সংবাদদাতা, উলুবেড়িয়া: আর এক সপ্তাহ পরেই এই স্কুল ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। ভেবেছিলাম, এবার হাই স্কুলে ভর্তি হলে আমি নিজেই ওকে পৌঁছে দিয়ে আসব। কিন্তু ও যে আর ফিরবে না! ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ভেবেছিলাম হয়ত বেঁচে যাবে। আবার বাড়ি ফিরে আসবে। ঠাকুরকে অনেক বলেছিলাম। কিন্তু সবার সব ইচ্ছা তো আর পূরণ হয় না! মঙ্গলবার দুপুরে কাঁদতে কাঁদতে একথা বলছিলেন চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া মৃত শৌভিক দাসের মা সুনীতা দাস। তিনি বলেন, ভাবতে পারছি না, ও এভাবে চলে যাবে। শৌভিক স্কুল থেকে ফিরে কী করবে, কী খাবে, কী পরবে সবই আমায় জিজ্ঞাসা করত। এখন আমি একা হয়ে গিয়েছি। শৌভিক কম্পিউটার কিনে দেওয়ার কথা বলেছিল। আমি বলেছিলাম, পরীক্ষার পর দেব। স্কুল থেকে বেড়াতে যাওয়ার বাস ছাড়বে বলেছিল। বলেছিলাম, আমিও তোদের সঙ্গে যাব। কিন্তু এক লহমায় সব শেষ হয়ে গেল। কাতর মায়ের একটাই প্রশ্ন, আমার একটাই ছেলে ছিল, এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?
অন্যদিকে সোমবার রাতে শৌভিক ও অরিনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও মৃত প্রি-নার্সারির পড়ুয়া ঈশিকা মণ্ডলের বাবা অভিজিৎ মণ্ডল কর্মসূত্রে আরবে থাকায় তার শেষকৃত্য বুধবার সম্পন্ন হবে। এদিন সকালে ঈশানির বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, প্রতিবেশীদের ভিড়। বাইরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মা আলপনা মণ্ডল। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, সোমবার সকাল সওয়া ১০টায় ঈশানি গাড়িতে করে স্কুলে গিয়েছিল। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে আমার সঙ্গে ভাত খাওয়ার কথা। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। ভাশুরের ছেলে এসে পুকুরে গাড়ি পড়ে যাওয়ার খবর দেয়। দৌড়ে যাই সেখানে। সবাইকে খুঁজে পাওয়া গেলেও মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক পরে ওকে খুঁজে পাওয়া যায়। ততক্ষণে সব শেষ। আলপনাদেবী বলেন, সোমবার সকালে দুই মেয়ের সঙ্গে ওর বাবার ভিডিও কলে কথা হয়। রাতেও বলেছিল ফোন করবে। তবে রাতে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে মেয়ের মৃতদেহ দেখতে হয় ওর বাবাকে। জানি না বাড়ি ফিরে ওর কী অবস্থা হবে!
অন্যদিকে এদিন ভিডিও কলে অভিজিৎবাবু স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেন। কীভাবে কাগজপত্র ছাড়া গাড়িটিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের আনা নেওয়ার অনুমতি দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। মৃত পড়ুয়া অরিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, শোকস্তব্ধ গোটা পাড়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, অরিন মামার বাড়িতেই মানুষ। সোমবার বিকেলের পর থেকেই পরিবারের লোকজন শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন।