথা রাখেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ