নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: দেশের রেলপথজুড়ে জাল ছড়িয়েছে হরিয়ানার কুখ্যাত ‘শান-সি সুলতানপুরী’ গ্যাং। উত্তর থেকে দক্ষিণ— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জোনে ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় মাথাব্যাথা বাড়ছিল রেল পুলিশের। শেষমেশ খড়্গপুর জিআরপির হাতে ধরা পড়ে গ্যাংয়ের তিন সদস্য। তাদের জেরা করেই দক্ষিণ ভারতে সক্রিয় থাকা আরও চার দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পালাক্কাড জিআরপির তৎপরতায় উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার চুরি যাওয়া গয়না। চাঞ্চল্যকরভাবে উঠে এসেছে, কীভাবে এই গ্যাং ট্রেনের বাতানুকূল কামরায় মাত্র দু’মিনিটের মধ্যে ব্যাগের চেন কেটে অপারেশন সেরে ফেলে।
জিআরপি সূত্রে খবর, শালিমার জিআরপি থানার হেফাজতে থাকা গ্যাংয়ের মাস্টারমাইন্ড রণবীর সিং সহ তিন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গিয়েছে, তাদের আরেকটি দল ওই সময় দক্ষিণ ভারতে সক্রিয় ছিল। তারা ঠিক সেই সময়েই চেন্নাই সেন্ট্রাল–কুইলন্ডি ট্রেনের এ-টু কামরায় এক মহিলা যাত্রীর লক করা ট্রলিব্যাগ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার গয়না। ১৪ নভেম্বর অভিযোগ দায়ের হতেই নড়েচড়ে বসে পালাক্কাড জিআরপি। গঠিত হয় বিশেষ দল। চুরির পদ্ধতি ও হাতের কাজ দেখে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, এটি ‘শান-সি সুলতানপুরী’ গ্যাংয়েরই কাজ। ট্রেনের কোচ অ্যাটেনডেন্ট, টিটি ও অন্যান্য কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে রেল পুলিশ পাঁচ দুষ্কৃতীর স্পষ্ট বিবরণ পায়। এরপর পিএনআর বিশ্লেষণ এবং স্টেশনগুলির সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে জানা যায়, ওই গ্যাংয়ের সদস্যরা সুরতকাল থেকে মাডগাঁওমুখী ট্রেনে উঠে পালানোর ছক কষেছে। এদিকে, শালিমার থানার হেপাজতে থাকা গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই ফুটেজে দেখে দুষ্কৃতীদের চিনতে পারে। তারা জানায়, ওই গ্যাংয়ের সদস্যরা মাডগাঁওয়ে গা ঢাকা দেবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার গভীর রাতে আরপিএফ ও জিআরপি যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে মাডগাঁও স্টেশন থেকে চার দুষ্কৃতীকে পাকড়াও করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় চুরি যাওয়া সমস্ত গয়না।
খড়্গপুর জিআরপির সুপারিনটেনডেন্ট দেবশ্রী সান্যাল বলেন, ‘দক্ষিণে ধৃতদের মধ্যে আরও একজন মাস্টারমাইন্ড রয়েছে। মূলচক্রীরা ধরা পড়লেই ধারাবাহিক অপারেশনে থাকা গ্যাংগুলিকে চিহ্নিত করা সহজ হবে। আমরা এই গ্যাংয়ের গতিবিধি ট্র্যাক করছি।’ তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি, ‘শান-সি সুলতানপুরী’র অন্তত ২০-২৫টি ছোট-বড় গ্যাং দেশজুড়ে সক্রিয়। দ্রুত ও শব্দহীন অপারেশনের জন্য তারা বেছে নেয় এসি কামরা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কবিগুরু ও সমরসতা এক্সপ্রেসে এইচ-১ কামরায় একই কায়দায় চুরি হয়েছিল। এর আগে উত্তরবঙ্গ ও অসমগামী বেশ কয়েকটি ট্রেনেও একই পদ্ধতিতে চুরির অভিযোগ ওঠে। তদন্তকারীরা আরও জানান, গ্যাংগুলি প্রায়ই অঞ্চল বদল করে। উত্তর ভারতের একটি দল অপারেশন সেরে দক্ষিণে চলে যায়, আর দক্ষিণের একটি দল আসে উত্তরে। সেই সময় নিজেদের মোবাইল ফোনও একে অপরের হাতে তুলে দেয়, যাতে ট্র্যাকিং করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয় পুলিশ। দেশজুড়ে রেল পুলিশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে এই অপরাধচক্র।